মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

হরমুজ প্রণালিতে কীভাবে নৌ অবরোধ করছে যুক্তরাষ্ট্র?

ঢাকা মেইল ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০৩ পিএম

শেয়ার করুন:

হরমুজ প্রণালিতে কীভাবে নৌ অবরোধ করছে যুক্তরাষ্ট্র?

বিশ্বে জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ কার্যকর শুরু হয়েছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সোমবার থেকে কার্যকর হওয়া এই পদক্ষেপকে ঘিরে এই জলপথে নতুন করে উত্তেজনা বেড়েছে।

ট্রাম্পের ঘোষণা অনুযায়ী, অন্য কোনখান থেকে আসা বা যাওয়া জাহাজগুলোকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হবে এবং ইরানের ‘হামলাকারী জাহাজ’ কাছাকাছি এলে সেগুলো ‘ধ্বংস করে দেওয়া’ হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ নিয়ে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে এবং এর বাস্তব কার্যকারিতা নিয়েও রয়েছে নানা সংশয়।


বিজ্ঞাপন


যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলার প্রতিক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথটি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছিল ইরান। এরপর পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় যুদ্ধ অবসানে কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে দুই দেশ। এরপরই ট্রাম্পের কাছ থেকে অবরোধের ঘোষণা এলো।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে এ যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। এক মাসেরও বেশি সময় পর পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় দেশ দুটি।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, পাকিস্তানে ইরানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে, কারণ ইরান তার ‘পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করতে রাজি ছিল না।’

একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে, দুই পক্ষের মধ্যে মতবিরোধের তালিকা আরো দীর্ঘ ছিল, যার মধ্যে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এখন মার্কিন অবরোধের ঘোষণা সম্পর্কে যতটুকু জানা গেছে, তা এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হলো।


বিজ্ঞাপন


অবরোধ নিয়ে কী বলেছেন ট্রাম্প?

স্থানীয় সময় রোববার সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশ করতে বা সেখান থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করা সকল জাহাজ অবরোধ করতে যাচ্ছি।’

তিনি বলেন, ‘ইরানকে টোল প্রদান করেছে আন্তর্জাতিক জলসীমায় থাকা এমন প্রতিটি জাহাজকে খুঁজে বের করতে এবং বাধা দিতে আমি আমাদের নৌবাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছি। যারা অবৈধ টোল পরিশোধ করবে, তারা গভীর সমুদ্রে নিরাপদ চলাচলের সুবিধা পাবে না।’

ট্রাম্প আরো বলেন, হরমুজ প্রণালিতে ইরান যে মাইনগুলো পুঁতে রেখেছে বলে অভিযোগ রয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সেগুলো ধ্বংস করা শুরু করবে।

হুঁশিয়ারি দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘কোনো ইরানি যদি আমাদের ওপর বা শান্তিপূর্ণ কোনো জাহাজের ওপর হামলা চালায়, তাহলে তাদের ধ্বংস করে দেওয়া হবে!’

ট্রাম্প বলেছেন যে, ‘ওই অঞ্চলে ‘কোনো এক সময়ে’ অবাধ চলাচলের বিষয়ে একটি চুক্তি হবে, কিন্তু ‘ইরান তা হতে দেয়নি’। তারা কেবল এই বলে দায় এড়িয়েছে যে, ‘ওখানে কোথাও হয়তো মাইন পুঁতে রাখা থাকতে পারে', যা তারা ছাড়া আর কেউ জানে না।’

আরেক পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট উল্লেখ করেছেন, ‘ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু জেনেশুনে তারা তা করতে ব্যর্থ হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তাদের উচিত আন্তর্জাতিক এই জলপথটি দ্রুত উন্মুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করা!’

বাস্তবে কীভাবে কাজ করবে অবরোধ?

২০২২ সালের মার্কিন নৌবাহিনীর কমান্ডার'স হ্যান্ডবুক অন নেভাল অপারেশন ল অনুযায়ী, ব্লকেড বা অবরোধ হলো একটি ‘যুদ্ধকালীন অভিযান, যার মাধ্যমে শত্রু ও নিরপেক্ষ- উভয় পক্ষের জাহাজ ও বিমানকে কোনো শত্রু রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন বন্দর, বিমানবন্দর বা উপকূলীয় এলাকায় প্রবেশ বা সেখান থেকে প্রস্থান করতে বাধা দেওয়া হয়।’

ট্রাম্প শুরুতে বলেছিলেন যে মার্কিন নৌবাহিনী 'অবিলম্বে' এই প্রণালি অবরোধের প্রক্রিয়া শুরু করবে।

তবে, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম পরবর্তীতে জানায়, তাদের বাহিনী সোমবার স্থানীয় সময় সকাল ১০টা (জিএমটি সময় দুপুর দুইটা, যা বাংলাদেশ সময় সোমবার রাত আটটা) থেকে এ অবরোধ কার্যকর করা শুরু করবে।

সেন্টকম জানিয়েছে, ‘ইরানি বন্দর এবং উপকূলীয় এলাকায় প্রবেশকারী বা সেখান থেকে ছেড়ে যাওয়া সমস্ত দেশের জাহাজের বিরুদ্ধে সমানভাবে এ অবরোধ প্রয়োগ করা হবে। এর মধ্যে আরব সাগর এবং ওমান উপসাগরে অবস্থিত সমস্ত ইরানি বন্দর অন্তর্ভুক্ত থাকবে।’

-Hormuzসেন্টকম আরো জানায়, মার্কিন বাহিনী ওই এলাকায় অবস্থিত ইরান বাদে অন্য দেশের বন্দরে যাতায়াতকারী জাহাজের চলাচলের স্বাধীনতায় বাধা দেবে না।

বাংলাদেশ সময় সোমবার রাত আটটা থেকে ওই অবরোধ কার্যকর হয়েছে বলে মার্কিন বাহিনী জানিয়েছে।

ট্রাম্প বলেছেন যে, এই প্রণালি অবরোধে অন্য দেশও যুক্ত হবে, তবে তিনি নির্দিষ্ট কোনো দেশের নাম উল্লেখ করেননি। যুক্তরাজ্য এই অবরোধে অংশ নেবে না।

ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেন যে, ন্যাটো এ প্রণালি 'পরিষ্কার' করতে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে এবং খুব শীঘ্রই এটি পুনরায় ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত হবে।’

ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ওই এলাকায় মাইন অপসারণকারী জাহাজ মোতায়েন করবে এবং ন্যাটোর সদস্য হিসেবে যুক্তরাজ্যও তা করবে।

এর আগে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার বলেছিলেন, যুক্তরাজ্যের সামরিক বাহিনীর মাইন-হান্টিং সিস্টেম ইতিমধ্যে ওই অঞ্চলে রয়েছে।

ব্রিটিশ সরকারের একজন মুখপাত্র বলেছেন, ‘আমরা নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা রক্ষায় ফ্রান্স এবং অন্যান্য অংশীদারদের সাথে একটি বড় জোট গঠনের জন্য জরুরিভাবে কাজ করছি।’ তবে স্যার কিয়ার স্টারমার স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, যুক্তরাজ্য মার্কিন অবরোধে যোগ দেবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের তিনজন আইন বিশেষজ্ঞ বলেছেন, এ ধরনের অবরোধ সমুদ্র আইনের লঙ্ঘন হতে পারে। একজন বিশেষজ্ঞ এ প্রশ্নও তুলেছেন যে, সামরিক শক্তি ব্যবহার করে কার্যকর করা এ অবরোধ বর্তমান যুদ্ধবিরতি চুক্তিকেও লঙ্ঘন করবে কি-না।

কেন হরমুজ প্রণালি অবরোধ করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র?

হরমুজ প্রণালির ভৌগোলিক অবস্থান ইরানকে যুদ্ধের পুরো সময় জুড়ে একে একটি কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ করে দিয়েছে। এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে ইরান নিজের বাছাই করা দেশের জাহাজ চলাচলে বাধা দিয়ে কার্যত আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে।

তেহরান কিছু নির্দিষ্ট জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়ার বিনিময়ে বিশাল অঙ্কের অর্থ আদায় করছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ।

এখন এ প্রণালিটি বন্ধ করে দেওয়ার মাধ্যমে ট্রাম্প ইরান সরকারের আয়ের একটি বড় উৎস বন্ধ করে দিতে পারেন বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা, যদিও আবার এর ফলে তেল ও গ্যাসের দাম আরও বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।

ট্রাম্প ফক্স নিউজকে বলেছেন, ‘ইরান তাদের পছন্দের লোকদের কাছে তেল বিক্রি করে টাকা আয় করবে আর অপছন্দের লোকদের কাছে বিক্রি করবে না- সেটা আমরা হতে দেব না।’

মার্কিন প্রসিডেন্ট আরো বলেছেন, তার লক্ষ্য হচ্ছে এটা নিশ্চিত করা যে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে হয় ‘হয় সবাই পার হবে, নয়তো কেউই যেতে পারবে না’।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, ট্রাম্পের এ বক্তব্য মূলত আমেরিকার শর্ত অনুযায়ী একটি চুক্তিতে আসতে ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছে।

রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য মাইক টার্নার সিবিএসকে বলেছেন যে, এ অবরোধ পরিস্থিতি সমাধানের একটি পথ। তিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট যখন বলেছেন যে, আমরা কেবল ইরানকে একা সিদ্ধান্ত নিতে দেব না যে ওই প্রণালি দিয়ে কারা পার হবে, তখন তিনি মূলত আমাদের সব মিত্র এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে আলোচনার টেবিলে আসার আহ্বান জানাচ্ছেন।’

তবে, সিনেট ইন্টেলিজেন্স কমিটির শীর্ষস্থানীয় ডেমোক্র্যাট সদস্য এবং ভার্জিনিয়ার সিনেটর মার্ক ওয়ার্নার সিএনএনকে বলেছেন, ‘আমি বুঝতে পারছি না যে, প্রণালিটি অবরোধ করে কীভাবে ইরানকে সেটি খুলে দিতে বাধ্য করবে!’

অবরোধের প্রভাব কী হতে পারে?

শিপিং বিশেষজ্ঞ লারস জেনসেন বলেছেন, নিকট ভবিষ্যতে ট্রাম্পের এই প্রণালি অবরোধ করার হুমকি কেবল গুটিকয়েক জাহাজের ওপর প্রভাব ফেলবে, যেগুলো এখনও এই জলপথ দিয়ে চলাচল করছে।

তিনি বলেন, ‘যদি আমেরিকানরা সত্যিই এটি করে, তবে তা কেবল হাতেগোনা কিছু জাহাজের চলাচল বন্ধ করবে। সামগ্রিক পরিস্থিতির বিচারে এতে আসলে খুব একটা পরিবর্তন আসবে না।’

ভেসপুচি মেরিটাইম নামক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী জেনসেন বলেন, ইরানকে টোল প্রদানকারী যেকোনো জাহাজের নিরাপদ চলাচল বাধাগ্রস্ত করার যে হুমকি ট্রাম্প দিয়েছেন, তার প্রভাবও হবে সামান্য।

কারণ, যেসব কোম্পানি ইরানকে অর্থ প্রদান করে তারা আগে থেকেই নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে, ফলে নতুন সিদ্ধান্তে তাদের ওপর কোন প্রভাব পড়বে না।

জেনসেন আরও বলেন যে, বেশিরভাগ শিপিং কোম্পানি আপাতত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে এবং দেখবে যে কোনো সম্ভাব্য শান্তি চুক্তি হয় কি-না এবং হলেও তা স্থায়ী হয় কি না। যদি তেমনটি ঘটে, তবে জাহাজ চলাচল ধীরে ধীরে আবার শুরু হতে পারে। সূত্র: বিবিসি বাংলা।

এমআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর