২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য প্রায় ২৮৭ জন প্রার্থীকে প্রাথমিকভাবে মনোনীত করেছে নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি। এই তালিকায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নামও থাকতে পারে বলে আভাস মিলেছে।
বৃহস্পতিবার একটি সাক্ষাৎকারে নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির সচিব ক্রিস্টিয়ান বার্গ হার্পভিকেন বলেছেন, এ বছরের ২০৮ জন ব্যক্তি এবং ৭৯টি সংস্থাকে মনোনিত করা হয়েছে। মনোনীতদের তালিকার মধ্যে ট্রাম্পও থাকতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও জানান, গত বছরের তুলনায় এ বছর অনেক নতুন মনোনীত ব্যক্তি রয়েছেন।
২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে এই পদে থাকা হার্পভিকেন বলেন, ‘যেহেতু আমি এই পদে নতুন, তাই যে বিষয়টি আমাকে কিছুটা অবাক করেছে তা হলো, প্রতি বছর তালিকায় এত বেশি নবায়ন হয়।’
বিশ্বজুড়ে সংঘাতের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চাপের মুখে থাকা সত্ত্বেও পুরস্কারটি প্রাসঙ্গিক রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা যে সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি, তাতে শান্তি পুরস্কার আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন ভালো কাজ হচ্ছে, এমনকি তার চেয়েও বেশি।’
এদিকে ট্রাম্প মনোনীত হয়েছেন কিনা তা নিশ্চিত করে বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন হার্পভিকেন। কারণ নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য কারা মনোনীত হয়েছেন, সাধারণত সেই তালিকা পরবর্তী ৫০ বছর পর্যন্ত কঠোরভাবে গোপন রাখা হয়।
বিজ্ঞাপন
মূলত, দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যুদ্ধ থামানোর কৃতিত্বের জন্য নিজেকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের দাবিদার বলে ঘোষণা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে তার সেই আশা পূরণ হয়নি এবং শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সম্মাননাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এই পুরস্কার পাননি তিনি।
২০২৫ সালে শান্তিতে নোবেল পেয়েছেন ভেনেজুয়েলার বিরোধী দলনেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো। মারিয়া অবশ্য ট্রাম্পকেই নোবেল উৎসর্গ করেছেন এবং ট্রাম্পের হাতে নিজের নোবেল শান্তি পুরস্কারের পদক তুলে দিয়েছেন তিনি।
এদিকে ইতোমধ্যেই কম্বোডিয়া, ইসরায়েল এবং পাকিস্তানের নেতারা জানিয়েছেন, তারা এ বছরের পুরস্কারের জন্য ট্রাম্পকে মনোনীত করেছেন। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে এই মনোনয়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ায় তা নিয়ম অনুযায়ী বৈধ হিসেবে গণ্য হয়েছে।
তবে নোবেল কমিটি স্পষ্ট করেছে, কারও নাম প্রস্তাব করা মানেই তাকে পুরস্কারের জন্য চূড়ান্ত করা নয়।
এদিকে ট্রাম্প ছাড়াও এ বছর সম্ভাব্য বিজয়ীদের তালিকায় আরও বেশ কয়েকজনের নাম আলোচনায় রয়েছে। তাদের মধ্যে রাশিয়ার প্রয়াত বিরোধী নেতা আলেক্সি নাভালনির স্ত্রী ইউলিয়া নাভালনায়া, পোপ লিও এবং সুদানের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘ইমারজেন্সি রেসপন্স রুমস’ অন্যতম।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কার সিনেটর লিসা মুরকোস্কি এবং ডেনিশ পার্লামেন্টের সদস্য আজা কেমনিটজকেও এই পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হয়েছে। আর্কটিক অঞ্চলে শান্তি ও বিশ্বাস বজায় রাখতে কাজ করার জন্য তাদের নাম প্রস্তাব করেছেন নরওয়ের একজন সংসদ সদস্য। বিশেষ করে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ডেনমার্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে তাদের এই মনোনয়ন বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ীদের বাচাইয়ের প্রক্রিয়া এক নজরে দেখে নেওয়া যাক—
কে জিততে পারে?
১৮৯৫ সালের নভেম্বর মাসে আলফ্রেড নোবেল নিজের মোট উপার্জনের ৯৪% (তিন কোটি সুইডিশ ক্রোনার) দিয়ে তার উইলের মাধ্যমে নোবেল পুরস্কার প্রবর্তন করেন। এই বিপুল অর্থ দিয়েই শুরু হয় পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসাবিজ্ঞান, সাহিত্য ও শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রদান।
১৯৬৮ সালে তালিকায় যুক্ত হয় অর্থনীতি। সে বছর পুরস্কার ঘোষণার আগেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন আলফ্রেড নোবেল। আইনসভার অনুমোদন শেষে তার উইল অনুযায়ী নোবেল ফাউন্ডেশন গঠিত হয়। তাদের ওপর দায়িত্ব বর্তায় আলফ্রেড নোবেলের রেখে যাওয়া অর্থের সার্বিক তত্ত্বাবধান করা এবং নোবেল পুরস্কারের সার্বিক ব্যবস্থাপনা করা। বিজয়ী নির্বাচনের দায়িত্ব সুইডিশ অ্যাকাডেমি আর নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটিকে ভাগ করে দেওয়া হয়।
আলফ্রেড নোবেলের উইল অনুসারে, ‘পুরষ্কারটি সেই ব্যক্তির কাছেই যাওয়া উচিত- যিনি বিভিন্ন জাতির মধ্যে সম্প্রীতি, শান্তি প্রতিষ্ঠা ও প্রচারের জন্য সর্বাধিক বা সর্বোত্তম কাজ করেছেন।’
নোবেল শান্তি পুরস্কার কমিটির চেয়ারম্যান জর্গেন ওয়াটনে ফ্রাইডনেস বলেন, ‘বাস্তবে যে কেউ নোবেল শান্তি পুরস্কারের প্রাপক হতে পারেন। পুরস্কারের ইতিহাস স্পষ্টভাবে দেখায় যে এটি সারা বিশ্বের সমাজের সকল স্তরের মানুষকে দেওয়া হয়।’
কারা মনোনীত করতে পারেন?
যেকোনো দেশের সরকার ও সংসদ সদস্য, বর্তমান রাষ্ট্রপ্রধান, বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, আইন এবং দর্শন বিভাগের অধ্যাপক এবং সাবেক নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ীরা পুরস্কারের জন্য যে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নাম প্রস্তাব করতে পারেন। তবে কোনো ব্যক্তি নিজেকে মনোনীত করতে পারবেন না।
কে সিদ্ধান্ত নেয়?
নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি: নরওয়েজিয়ান পার্লামেন্ট কর্তৃক নিযুক্ত পাঁচজন ব্যক্তি নিয়ে গঠিত হয় এই কমিটি। অধিকাংশ সময়েই দেখা যায়, এই কমিটির সদস্যরা দেশটির অবসরপ্রাপ্ত রাজনীতিবিদ।
নোবেল কমিটি কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয়?
প্রতি বছর ৩১ জানুয়ারি থাকে মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ তারিখ, অর্থাৎ নেতানিয়াহুর ট্রাম্পের মনোনয়ন এই বছর বিবেচনা করা হবে না। কমিটির সদস্যরা ফেব্রুয়ারিতে কমিটির প্রথম সভার আগে তাদের নিজস্ব মনোনয়ন দিতে পারবেন।
কমিটির সদস্যরা একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করেন এবং নোবেল কমিটি স্থায়ী উপদেষ্টা ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞদের একটি দল প্রতিটি মনোনীত প্রার্থীর তথ্যউপাত্ত মূল্যায়ন করেন। যাচাইবাছাইয়ের পর কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে অথবা সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। প্রায়শই পুরস্কার ঘোষণার কয়েক দিন আগে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বিজয়ীদের নাম ঘোষণা এবং অনুষ্ঠান কখন?
প্রথা অনুযায়ী অক্টোবর মাসের প্রথম সোমবার নোবেল বিজয়ীদের নাম ঘোষণা শুরু হয় এবং ১০ ডিসেম্বর আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকীর দিন অসলো সিটি হলে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।
বিজয়ীরা কী পান?
একটি পদক, একটি ডিপ্লোমা, ১ কোটি ১০ লাখ সুইডিশ ক্রাউন (১.১৫ মিলিয়ন ডলার)। তবে সবচেয়ে বড় বিষয় তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি ও সম্মান লাভ।
১৯০১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে মোট ১১৫ বার নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রেড ক্রসের আন্তর্জাতিক কমিটি তিনবার (১৯১৭, ১৯৪৪, ১৯৬৩) নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছে, এবং জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার দপ্তর দুইবার (১৯৫৪ ও ১৯৮১) পুরস্কার লাভ করেছে।
বাংলাদেশের ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংক ২০০৬ সালে সমাজের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে অসামান্য অবদানের জন্য যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার পান।
সূত্র: রয়টার্স
এমএইচআর




