সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

তেল যেভাবে রাশিয়া, চীন ও ভারতকে আরও কাছাকাছি আনল

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৭:৪৯ এএম

শেয়ার করুন:

তেল যেভাবে রাশিয়া, চীন ও ভারতকে আরও কাছাকাছি আনল
তেল যেভাবে রাশিয়া, চীন ও ভারতকে আরও কাছাকাছি আনল

রাশিয়া, চীন ও ভারতের মধ্যে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঘনিষ্ঠতা তেলের কারণে নতুন মাত্রা পেয়েছে। চীনের তিয়ানজিন শহরে অনুষ্ঠিত দুদিনব্যাপী সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও) সম্মেলনে এক টেবিলে মিলিত হন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এই সম্মেলনটি ছিল কেবল আঞ্চলিক সংহতির নয়, বরং ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।

২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযানের পর পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এই নিষেধাজ্ঞার ফলে রাশিয়া আন্তর্জাতিক বাজারে একঘরে হয়ে পড়ে এবং তাদের তেল রফতানি বাধাগ্রস্ত হয়। তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে রাশিয়া তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়। এই সুযোগে ভারত ও চীন সস্তায় বিপুল পরিমাণ রুশ তেল আমদানি শুরু করে।

সস্তা তেল কেনার মধ্য দিয়ে শুরু হলেও, এখন এই তিন দেশের সম্পর্ক শুধু জ্বালানির গণ্ডি ছাড়িয়ে কৌশলগত বন্ধুত্বে পরিণত হচ্ছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ, শুল্ক আরোপ ও নিষেধাজ্ঞার পরিপ্রেক্ষিতে রাশিয়া, চীন ও ভারত পরস্পরকে ‘নির্ভরযোগ্য অংশীদার’ হিসেবে গুরুত্ব দিচ্ছে।

রাশিয়া এখন তাদের মোট তেল রফতানির বড় একটি অংশ ভারত ও চীনে পাঠাচ্ছে। চীন গত বছর রাশিয়া থেকে রেকর্ড ১০ কোটিরও বেশি টন ক্রুড অয়েল আমদানি করেছে, যা দেশটির মোট তেল আমদানির ২০ শতাংশের বেশি। অন্যদিকে, ২০২২ সালের পর ভারত রাশিয়ার সবচেয়ে বড় তেল আমদানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে। সে বছর রুশ তেল রফতানির পরিমাণ প্রায় ১৪০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।

রাশিয়ার জাতীয় বাজেটের প্রায় এক-চতুর্থাংশ আসে তেল ও গ্যাস রফতানি থেকে। এই আয় দিয়েই ইউক্রেন যুদ্ধের খরচ বহন করছে মস্কো। ফলে রাশিয়ার জন্য ভারত ও চীনের বাজার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র তাদের মিত্র ও অংশীদার দেশগুলোকে রাশিয়ার সঙ্গে ব্যবসা না করার জন্য চাপ দিচ্ছে। এমনকি ভারতের ওপর ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্কও আরোপ করা হয়েছে। চীনকেও একই ধরনের নিষেধাজ্ঞার হুমকি দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই চাপ রাশিয়া, চীন ও ভারতকে আরও ঘনিষ্ঠ হতে বাধ্য করছে।

আরও পড়ুন

চীন-রাশিয়ার ছায়ায় মোদি, কূটনীতির পালা ঘুরছে?

তিয়ানজিন সম্মেলনে এসব বিষয় সরাসরি আলোচনার টেবিলে না এলেও তিন দেশের নেতাদের উপস্থিতি ছিল একটি স্পষ্ট বার্তা। সম্মেলনের বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেন, ‘আমরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হেঁটেছি, যা দুই দেশের সম্পর্কের প্রতি প্রতিশ্রুতি তুলে ধরে।’ দিল্লির কর্মকর্তারাও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তারা সেই দেশ থেকেই জ্বালানি কিনবে, যেখানে সবচেয়ে ভালো দামে পাওয়া যাবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই অবস্থান শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক দিক থেকেও ভারতের জন্য লাভজনক। এতে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মোদির অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে। কারণ এতে প্রমাণিত হয়, ভারত যুক্তরাষ্ট্রের চাপে মাথা নিচু করছে না।

ইউক্রেন যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্য নির্ভরতা কমিয়ে রাশিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়েছে ভারত। কারণ রাশিয়ার তেল অনেকটাই সস্তা এবং তেল পরিশোধনের পর তা থেকে লাভও বেশি। ভারতের রিফাইনারিগুলো রাশিয়ান তেল থেকে বড় অংকের মুনাফা করছে।

চীনও একইভাবে রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি খাতে সম্পর্ক বাড়িয়েছে। এসসিও সম্মেলনের সময় চীনের সঙ্গে একটি নতুন গ্যাস সরবরাহ চুক্তি করেছে রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত গ্যাস কোম্পানি। এতে চীনে গ্যাস রফতানির পরিমাণ বাড়বে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সম্মেলনের মধ্য দিয়ে রাশিয়া, চীন ও ভারতের মধ্যে অর্থনৈতিক স্বার্থের জায়গায় একটি বড় মিল খুঁজে পাওয়া গেছে। এদের সবাই যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি, নিষেধাজ্ঞা ও ভূ-রাজনৈতিক চাপের শিকার। ফলে, নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় তারা একে অপরের ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে।

বিশেষ করে চীন দীর্ঘদিন ধরে একটি বহুধ্রুব বিশ্বব্যবস্থার (Multipolar World Order) পক্ষে কথা বলে আসছে, যেখানে একটি মাত্র দেশের আধিপত্য থাকবে না। চীন চায়, যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প হিসেবে একটি নতুন শক্তি গড়ে উঠুক, যেখানে রাশিয়া ও ভারত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক চাপ ও জ্বালানির ভূ-রাজনীতি তিনটি দেশকে এক নতুন কৌশলগত বলয়ে নিয়ে এসেছে। যদিও অতীতে তাদের মধ্যে মতবিরোধ ছিল, বর্তমান বাস্তবতা তাদের একটি অভিন্ন মঞ্চে দাঁড় করিয়েছে। তথ্যসূত্র: বিবিসি

এইউ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর