আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার পর দেশটির প্রধান শহরগুলোতে বিমান হামলা চালাচ্ছে পাকিস্তান। সীমান্তে পাল্টা হামলা অব্যাহত রেখেছে আফগানিস্তানও। এর ফলে দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে চলা দুই প্রতিবেশী দেশের সীমান্ত উত্তেজনা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। উভয় দেশই সংঘর্ষে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কথা জানিয়েছে।
আফগান ও পাক কর্মকর্তারা জানান, আফগান ভূখণ্ড থেকে পাকিস্তানি সীমান্ত বাহিনীর ওপর হামলার জবাবে সীমান্তজুড়ে বিভিন্ন সেক্টরে তালেবানের সামরিক পোস্ট, সদর দফতর ও গোলাবারুদ ডিপো লক্ষ্য করে আকাশ ও স্থলপথে হামলা চালানো হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
মূলত, গত সপ্তাহে আফগানিস্তানে পাকিস্তানের বিমান হামলার পর থেকেই দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা নতুন করে চরমে ওঠে। এর আগে, গত বছরের অক্টোবরে দুই দেশের সীমান্ত সংঘর্ষে কয়েক ডজন সেনা নিহত হয়। সে সময় তুরস্ক, কাতার ও সৌদি আরবের মধ্যস্থতায় একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল। তবে সেটি শেষ পর্যন্ত টেকসই হয়নি।
প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে দ্বন্দ্ব কেন?
২০২১ সালে তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতায় ফিরে এলে পাকিস্তান তাদের স্বাগত জানিয়েছিল। তৎকালীন পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলেছিলেন, আফগানরা ‘দাসত্বের শৃঙ্খল’ ভেঙে ফেলেছে। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই ইসলামাবাদের মনে হয়, তালেবানরা তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী ততটা বন্ধুত্বপূর্ণ নয়।
বিজ্ঞাপন
পাকিস্তানের অভিযোগ, নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) শীর্ষ নেতৃত্ব ও অনেক যোদ্ধারা আফগানিস্তানে অবস্থান করছে। একই সঙ্গে পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ বেলুচিস্তানের স্বাধীনতাকামী বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)-সহ বিদ্রোহীরা আফগান ভূখণ্ডকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করছে।
বৈশ্বিক নজরদারি সংস্থা ‘আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডাটা’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সাল থেকে টিটিপি ও বেলুচ বিদ্রোহীদের হামলার হার প্রতি বছর বেড়েই চলেছে।
তবে তালেবান সরকার বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে তারা কাউকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে হামলার জন্য আফগান মাটি ব্যবহার করতে দিচ্ছে না। তাদের উল্টো অভিযোগ পাকিস্তান তাদের শত্রু সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) যোদ্ধাদের আশ্রয় দিচ্ছে, তবে ইসলামাবাদ এ দাবি নাকচ করেছে।
ইসলামাবাদের দাবি, আফগানিস্তান থেকে জঙ্গি হামলা বন্ধ না হওয়ায় আগের যুদ্ধবিরতি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি এবং বারবার সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। এর জেরে সীমান্ত বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে দুই দেশের বাণিজ্য ও সাধারণ মানুষের যাতায়াত ব্যহত হচ্ছে।
সংঘাতের সূত্রপাত কীভাবে?
গত সপ্তাহের হামলার আগের দিন পাকিস্তানের নিরাপত্তা সূত্রগুলো দাবি করে, তাদের কাছে ‘অকাট্য প্রমাণ’ আছে যে আফগানিস্তানে অবস্থানরত উগ্রবাদীরাই পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ও পুলিশকে লক্ষ্য করে সাম্প্রতিক হামলা ও আত্মঘাতী বোমা হামলাগুলোর নেপথ্যে রয়েছে।
সূত্রগুলো জানায়, ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকে এখন পর্যন্ত উগ্রবাদীদের চালানো সাতটি পরিকল্পিত বা সফল হামলার একটি তালিকা তাদের কাছে রয়েছে, যেগুলোর সঙ্গে আফগানিস্তানের সম্পৃক্ততা আছে বলে তারা দাবি করছে।
পাকিস্তানি নিরাপত্তা সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে বাজাউড় জেলায় ১১ জন নিরাপত্তা সদস্য ও দুই বেসামরিক নাগরিকের প্রাণহানির ঘটনায় যে হামলা চালানো হয়, সেটি একজন আফগান নাগরিকের কাজ। এই হামলার দায় স্বীকার করেছে টিটিপি।
‘পাকিস্তানি তালেবান’ আসলে কারা?
২০০৭ সালে পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে সক্রিয় একাধিক উগ্রবাদী সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত হয় তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি), যা সাধারণভাবে ‘পাকিস্তানি তালেবান’ নামে পরিচিত।
টিটিপি বিভিন্ন বাজার, মসজিদ, বিমানবন্দর, সামরিক ঘাঁটি ও পুলিশ স্টেশনে হামলা চালিয়েছে। তারা একসময় বেশ কিছু এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণেও নেয়। এসব এলাকার বেশিরভাগই আফগানিস্তান সীমান্তসংলগ্ন হলেও সোয়াত উপত্যকাসহ পাকিস্তানের ভেতরের আরও বহু অঞ্চলে তাদের উপস্থিতি ছিল।
২০১২ সালে তৎকালীন স্কুলছাত্রী মালালা ইউসুফজাইয়ের ওপর হামলার পেছনেও ছিল এই টিটিপি জঙ্গিরা। হামলার দুই বছর পর নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন মালালা।
এছাড়াও টিটিপি আফগানিস্তানে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনীর বিরুদ্ধে আফগান তালেবানের পক্ষে লড়াই করেছে এবং পাকিস্তানে আফগান যোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছে।
পাকিস্তান নিজ ভূখণ্ডে টিটিপির বিরুদ্ধে একাধিক সামরিক অভিযান চালিয়ে সীমিত সাফল্য পেয়েছে। যদিও ২০১৬ সালে শেষ হওয়া একটি বড় অভিযানের পর কয়েক বছর ধরে হামলা ও সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছিল।
এরপর কী হতে পারে?
বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় পাকিস্তান তাদের সামরিক অভিযান আরও জোরদার করতে পারে। অন্যদিকে কাবুলের পক্ষ থেকে পাল্টা প্রতিক্রিয়া আসতে পারে সীমান্ত চৌকিতে হামলা এবং নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্য করে আরও আন্তঃসীমান্ত গেরিলা অভিযানের মাধ্যমে।
কাগজে-কলমে দুই পক্ষের সামরিক সক্ষমতার মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে। তালেবানের সৈন্যসংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৭২ হাজার, যা পাকিস্তানের সৈন্যসংখ্যার তিন ভাগের এক ভাগেরও কম। তালেবানের হাতে অন্তত ছয়টি বিমান ও ২৩টি হেলিকপ্টার রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তবে এসবের বর্তমান অবস্থান ও কার্যক্ষমতা সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য নেই। তাদের কোনো যুদ্ধবিমান বা কার্যকর বিমানবাহিনীও নেই।
অন্যদিকে, ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ-এর ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীতে ৬ লাখের বেশি সক্রিয় সদস্য রয়েছে। দেশটির কাছে ৬ হাজারের বেশি সাঁজোয়া যুদ্ধযান এবং ৪০০-এর বেশি যুদ্ধবিমান রয়েছে। এছাড়া পাকিস্তান একটি পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র।
সূত্র: রয়টার্স
এমএইচআর

