শনিবার, ৪ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

বলপ্রয়োগে হরমুজ প্রণালি খোলার প্রস্তাবে রাশিয়া-চীন-ফ্রান্সের ভেটো

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৫৩ এএম

শেয়ার করুন:

বলপ্রয়োগে হরমুজ প্রণালি খোলার প্রস্তাবে রাশিয়া-চীন-ফ্রান্সের ভেটো

ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকা হরমুজ প্রণালি জোরপূর্বক খুলতে সামরিক পদক্ষেপের অনুমোদন চেয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে (UNSC) আনা প্রস্তাব ভেটো দিয়ে আটকে দিয়েছে রাশিয়া, চীন ও ফ্রান্স।

জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস পরিবহন হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার পর এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেয় ইরান। গত কয়েক সপ্তাহে এই অবরোধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে এবং কাতারসহ উপসাগরীয় দেশগুলো গ্যাস উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে, যার ফলে বার্ষিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।


বিজ্ঞাপন


ইরানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, প্রণালিটি এখন তাদের নৌবাহিনীর দৃঢ় নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং শত্রুদের জন্য এটি বন্ধই থাকবে। এই অবরোধের ফলে গত এক মাসে পারস্য উপসাগরে অন্তত ২ হাজার ১৯০টি বাণিজ্যিক জাহাজ আটকা পড়েছে, যার মধ্যে ৩২০টির বেশি তেল ও গ্যাসবাহী ট্যাংকার।

এতে উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি রফতানি ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বিশ্ববাজারে জ্বালানি সংকট আরও তীব্র হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালি খুলতে জাতিসংঘের মাধ্যমে বলপ্রয়োগের অনুমতি চেয়ে নিরাপত্তা পরিষদে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করে বাহরাইন। প্রস্তাবটি ঘিরে  শুক্রবার (৩ এপ্রিল) ভোট হওয়ার কথা ছিল।

তবে ভেটো ক্ষমতাধর তিন দেশ— রাশিয়া, চীন ও ফ্রান্স এর বিরোধিতা করায় প্রস্তাবটি পাস হয়নি। দেশগুলো জানায়, সামরিক শক্তি ব্যবহারের অনুমোদন দেয় এমন কোনো উদ্যোগের তারা নীতিগতভাবে বিপক্ষে।


বিজ্ঞাপন


জাতিসংঘের কূটনৈতিক সূত্র বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন ইস্যুতে চীন ও রাশিয়া প্রায়ই ইরানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে ফ্রান্সের অবস্থান নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, সামরিক অভিযানের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার ধারণা ‘অবাস্তব’। দক্ষিণ কোরিয়া সফরকালে তিনি বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময় লাগবে এবং এতে নৌ চলাচল আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে।

তিনি আরও জানান, সংঘাত শেষে হরমুজ প্রণালি দিয়ে অবাধ নৌ চলাচল নিশ্চিত করতে ইউরোপীয় ও মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করবে ফ্রান্স। একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেন, এ সংকটের সমাধান কেবল ইরানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমেই সম্ভব।

বাহরাইন প্রস্তাব করেছিল যে, আন্তর্জাতিক নৌবাহিনীকে ‘প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা’ (যা মূলত সামরিক পদক্ষেপের সংকেত) নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হোক। তবে রাশিয়া, চীন ও ফ্রান্স এই সামরিক পন্থার তীব্র বিরোধিতা করে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ এই পদক্ষেপকে ‘অবাস্তব’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন যে, সামরিক শক্তি প্রয়োগ করলে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস (IRGC)-এর ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকি আরও বেড়ে যাবে, যা গোটা অঞ্চলকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার পর থেকে ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি ও অবকাঠামো লক্ষ্য করে হাজার হাজার পাল্টা হামলা চালিয়েছে। বাহরাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল লতিফ বিন রশিদ আল জায়ানি এই হামলাগুলোকে ‘পরিকল্পিত ও আগ্রাসী’ বলে নিন্দা জানিয়েছেন।

ওমান ও কাতারের মতো দেশগুলো আগে মধ্যস্থতার চেষ্টা করলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে পাকিস্তান, তুরস্ক এবং মিশর পরিস্থিতি শান্ত করতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। তবে সৌদি আরব ভিত্তিক গালফ রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান আব্দুল আজিজ সাগের মনে করেন, কোনো যুদ্ধবিরতি সম্ভব নয় যতক্ষণ না ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সক্ষমতা এবং এই প্রণালির ওপর তাদের একক নিয়ন্ত্রণ হ্রাস করা যাচ্ছে।

নিরাপত্তা পরিষদে এই অচলাবস্থার কারণে অদূর ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার কোনো কূটনৈতিক সমাধান দেখা যাচ্ছে না। এর ফলে একদিকে যেমন মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দামামা বাজছে, অন্যদিকে ভারত ও বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে জ্বালানি ও সারের দাম ব্যাপকভাবে বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এফএ

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর