সোমবার, ৫ জানুয়ারি, ২০২৬, ঢাকা

এক বছরে সাত দেশে ৬ শতাধিক হামলা চালিয়েছেন ট্রাম্প

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:০৩ পিএম

শেয়ার করুন:

এক বছরে সাত দেশে ৬ শতাধিক হামলা চালিয়েছেন ট্রাম্প

নিজেকে ‘শান্তির প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে প্রচার ও ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে আটটি যুদ্ধ বন্ধের দাবি জানিয়ে নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার তীব্র আকাঙ্খা ব্যক্ত করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে গত জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদের ক্ষমতাগ্রহনের পর থেকে এক বছরেই তার নির্দেশে বিশ্বের অন্তত সাতটি দেশে শক্তিশালী বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।

স্বাধীন সংঘাত পর্যবেক্ষক সংস্থা ‘আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা’র (এসিএলইডি) পর্যবেক্ষণে এই তথ্য উঠে এসেছে।


বিজ্ঞাপন


এসিএলইডি আল জাজিরাকে জানিয়েছে, ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি ট্রাম্প ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র বিদেশে ড্রোন বা বিমান ব্যবহার করে মোট ৬২২টি বোমা হামলা চালিয়েছে। এই হামলাগুলো বিদেশে যুদ্ধে না জড়ানোর বিষয়ে ভোটারদের দেওয়া তার প্রতিশ্রুতির সম্পূর্ণ বিপরীত।

গত এক বছরে কোন কোন দেশে বোমা হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র?

এসিএলইডির পর্যবেক্ষণ বলছে, ২০২৫ সালে মোট সাতটি দেশে সামরিক হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যে ৬টিই মুসলিমপ্রধান দেশ।

ভেনেজুয়েলা এবং ক্যারিবীয় সাগর

শুক্রবার (০২ জানুয়ারি) মধ্যরাত থেকে ভেনিজুয়েলায় ব্যাপক হামলা চালানোর পর দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত বিগত কয়েক মাসে মাদক পাচারবিরোধী অভিযানের নামে ভেনেজুয়েলার ভূখণ্ড ও জলসীমায় হামলা চালিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। এরমধ্যে গত ডিসেম্বরের শেষে সপ্তাহে ভেনেজুয়েলার ভূখণ্ডে একটি ডকিং ফ্যাসিলিটিতে হামলা চালানোর বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিত করেছে। 

মূলত চলতি বছরের আগস্ট থেকে ক্যারিবীয় সাগরে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক উপস্থিতি মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প প্রশাসন এই পদক্ষেপকে যৌক্তিক ও ‘জাতীয় জরুরি অবস্থা’ হিসেবে উল্লেখ করছে। তবে তবে একাধিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে- ভেনেজুয়েলা সীমান্ত পেরিয়ে মাদক পরিবহনের একটি প্রধান উৎস নয়।

পরবর্তীতে গত ২ সেপ্টেম্বর থেকে মাদক পাচারের অভিযোগে ক্যারিবীয় অঞ্চলে ছোট নৌকাগুলোতে হামলা শুরু করে। ধারণা করা হয়- তখন থেকে অন্তত ৩০টি ছোট নৌকায় হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। 

ট্রাম্প প্রশাসন বলেছে, জাহাজগুলো ভেনেজুয়েলার সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো দ্বারা পরিচালিত হয়, যার মধ্যে রয়েছে ট্রেন ডি আরাগুয়া গ্রুপ এবং কলম্বিয়ান ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি। তবে এর পক্ষে কোনও প্রমাণ তারা দেয়নি।

১৬ ডিসেম্বর হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এক প্রতিবেদনে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের এসব হামলায় কমপক্ষে ৯৫ জন নিহত হয়েছেন। একই সঙ্গে এসব মৃত্যুকে 'বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড' হিসেবে আখ্যা দিয়েছে সংস্থাটি। বিশেষ করে ২ সেপ্টেম্বরের হামলায় ‘ডাবল ট্যাপ’—অর্থাৎ প্রথম হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরা পানিতে ভাসমান অবস্থায় থাকাকালে দ্বিতীয় দফা হামলা চালিয়ে তাদের হত্যা করার অভিযোগ উঠেছে। 

নাইজেরিয়া

গত ২৫ ডিসেম্বর বড়দিনে নাইজেরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় সোকোতো রাজ্যে হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী, যা ছিল দেশটির যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম সরাসরি সামরিক অভিযান। ওয়াশিংটনের দাবি, আইএসআইএল (আইএস)–সংশ্লিষ্ট জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোকে লক্ষ্য করেই এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।

এই হামলার আগে কয়েক সপ্তাহ ধরে নাইজেরিয়া সরকারের ওপর কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে আসছিল যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প ও টেড ক্রুজসহ সিনিয়র রিপাবলিকান নেতারা নাইজেরিয়া সরকারের বিরুদ্ধে ‘খ্রিস্টান গণহত্যায়’ মদদ দেওয়ার অভিযোগ তুলেছিলেন। তবে নাইজেরিয়া সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, দেশটিতে চলমান সহিংসতায় মুসলিম ও খ্রিস্টান—উভয় সম্প্রদায়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

সোমালিয়া

সোমালিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই আল-কায়েদা–সংশ্লিষ্ট আল-শাবাব এবং আইএসআইএল-এর একটি শাখার বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালিয়ে আসছে। ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে এখান থেকে বেশিরভাগ মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার করলেও, ২০২২ সালে বাইডেন প্রশাসন তাদের পুনরায় মোতায়েন করে। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে এসে সোমালিয়ায় বিমান হামলার মাত্রা অভাবনীয়ভাবে বেড়েছে। 

পর্যবেক্ষকদের মতে, চলতি বছর সোমালিয়ায় অন্তত ১১১টি হামলা চালানো হয়েছে, যা বুশ, ওবামা ও বাইডেন প্রশাসনের সময়কার সম্মিলিত হামলার সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে। তবে এসব বিমান হামলায় বেসামরিক প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। 

গত মাসে সোমালিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে একটি হামলায় ৭ শিশুসহ অন্তত ১১ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। যদিও যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত সোমালিয়ায় বেসামরিক নিহতের সঠিক সংখ্যা প্রকাশ্যে জানায় না।

সিরিয়া

গত ১৯ ডিসেম্বর সিরিয়ায় আইএসআইএল-এর ৭০টি অবস্থানে বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এক সপ্তাহ আগে পালমিরায় এক বন্দুকযুদ্ধে দুই মার্কিন সেনা এবং একজন দোভাষী নিহতের প্রতিশোধ হিসেবে এই হামলা চালানো হয়। যদিও কোনো গোষ্ঠী এই হামলার দায় স্বীকার করেনি, তবে ট্রাম্প সরাসরি আইএসআইএল-কে এর জন্য দায়ী করেছেন।

নিহত দুই সেনা সদস্যের নিজ রাজ্য আইওয়ার নামানুসারে এই অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন হকআই’। এই হামলায় জঙ্গিদের বেশ কয়েকটি অস্ত্রাগার ধ্বংস হয়েছে।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার আগে ট্রাম্প সিরিয়ার যুদ্ধ থেকে দূরে থাকার কথা বললেও, ক্ষমতা গ্রহণের পর তিনি সন্ত্রাসীদের দমনে ‘চরম প্রতিশোধ’ নেওয়ার নীতি গ্রহণ করেছেন।

ইরান

চলতি বছরের ১৩ জুন শুরু হওয়া ইরান ও ইসরায়েলের ১২ দিনের সংঘাতের শেষ দিনে সরাসরি যোগ দেয় যুক্তরাষ্ট্রও। গত ২২ জুন ইরানের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পরমাণু স্থাপনা— ফোরদো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে শক্তিশালী বিমান ‘বি২’। এতে ওই স্থাপনাগুলোর উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়। 

ট্রাম্প দাবি করেছেন, তেহরানের পারমাণবিক হুমকি মোকাবিলা করতেই এই হামলা চালানো হয়েছে। এই হামলার কয়েকঘণ্ট পরই ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন ট্রাম্প।

ইয়েমেন

লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে ইরান সমর্থিত গোষ্ঠী হুথি বিদ্রোহীদের হামলার প্রতিবাদে ২০২৪ সালের শুরু থেকেই ইয়েমেনে হামলা চালিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে ২০২৫ সালের ১৫ মার্চ থেকে ৬ মে পর্যন্ত ‘অপারেশন রাফ রাইডার’ নামে এই অভিযানে হামলা আরও তীব্র হয়। ওমানের মধ্যস্থতায় মে মাসে যুদ্ধবিরতি হওয়ার আগ পর্যন্ত মার্কিন হামলায় ইয়েমেনের বন্দর, বিমানবন্দর, রাডার সিস্টেম এবং নানা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস হয়।

যুক্তরাষ্ট্র দাবি, অভিযানে তারা প্রায় ৫০০ হুথি যোদ্ধাকে হত্যা করেছে। তবে ইয়েমেনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মার্কিন হামলায় অন্তত ১২৩ জন নিহত হয়েছে, যাদের বেশিরভাগই ছিল সাধারণ নাগরিক।

ইরাক

গত ১৩ মার্চ ইরাকের আল-আনবার প্রদেশে আইএসের শীর্ষ নেতাদের লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালায় মার্কিন প্রতিরক্ষা বাহিনীর। এতে আইএসআইএল-এর দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা আবদুল্লাহ ‘আবু খাদিজা’ নিহত হন। ইরাকি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যৌথ সমন্বয়ে এই অভিযানটি চালানো হয়। ট্রাম্প এই সফলতার প্রশংসা করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, ‘শক্তির মাধ্যমেই শান্তি আসবে।’

সূত্র: আলজাজিরা 

এমএইচআর

 

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর