বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬, ঢাকা

দুধে মাদক মিশিয়ে তরুণীদের ধর্ষণ করতেন ‘আইআইটি বাবা’! 

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৪ জুন ২০২৬, ০৪:৪১ পিএম

শেয়ার করুন:

দুধে মাদক মিশিয়ে তরুণীদের ধর্ষণ করতেন ‘আইআইটি বাবা’! 

প্রায় চার বছর ধরে ভারতের মথুরার রাধাকুঞ্জ এলাকায় নিজেকে এক ধর্মীয় গল্পকার হিসাবে পরিচয় দিয়ে বসবাস করছিলেন আইআইটি থেকে স্নাতক করা স্বঘোষিত ধর্মগুরু (ভণ্ড বাবা)। 

তরুণীদের আশ্রমে ডেকে প্রসাদের নাম করে মাদক মেশানো দুধ খাওয়ানো হতো। এরপর নেশাগ্রস্ত তরুণীদের উপর চালাতেন যৌন নির্যাতন। 


বিজ্ঞাপন


পরিচিতি বাড়ানোর জন্য তিনি ‘রাধা কৃপা অমৃতা’ নামে একটি ইউটিউব চ্যানেলও খুলে বসেন। আধ্যাত্মিক চর্চা ও ধর্মগুরুর খোলসের আড়ালে তার আস্তানায় চলত যৌন নিপীড়ন ও নিগ্রহ। 

তোলা হতো আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও। সেই সব ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেল করে অর্থ আদায় করার অভিযোগে অবশেষে গ্রেফতার হন ওই ‘আইআইটি বাবা’। 

আধ্যাত্মিক গুরু সেজে তরুণীদের যৌন হেনস্তা করার দায়ে পুলিশের জালে মথুরার ২৯ বছর বয়সি আইআইটি স্নাতক অভিষেক মিশ্র।

rapist


বিজ্ঞাপন


অভিযুক্ত ওই ধর্মগুরু ওড়িশ্যার বাসিন্দা। নারায়ণ দাস ছদ্মনাম ব্যবহার করে তরুণীদের ধর্মের নামে শোষণ করতেন অভিষেক। ভক্তদের আশ্রমে ডেকে ধর্মের নামে চলত মগজধোলাই। স্বঘোষিত ধর্মগুরু হওয়ার জন্য পেশাও ত্যাগ করেন তিনি।

আইআইটি রুরকি থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিগ্রি অর্জন করেছেন অভিষেক। ২০১৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত আইআইটির মতো খ্যাতনামা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র ছিলেন তিনি। 

ছত্রিশগড়ের এক তরুণীর দায়ের করা অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। এরপর তার বিরুদ্ধে ধর্ষণের একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

নিজের পরিচিতি বাড়ানোর জন্য তিনি ‘রাধা কৃপা অমৃতা’ নামে একটি ইউটিউব চ্যানেল খুলে বসেন। ছিল লিঙ্কডইন অ্যাকাউন্টও। প্ল্যাটফর্মগুলিকে শুধুমাত্র অনুসারী তৈরি করতেই নয়, বরং তরুণীদের, বিশেষ করে ইঞ্জিনিয়ারিং পাঠরতা তরুণীদের ফাঁদে ফেলার জন্যও ব্যবহার করতেন অভিষেক।

সেখানে তিনি হিন্দি ও ইংরেজি উভয় ভাষাতেই ধর্মোপদেশ দিতেন। এ ছাড়াও ছদ্মনামে লিঙ্কডইনে একটি পেশাদার প্রোফাইল তৈরি করে রেখেছিলেন অভিষেক। 

in4

পুরোদস্তুর পেশাদার মোড়কে শিক্ষিত তরুণ সমাজকে আকৃষ্ট করতেন তিনি। বক্তৃতার চটকে ভক্তরা তার চারপাশে ভিড় জমাতে শুরু করেন। জনপ্রিয়তা বাড়তে শুরু করে অভিষেকের।

অভিষেকের বাচনভঙ্গিতে মোহিত হয়ে ধর্মগুরুর প্ররোচনার ফাঁদে পড়ে যান শিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম। স্বঘোষিত ধর্মগুরুর অনুসরণকারীদের পরিবার থেকে দূরে সরে গিয়ে তার আশ্রমে বসবাস করার জন্য প্ররোচিত করতে শুরু করেন অভিষেক।

পুলিশ জানিয়েছে, একসময় ২৪ জন তরুণ-তরুণী বাস করতে শুরু করেন আশ্রমে। পুলিশ সূত্রে খবর, তরুণী ভক্তদের সঙ্গে বিয়ে-বিয়ে খেলা খেলতেন ‘আইআইটি বাবা’। 

ভালবাসা ও পারস্পরিক সম্মতির ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত শাস্ত্রীয় হিন্দু বিবাহ পদ্ধতির অন্যতম ‘গান্ধর্ব বিবাহের’ প্রস্তাব দিতেন অভিষেক ওরফে নারায়ণ দাস।

এই পদ্ধতিই পরবর্তী কালে ব্ল্যাকমেলের হাতিয়ার হয়ে উঠত স্বঘোষিত ধর্মগুরুর। পুলিশের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অভিষেক নিজে অথবা শিষ্যদের নিয়ে ‘গান্ধর্ব বিবাহের’ অনুষ্ঠান করতেন। আধ্যাত্মিক সংস্পর্শে আসা তরুণীদের সঙ্গে তিনি যৌনসম্পর্ক স্থাপন করতেন।

যৌন হেনস্থা বা শারীরিক সম্পর্কের আগে প্রসাদের ছলে মাদক মেশানো দুধ খাওয়ানো হতো তরুণীদের। নেশাগ্রস্তদের উপর চলত যৌন নির্যাতন। শুধু তাই নয়, সেই ঘটনার ছবি ও ভিডিও গোপনে রেকর্ড করে রাখা হত। পরে সেগুলিকেই ব্ল্যাকমেলের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করতেন বলে অভিযোগ।

মথুরার গোবর্ধন এলাকার রাধা কুণ্ডে এসে স্বঘোষিত ধর্মগুরু সেজে বসেন অভিষেক। পুলিশ জানিয়েছে, প্রথমে অভিষেকের মা ছেলের সঙ্গে থাকতেন। ধীরে ধীরে ছেলের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন তিনি। 

মথুরা এলাকায় ভাড়াবাড়িতে থাকলেও পরে নিজে একটি বাড়ি তৈরি করেন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। প্রথমে বহু ভক্ত তার বক্তৃতার টানে আশ্রমে ভিড় জমালেও পরে আচরণে সন্দেহ হওয়ায় ধীরে ধীরে ছেড়ে চলে যান অধিকাংশ।

ছত্তীশগড়ের বাসিন্দা ২২ বছর বয়সী এক বিএসসি নার্সিংয়ে পড়ুয়া তার বোনের সঙ্গে দেখা করতে মথুরায় আসেন। সেখানেই আলাপ হয় অভিষেকের সঙ্গে। তার অভিযোগ, গত ১৭ মে প্রসাদ দেওয়ার অছিলায় মাদক খাইয়ে আচ্ছন্ন করে দেওয়া হয় তার চেতনাকে।

মাদকসেবন করিয়ে চলে যৌন নিপীড়ন। সেই ঘটনা রেকর্ড করে রাখেন অভিষেক। ঘটনাটির পর সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ১৯ মে বাড়ি ফিরে আসেন অভিযোগকারী তরুণী। 

নিগৃহীতা তরুণীর অভিযোগ, সেই সব ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করে ফোনে তাকে ব্ল্যাকমেল করা শুরু হয় এবং ৫ লাখ টাকা দাবি করেন অভিষেক।

ভক্তদের শারীরিক নিগ্রহের পাশাপাশি আশ্রমে থাকা ব্যক্তিদের পরিবারের কাছ থেকেও নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে এই স্বঘোষিত ধর্মগুরুর বিরুদ্ধে। 

শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের বশে রাখার জন্য নিয়মিত মগজধোলাই করতেন অভিষেক। এমনটাই জানিয়েছে পুলিশ।

বিষয়টি তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ অভিযুক্তের মোবাইল ফোন থেকে বেশ কিছু তরুণীর আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও উদ্ধার করেছে। অভিযুক্তের আশ্রম থেকে উদ্ধার করে দুই তরুণী ও এক তরুণকে তাদের পরিবারের কাছে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

অভিষেক আশপাশের এলাকা থেকে আরো তরুণীকে এই কাজে টানার চেষ্টা করতেন। এমনকি তার গ্রেফতারের আগে, এক তরুণীর পরিবার তাকে বাড়ি নিয়ে যেতে আসে। পুলিশ সূত্রে খবর, তখনও অভিষেক এবং তার সহযোগীরা হট্টগোল সৃষ্টি করে পরিবারটিকে বাধা দিয়েছিল।

অভিষেকের লালসার শিকার ঠিক কতজন এবং কত দিন ধরে এই কার্যকলাপ চলছিল, তা জানতে বিস্তারিত তদন্ত চালাচ্ছে পুলিশ। 

স্বঘোষিত ধর্মগুরুর পর্দাফাঁস হতেই মথুরা এবং আশপাশের এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে। 

-এমএমএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর