মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

অবরোধ কাটলে পাকিস্তানে মার্কিন আলোচনায় অংশ নিতে পারে ইরান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ২১ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৩৭ এএম

শেয়ার করুন:

Iran considers US talks in Pakistan with blockade still unresolved
সংঘাত আর যুদ্ধবিরতির টানটান উত্তেজনার মাঝেও স্বাভাবিক তেহরান। ২০ এপ্রিল তেহরানে ধারণ করা চিত্রে এমনটাই দেখা যাচ্ছে। ছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া দীর্ঘদিনের বন্দর অবরোধ প্রত্যাহারের পথ সুগম হলে পাকিস্তানের মাটিতে মার্কিন প্রতিনিধিদের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় বসতে পারে ইরান। 

সোমবার তেহরানের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অবরোধ অবসানে পাকিস্তানের মধ্যস্থতা এবং ইতিবাচক পদক্ষেপের পর তারা এই আলোচনায় অংশগ্রহণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন।


বিজ্ঞাপন


যদিও ইরানের পক্ষ থেকে ইতিবাচক সংকেত পাওয়া গেছে, তবে প্রতিনিধি দল পাঠানোর বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, একটি ইরানি প্রতিনিধি দল মঙ্গলবারই ইসলামাবাদ সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আলোচনার নেতৃত্বে থাকবেন ইরানের প্রভাবশালী নেতা মোহাম্মদ বাঘের গালিবফ। তবে শর্ত হিসেবে জানানো হয়েছে, গালিবফ তখনই অংশ নেবেন যদি যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ওই বৈঠকে উপস্থিত থাকেন।

জেডি ভ্যান্সের অংশগ্রহণ নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা কাটেনি। বিভিন্ন সংবাদে তার সফরের কথা বলা হলেও, রয়টার্সের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে যে তিনি এখনও যুক্তরাষ্ট্রেই অবস্থান করছেন।

আরও পড়ুন—

দুই সপ্তাহের চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হতে চলায় তেহরান তাদের আগের কঠোর অবস্থান থেকে কিছুটা সরে এসেছে। এর আগে মার্কিন ‘আগ্রাসনের’ বিপরীতে প্রতিশোধ নেওয়ার কথা বললেও, বর্তমান পরিস্থিতিকে তারা ‘ইতিবাচকভাবে পর্যালোচনা’ করছে।

মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে পাকিস্তান বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বন্দর অবরোধ শিথিল করতে কাজ করছে, যাতে ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়। মূলত এই অবরোধ তুলে নেওয়াকেই শান্তি প্রক্রিয়ার প্রধান শর্ত হিসেবে দেখছে তেহরান।

নিরাপত্তা প্রস্তুতি 
ইরানের একটি পণ্যবাহী জাহাজ মার্কিন অবরোধ ভেঙে যাওয়ার চেষ্টা করলে যুক্তরাষ্ট্র সেটি জব্দ করে। এই ঘটনার পর তেহরান পাল্টা প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা দিলে চলমান যুদ্ধবিরতি হুমকির মুখে পড়ে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সোমবার বলেন, ওয়াশিংটন এটিই প্রমাণ করেছে যে তারা কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার বিষয়ে মোটেও ‘সিরিয়াস’ নয়। তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, তেহরান তাদের পূর্বঘোষিত দাবিগুলো থেকে একচুলও সরবে না। বাঘাই আরও অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র কিছু ‘অযৌক্তিক এবং অবাস্তব অবস্থানের’ ওপর জেদ ধরে বসে আছে।

যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে পাকিস্তানে এই আলোচনা শুরু করতে চেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। এই লক্ষ্যে রাজধানী ইসলামাবাদে এখন ব্যাপক নিরাপত্তা প্রস্তুতি চলছে।

এদিকে, পাকিস্তানের একটি নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে, দেশটির প্রধান মধ্যস্থতাকারী ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে জানিয়েছেন যে এই নৌ-অবরোধই আলোচনার পথে প্রধান অন্তরায়। জবাবে ট্রাম্প এই পরামর্শটি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতির সময়সীমা

গত ৭ এপ্রিল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সাথে এই দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছিলেন, তবে এটি ঠিক কোন সময়ে শেষ হবে তা সুনির্দিষ্টভাবে জানাননি। আলোচনার সাথে যুক্ত পাকিস্তানি একটি সূত্র জানিয়েছে, মঙ্গলবার পূর্ব উপকুলীয় সময় (ইএসটি) রাত ৮টায় এই মেয়াদ শেষ হবে; যা গ্রিনিচ মান সময় (জিএমটি) অনুযায়ী মধ্যরাত এবং ইরান সময় বুধবার ভোর সাড়ে ৩টা। সপ্তাহান্তে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প সরাসরি উত্তর দেন, ‘আমি জানি না। সম্ভবত মেয়াদ বাড়াব না। তবে অবরোধ আগের মতোই বহাল থাকবে।’

যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে তাদের অবরোধ বজায় রেখেছে। অন্যদিকে, ইরানও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে তাদের নিজস্ব অবরোধ তুলে নেওয়ার পর পুনরায় তা আরোপ করেছে। উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়।

যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রায় ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। শিপিং ডাটা বা জাহাজ চলাচলের তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালীতে বর্তমানে জাহাজ চলাচল স্থবির হয়ে পড়েছে; গত ১২ ঘণ্টায় সেখান দিয়ে মাত্র তিনটি জাহাজ পার হতে পেরেছে।

আরও পড়ুন—

ইরানি জাহাজে মার্কিন মেরিন সেনাদের অভিযান
মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, রোববার ইরানের বন্দর আব্বাসের দিকে অগ্রসরমান একটি ইরানি পতাকাবাহী কার্গো জাহাজের ওপর তারা গুলিবর্ষণ করেছে। প্রায় ছয় ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনার পর জাহাজটির ইঞ্জিন বিকল করে দেওয়া হয়। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে মার্কিন মেরিন সেনারা হেলিকপ্টার থেকে দড়ির সাহায্যে জাহাজটিতে নামছে।

সামুদ্রিক নিরাপত্তা সূত্রগুলো সোমবার জানিয়েছে, জাহাজটিতে সম্ভবত এমন কিছু পণ্য ছিল যা সামরিক কাজে ব্যবহার করা সম্ভব বলে মনে করছে ওয়াশিংটন।

ইরানি সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে জানিয়েছে, জাহাজটি চীন থেকে আসছিল। তারা এই ঘটনাকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সশস্ত্র জলদস্যুতা’ হিসেবে অভিহিত করেছে। তেহরান জানিয়েছে, এই ‘নগ্ন আগ্রাসনের’ বিরুদ্ধে তারা মার্কিন বাহিনীকে মোকাবিলা করতে প্রস্তুত ছিল, কিন্তু জাহাজে ক্রু সদস্যদের পরিবার থাকায় তারা সংযত রয়েছে।

ইরানি অপরিশোধিত তেলের প্রধান আমদানিকারক দেশ চীন এই ‘জোরপূর্বক বাধা প্রদানের’ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার আহ্বান জানিয়েছেন এবং এই সংঘাত রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের তাগিদ দিয়েছেন।

গত রোববার ট্রাম্প নতুন করে হুমকি দিয়ে বলেছেন, ইরান যদি তার শর্তগুলো প্রত্যাখ্যান করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রতিটি সেতু এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস করে দেবে।

পাল্টা জবাবে ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালায়, তবে তারাও উপসাগরীয় আরব প্রতিবেশী দেশগুলোর পাওয়ার স্টেশন এবং পানি শোধনাগারগুলোতে হামলা চালাবে।

অনিশ্চয়তার মুখে আলোচনার প্রস্তুতি
আলোচনা আদৌ সফল হবে কি না, তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা থাকা সত্ত্বেও আয়োজক দেশ হিসেবে পাকিস্তান ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। সরকারি ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, রাজধানী ইসলামাবাদে বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার নিরাপত্তা কর্মী মোতায়েন করা হয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের যুদ্ধ প্রচেষ্টায় পর্যাপ্ত সহায়তা না করায় বারবার সমালোচিত হওয়া ইউরোপীয় মিত্ররা এখন এক নতুন আশঙ্কায় ভুগছেন। তারা মনে করছেন, ওয়াশিংটনের আলোচক দল হয়তো একটি দ্রুত এবং ভাসা-ভাসা চুক্তির জন্য চাপ দিচ্ছে। অথচ এ ধরনের পরিস্থিতিতে সাধারণত কারিগরিভাবে অত্যন্ত জটিল আলোচনার প্রয়োজন হয়, যা শেষ করতে কয়েক মাস বা এমনকি কয়েক বছরও লেগে যেতে পারে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান এবং লেবাননে (যেখানে ইসরায়েলি আগ্রাসন চলছে) মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় এ পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। যদিও বর্তমানে উভয় ক্ষেত্রেই সাময়িক যুদ্ধবিরতি চলছে। ইরানও এসব হামলার জবাবে ইসরায়েল এবং পার্শ্ববর্তী আরব দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ড্রোন ও মিসাইল হামলা চালিয়েছে।—সূত্র: আরব নিউজ

/একেবি/

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর