অতিরিক্ত ওজন কমানো ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের জন্য হাঁটতে হাঁটতে পায়ের তলায় আলসার! চিকিৎসকরা কেউ বলেন নিউরোপ্যাথিক আলসার, কেউ বলেন ডায়াবেটিক ফুট আবার কেউবা বলেন নন-হিলিং আলসার।
রহিম সাহেব (ছদ্মনাম) একজন প্রফেশনাল ইঞ্জিনিয়ার। উচ্চ শিক্ষিত ও পেশাগত কাজে অত্যন্ত ব্যস্ত। নিজের দিকে বিশেষ খেয়াল করার সময় ও সুযোগ হয়ে উঠেনি অনেকদিন।
কিন্তু তাতে কি! দেহঘড়ি তো আর থেমে নেই। নগর জীবনে জগত সংসারে অস্বাস্থ্যকর ব্যস্ততার সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে স্ট্রেস, টেনশন; হয়েছে হাইপারটেনশন। সময়ের সাথে সেলুলার এজিং ( Cellular Aging) পাল্লা দিয়ে বেড়েছে কোষগুলোর আলসে দশা (Lazy Leukocyte)।
এক সময়ের নতুন ঘড়ি বয়স বাড়ার সাথে সাথে স্লো রিডিং দেওয়া শুরু করে, ব্যাটারি পাল্টালেও আর সঠিক সময় দেয় না। তাই বলে আবার একবারে বন্ধও হয়ে যায় না। আমাদের শরীরও তাই।
দেহঘড়ির সিগন্যাল রিড করুন
আমাদের শরীর একটা মেশিনের মত। ইন্ড্রাস্ট্রির বড় বড় মেশিনের অনেক কলকব্জা থাকে। সবগুলো যদি সঠিকভাবে কাজ করে, কেবল মাত্র তখনই মেশিনটা ঠিকভাবে রান করে এবং ভালমানের প্রোডাকশন দেয়। কোথাও ছোট-খাট প্রবলেম হলে মেশিনটা যে পুরোপুরি বিকল হয়ে যায়, তা নয়। বরং অনেকবার বিভিন্ন ইন্ডিকেটর বাটনে সিগন্যাল আসে। দীর্ঘদিন তা ইগনোর করলে একসময় এর বিরুপ প্রতিক্রিয়া পরে অন্য পার্টসের উপর। একের পর এক কার্যক্ষমতা কমতে কমতে একসময় মেশিনটার অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ পুরোপুরি ডেড হওয়ার আগে সে অনেকবার সিগন্যাল পাঠায় তার অপারেটরের কাছে।
লেটারবক্স নিয়মিত চেক করুন
আমাদের শরীর অত্যন্ত কমপ্লিকেটেড একটা মেশিনারীজ কর্মযজ্ঞের মত। কোন একটা জায়গায় প্রবলেম হলেই সে সিগন্যাল পাঠায়। যেমন- ডায়াবেটিসের রোগীদের ঘনঘন প্রসাব, অতিরিক্ত পিপাসা লাগা, মুখ শুকিয়ে আসা, হঠাৎ মাথা ঝিম ঝিম করে আসা ইত্যাদি। অর্থাৎ শরীর আপনাকে সিগন্যাল পাঠাচ্ছে। কিন্তু আপনি তা ইগনোর করে চলেছেন। অবহেলায় অনেকদিন এভাবে পার করে ফেললেন। আস্তে আস্তে তার ইফেক্ট পড়ে অন্যান্য অঙ্গের উপর। কিছুদিন পর লক্ষ্য করলেন- চোখটা ঝাপসা লাগছে, আগের মত ভালো দেখা যায় না। কাছের জিনিস -দুরের জিনিস কেমন যেন ঘোলাটে লাগে।বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে চোখ ব্যাথা করে। আসলে ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথির কারণে চোখের প্যাথি হয়েছে। এই স্টেজে ডায়াবেটিসের পাশাপাশি চোখের প্যাথিরও ব্যবস্থা জরুরি।
এভাবেই, বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে শরীর আপনাকে চিঠি পাঠিয়েই চলেছে দিনের পর দিন কিন্ত আপনি চিঠিটা খুলে পড়ার সময়টুকু পাচ্ছেন না ব্যস্ততার অযুহাতে। অত:পর, দেখলেন- ঘনঘন প্রসাবের ফ্রিকুয়েন্সী আরও বেড়েছে। হাত পায়ে পানি জমা/রস নামা শুরু হয়েছে। চিকিৎসক নয়, এমন অনেক অভিজ্ঞ সামাজিক আপন মানুষের পরামর্শে কিছু আধা-মেডিকেলীয় ব্যবস্থাপত্র নিলেন। কিন্তু ততক্ষণে হয়তো কোন একটা সিস্টেমের সিগন্যাল বাটন পুশ করার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে গেছে। চিঠি আসে/ আসে না। মানে আরোও খারাপ অবস্থার দিকে যাচ্ছে। কিছু বুঝে উঠার আগেই হয়তো CKD বা ক্রনিক কিডনী ডিজেস হয়ে দুটো কিডনীই বিকল হওয়ার পথে, যা একদিনের কোন ইনসিডেন্ট নয় বরং দীর্ঘদিনের অবহেলার ফল!
এমনিভাবেই দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়। আপনার ব্যস্ততা বাড়তেই থাকে। ওদিকে দেহযন্ত্রের সমস্যা সম্বলিত ইনবক্স করা চিঠিগুলো অপ্রকাশিত থেকে যায়;আন-সীন চিঠির সংখ্যাও বাড়তে থাকে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে।
ধীরে ধীরে লক্ষ্য করলেন- পা দুটোর মধ্যে কেমন কেমন করে। স্বাভাবিকের থেকে অন্যরকম।অনুভূতি বোধটা ভিন্ন রকম। আসলে আনকন্ট্রোলড ডায়াবেটিসের জন্য ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথির ইমপ্যাক্টস্বরুপ প্যারেসথেসিয়া ডেভেলপ করছে।
সফলতার জন্য সুস্বাস্থ্য জরুরি
আমাদের টনক নড়ে তখনই, যখন পায়ের সমস্যা দেখা দেয়। কারণ পায়ে হাটা বন্ধ হয়ে গেলে- সকল ব্যস্ততার অবসান ঘটবে। বহু বছরের দীর্ঘ শ্রম আর ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত দক্ষতা আর অভিজ্ঞতা চরম ব্যর্থতায় মুখ থুবড়ে পড়বে। পায়ে ভর দিয়ে হাঁটতে না পারলে দীর্ঘ অনুপস্থিতি কর্মক্ষেত্রে আইডেন্টিটি ক্রাইসিস সৃষ্টি করবে। যে কৃতিত্বের জন্য জীবনভর এত দৌড়ানো, কীর্তিমান হওয়ার আগেই তা বিলীন হয়ে যাবে। এইতো ভয়ের শুরু!

তখনই শুরু হয় নতুন যুদ্ধ!
পরিশ্রমী স্বপ্নবাজ লোকেরা যেটা পেতে চাই, তার জন্য মরিয়া হয়ে যায়। কিন্তু বস্তুজগতে চাহিবামাত্রই সবকিছু পাওয়া যায় না। অমুল্য জিনিস অর্জনে যেমন অনেক সময়, ধৈর্য্য ও ডেডিকেটেশন লাগে, ঠিক তেমনি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে অনেককিছু লাগে। এর ব্যত্যয় হলেই দুর্ভোগ বাড়বে, রোগ সংক্রান্ত জটিলতা আরো জটিলতর হবে।
সময় থাকতেই সচেতন হতে হবে
রহিম সাহেব একজন উচ্চ শিক্ষিত প্রকৌশলী। বয়স মাত্র ৪৩ বছর। বেখেয়ালে ওজন বেড়ে হয়েছে ১২০ কেজি! অজান্তেই কখন ডায়াবেটিস বাসা বেধেছে, ব্যস্ততার ভীড়ে তার খেয়াল করা হয়ে উঠেনি। হঠাৎ যেদিন সমস্যা অনুভব করলেন-সেদিন দেহযন্ত্রের লেটারবক্স খুললেন। এতো এতো সমস্যা ভেতরে ঘটে গেছে, ভাবতেই অবাক হয়ে গেলেন। দুশ্চিন্তায় রাতে ঘুম আসে না। চিকিৎসক পরীক্ষা নিরীক্ষা করে ওজন ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের জন্য বিশেষ বিশেষ নির্দেশনা ও নিষেধাজ্ঞা দিলেন। ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের মাথায় অনেক প্রজেক্টের চাপ। আর চাপে নিউমারিক্যাল সংখ্যার ক্রনোলোজিক্যাল বয়সের চেয়ে ফিজিওলজিক্যাল এইজ বেড়েছে অনেক। যেন তারুণ্যের উর্দির নিচে বার্ধক্য উঁকি দিচ্ছে।
তবুও ফিরে দাড়ানোর প্রাণপণ চেষ্টা। তিনি শুরু করলেন- ওজন আর ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের যুদ্ধ। রাতের বেলা ঘরের মধ্যে ১৮ ফুট জায়গায় কঠিন ধ্যান-জ্ঞান সাধনা করে টাইলস করা ফ্লোরে খালি পায়ে হাঁটা। ১০ মিনিট/২০ মিনিট নয়, প্রত্যহ টানা ২ ঘন্টা। হাঁটা আর হাঁটা!
ছয় মাসের মধ্যেই দারুণ ফল পেয়েছেন। ৪০ কেজি ওজন কমেছে। ডায়াবেটিস অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। কিন্তু আরেকটা জটিলতর সমস্যা দেখা দিয়েছে শরীরের অন্যখানে।
ডায়বেটিক ফুট আলসার-একটা মরণফাঁদ
অপরিকল্পিত ও যেন-তেন ভাবে হাটলে সমস্যা বাড়তে পারে। নিউরোপ্যাথির কারণে বোধশক্তি কমে যাওয়ায় হাঁটার সময় তিনি বুঝতে পারেন নাই তার পায়ের তলাটা আহত হয়েছে।
কেন বুঝতে পারেন নাই?
কারণ, একসময় শরীর খবর পাঠাতো, বিভিন্ন সিগন্যাল আসত, কিন্তু দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত সুগারের চাপে স্নায়ুতন্ত্রের বিকলাঙ্গতার দরুণ সেই চিঠি আর আসে না। কোন সমস্যা হচ্ছে কিনা, তা আর জানতে পারেন না। রহিম সাহেব যেদিন পায়ের তলায় ছোট একটা আলসার- ঘাঁ দেখতে পেলেন, কপাল কুঁচকালেন। ছোট সমস্যা মনে করে নিজেকে সান্ত্বনা দিলেন। কিন্তু না, ডায়াবেটিক ফুট আলসার, এটাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় আন্ডারমাইন্ড আলসার বলা হয়। অর্থাৎ বড় খনির যেমন ছোট একটা প্রবেশ মুখ থাকে কিন্তু ভিতরে বিরাট গর্ত/খনি থাকে। ঠিক তেমনি, যেই ছোট্ট আলসারটা বাইরে থেকে দেখা যাচ্ছে, এটা মূলত সেই বৃহৎ খনির ছোট্ট প্রবেশদ্বার। ভয় পেয়ে আবার চিকিৎসক দেখাতে গেলেন। নিবিড়ভাবে লক্ষ করলেন- চিকিৎসকের কপালে ঘর্মবিন্দু, আরোও বড় দুশ্চিন্তার ভাজ! বিরাট কালো ছায়া। সত্যই তিনি চিন্তিত! কারণ, এই রোগের চিকিৎসা এখন আর তার হাতে নাই। প্রয়োজন অপারেশন, জটিল রিকনস্ট্রাকটিভ সার্জারি।
শৈশব থেকে কীর্তিমান হওয়ার রঙিন স্বপ্নকে দুঃস্বপ্নের ভেলায় ভাসিয়ে শুরু হলো রহিম সাহেবের নতুন সংগ্রামী পথচলা- নতুন একজন প্লাস্টিক সার্জনের সঙ্গে, জগত সংসারের সবকিছু ফেলে শুধুমাত্র টিকে থাকার তরে!
লেখক: প্লাস্টিক অ্যান্ড রিকনস্ট্রাকটিভ সার্জন; সহকারী অধ্যাপক (প্লাস্টিক সার্জারি), শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শেরে-ই-বাংলা নগর, ঢাকা




