ইসরায়েলের লাগামহীন সামরিক আগ্রাসনে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়েছে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে। গত বছর কাতারে হামলার পর নড়েচড়ে বসছে আরব দেশগুলো। এর মধ্যেই নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে এক ঐতিহাসিক ও কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে পাকিস্তান ও সৌদি আরব। এবার সেই জোটে তৃতীয় দেশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হতে যাচ্ছে তুরস্ক।
বিজ্ঞাপন
গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের উপস্থিতিতে দুই দেশের মধ্যে স্ট্র্যাটেজিক মিউচ্যুয়াল ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট (এসডিএমএ) চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। এই সমঝোতাকে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তি শুধু সামরিক সহযোগিতার নয়, বরং এটি মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা সংকটের প্রেক্ষাপটে একটি কৌশলগত বার্তা বহন করে। চুক্তিতে বলা হয়েছে, কোনো একটি দেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসন ঘটলে, তা উভয় দেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসন হিসেবে বিবেচিত হবে। অর্থাৎ একে অপরের বিরুদ্ধে হামলার প্রতিক্রিয়ায় যৌথ প্রতিরোধ গড়ে তোলার বিষয়টি চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।
এই চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, পাকিস্তানের পরমাণু অস্ত্র। বিশ্বে পাকিস্তানই একমাত্র মুসলিম দেশ, যারা পরমাণু অস্ত্র আছে। চুক্তির আওতায় এই পরমাণু অস্ত্রও রয়েছে। এছাড়াও ৬ লাখ সেনাসমৃদ্ধ পাকিস্তানের সেনাবাহিনী বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীগুলোর মধ্যে অন্যতম। এসব কারণেই আশা করা হচ্ছিল এই শিগগিরই এই জোটে যোগ দিতে পারে তুরস্ক।
বিজ্ঞাপন
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসডিএমএ জোটে অন্তর্ভুক্তি নিয়ে গত অক্টোবর থেকে সৌদি ও পাকিস্তানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ-আলেচনা চলছিল তুরস্কের কর্মকর্তাদের। সেই আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে। এই পর্ব শেষ হলেই এসডিএমএ জোটে যোগ দেবে তুরস্ক।
এতে আরও বলা হয়েছে, সম্প্রসারিত জোটটি যুক্তিসঙ্গত হবে কারণ তুরস্কের স্বার্থ ক্রমশ দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং এমনকি আফ্রিকায় সৌদি আরব এবং পাকিস্তানের স্বার্থের সঙ্গে মিল রয়েছে যাচ্ছে। তিনটি দেশের সঙ্গে শক্তিশালী সামরিক সম্পর্ক থাকা যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরযোগ্যতা এবং ন্যাটোর প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তুরস্ক এই চুক্তিটিকে নিরাপত্তা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করার একটি উপায় হিসেবেও দেখে।
আঙ্কারা-ভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক টিইপিএভি-এর কৌশলবিদ নিহাত আলী ওজকানের মতে, রিয়াদের আর্থিক সক্ষমতা, ইসলামাবাদের পারমাণবিক ক্ষমতা, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং জনবল রয়েছে, যেখানে তুরস্ক সামরিক অভিজ্ঞতা ও একটি উন্নত প্রতিরক্ষা শিল্প গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যখন এই অঞ্চলে তার নিজস্ব এবং ইসরায়েলের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, তখন আঞ্চলিক সংঘাতের পরিবর্তনশীলতা এবং পরিণতি দেশগুলোকে বন্ধু এবং শত্রু শনাক্ত করার জন্য নতুন পদ্ধতি তৈরি করতে উৎসাহিত করছে।’
যদিও এ বিষয়ে পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় এবং তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এছাড়াও সৌদি কর্তৃপক্ষও ব্লুমবার্গের অনুরোধে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি।
তবে পাকিস্তান ও সৌদি আরবের চুক্তিত স্বাক্ষরের দুই দিন পর ১৯ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম জিও নিউজের ‘আজ শাহজেব খানজাদাকে সাথ’ অনুষ্ঠানে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ। সেখানে তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, আরও দেশ সৌদি-পাকিস্তানের এই চুক্তির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে কি না, বিশেষত আরব দেশগুলো।
জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘আমাদের এই চুক্তিটি ন্যাটোর আদলে তৈরি করা হয়েছে; অর্থাৎ এটি প্রতিরক্ষামূলক, আক্রমণাত্মক নয়। দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর মতো একই ধরণের ব্যবস্থার আহ্বান জানিয়ে এসেছেন তিনি। কারণ পাকিস্তানের জন্য এটি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
মুসলিমপ্রধান দেশগুলোর নিরাপত্তার কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘নিজেদের ভূমি এবং জাতিকে রক্ষা করা যেকোনও রাষ্ট্র, বিশেষত মুসলিম জনগোষ্ঠীর মৌলিক অধিকার বলে আমি মনে করি।’
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী নির্দিষ্ট করে কোনও দেশের নাম উল্লেখ করেননি। তবে মনে করিয়ে দিয়েছেন, সৌদির সঙ্গে চুক্তিতে এমন কোনও শর্ত নেই যে, অন্য কোনও দেশ এতে যোগ দিতে পারবে না কিংবা পাকিস্তান অন্য কোনও দেশের সঙ্গে আলাদা করে অনুরূপ চুক্তি স্বাক্ষর করতে পারবে না। ফলে চাইলেই অন্য যেকোনও দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করতে পারে ইসলামাবাদ।
সূত্র: ডন
এমএইচআর

