মানুষের দোরগোড়ায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে নতুন প্রকল্প প্রণয়নের কাজ করছে সরকার। প্রাথমিকভাবে ২০টি উপজেলায় পরীক্ষামূলকভাবে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে অভিজ্ঞতা ও চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করে পর্যায়ক্রমে দেশব্যাপী মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) রাজধানীর বাংলা একাডেমিতে বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত ‘কমিউনিটিভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবা: অন্তর্ভুক্তিমূলক সামাজিক কল্যাণের পথ’ শীর্ষক সেমিনারে এ তথ্য জানান স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত।
আঁচল ফাউন্ডেশন, হিউম্যান রাইটস ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (এইচআরডিসি), লোকাল এডুকেশন অ্যান্ড ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (লিডো) ও পল্লী একতা উন্নয়ন সংস্থা (রুডো) যৌথভাবে এ সেমিনারের আয়োজন করে।
ডা. এম এ মুহিত বলেন, মানসিক স্বাস্থ্যকে সামগ্রিক স্বাস্থ্য, মানবাধিকার, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ও জাতীয় উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। শুধু চিকিৎসাকেন্দ্রিক সেবাব্যবস্থা দিয়ে এ ক্ষেত্রে কার্যকর অগ্রগতি সম্ভব নয়। প্রতিরোধ, প্রাথমিক শনাক্তকরণ, চিকিৎসা, মনোসামাজিক সহায়তা, পুনর্বাসন এবং সামাজিকভাবে পুনঃ একীভূতকরণের সমন্বয়ে কার্যকর সেবা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
তিনি বলেন, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের বিদ্যমান সেবাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর সংযোগ স্থাপন এবং প্রয়োজনে বিশেষায়িত কেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। সেবা সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে দক্ষ জনবল এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। মানসিক স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি সমাজকল্যাণ, মহিলা ও শিশুবিষয়ক এবং আইন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন হিউম্যান রাইটস ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের পরিচালক ও মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মো. জিয়ানুর কবির। তিনি বলেন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মর্যাদা ও সামগ্রিক সামাজিক কল্যাণের সঙ্গে সম্পর্কিত। মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে ভয়, লজ্জা, কুসংস্কার ও বৈষম্য দূর করার পাশাপাশি উপজেলা ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পর্যায়ে সেবা সম্প্রসারণ, দক্ষ জনবল তৈরি এবং প্রযুক্তিনির্ভর কাউন্সেলিং নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি শিক্ষাব্যবস্থায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা অন্তর্ভুক্ত করা এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের জন্য মানসিক আঘাতের প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে মনোসামাজিক সহায়তা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা, স্বতন্ত্র মানসিক স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা এবং জেলা ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মনোবিজ্ঞানী নিয়োগের সুপারিশ করেন। এ ছাড়া কমিউনিটিভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং স্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব জোরদারের আহ্বান জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর যুব কর্মসংস্থানবিষয়ক বিশেষ সহকারী মো. সাইয়েদ বিন আবদুল্লাহ বলেন, যুব উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যের পারস্পরিক সম্পর্ক রয়েছে। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা শুধু বিশেষজ্ঞ বা স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। সরকারি প্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রেও সচেতনতা এবং কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ বাড়াতে হবে।
তিনি বলেন, জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রত্যেক মানুষের মানসিক সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে। তাই মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের সঙ্গে যুক্ত সামাজিক সংকোচ ও নেতিবাচক ধারণা দূর করা জরুরি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক কামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা এবং প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি কমিউনিটি মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী তৈরির পাশাপাশি মা ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়ার আহ্বান জানান। এ খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়ানো এবং প্রতিটি উপজেলায় অন্তত দুজন কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের সুপারিশ করেন তিনি।
সংসদ সদস্য শিরিন সুলতানা বলেন, শারীরিক অসুস্থতার জন্য চিকিৎসকের সাহায্য নেওয়া যেমন স্বাভাবিক, তেমনি মানসিক কষ্ট, ভয়, উদ্বেগ কিংবা দীর্ঘস্থায়ী ঘুমের সমস্যার ক্ষেত্রেও পেশাদার সহায়তা নেওয়াকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখতে হবে। মানুষ যেন নিজের মানসিক কষ্টের কথা নির্ভয়ে বলতে পারে, প্রয়োজনে কাউন্সেলিং নিতে পারে এবং সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার ভয় ছাড়াই সাহায্য চাইতে পারে, এমন পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।
আঁচল ফাউন্ডেশনের সভাপতি স্বাগত বক্তব্যে বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের অপর্যাপ্ততার কারণে কমিউনিটিভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবার কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। সমাজের সম্মুখসারির মানুষদের প্রশিক্ষণ দিয়ে মনোসামাজিক পরামর্শদাতা হিসেবে তৈরি করা গেলে দেশের মানুষের কাছে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। এ ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
হিউম্যান রিলিফ ফাউন্ডেশনের কান্ট্রি ডিরেক্টর ডা. ওবায়দুর রহমান বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে আইন, নীতি ও কৌশলগত পরিকল্পনা থাকলেও জনসচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। সেবার কার্যকারিতা মূল্যায়ন এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম ফরহাদ হোসেন বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ। মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে পারিবারিক শিক্ষা, ধর্মীয় শিক্ষা ও ইতিবাচক চর্চার গুরুত্ব রয়েছে।
ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সৈয়দা শাজিয়া শারমিন বলেন, কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গড়ে তুলতে মানসিক স্বাস্থ্যকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে।
লিডোর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক ফরহাদ হোসেন বলেন, নারী ও শিশুরা মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে এখনো পর্যাপ্ত সচেতন নয়। এ ক্ষেত্রে শুধু রাষ্ট্র নয়, নাগরিকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে মানসিক স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মো. সাইদুর রহমান, আঁচল ফাউন্ডেশনের পরিচালক সোহেল মামুন, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অপথালমোলজির সহকারী অধ্যাপক মুস্তাইম বিল্লাহ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপপরিচালক অধ্যাপক মো. দাউদ, রুডোর প্রধান নির্বাহী পরিচালক মো. শামীম রেজা, ডিগনিটির প্রকল্প ব্যবস্থাপক আশরাফুল আনোয়ার রোজেন, সোসাইটি ফর হেলথ প্রমোশন লিংকসের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ডা. হালিদা হানুম আখতার এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথের সহযোগী অধ্যাপক আহসান উদ্দিন।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মো. সাইদুর রহমান। সঞ্চালনা করেন হিউম্যান রাইটস ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের মহাসচিব ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহবুল হক।
আলোচকরা বলেন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিতে প্রত্যেককে বিশেষায়িত হাসপাতালে যেতে হয়, এমন ব্যবস্থার পরিবর্তে স্থানীয় পর্যায়ে প্রাথমিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কমিউনিটিভিত্তিক সেবা ব্যবস্থায় সচেতনতা বৃদ্ধি, মানসিক সংকটের প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্তকরণ, মনোসামাজিক সহায়তা, বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানো এবং ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ ও পুনর্বাসনের সুযোগ রাখতে হবে।
তারা মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে সহজলভ্য, বৈষম্যহীন ও অধিকারভিত্তিক করতে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ, প্রশিক্ষিত জনবল বৃদ্ধি এবং কমিউনিটিভিত্তিক সেবা সম্প্রসারণের আহ্বান জানান।
বক্তারা বলেন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা শুধু চিকিৎসার বিষয় নয়। এর সঙ্গে মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা, পারিবারিক সহায়তা, মানবিক মর্যাদা ও পুনর্বাসনের বিষয়গুলোও জড়িত। সেবা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সমন্বয়, দক্ষ জনবল নিয়োগ এবং সামাজিক কলঙ্ক ও বৈষম্য দূর করা জরুরি।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ ২০১৯-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৮ বছরের বেশি বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ এবং ৭ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের ১৩ দশমিক ৬ শতাংশের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যসমস্যা ছিল। তাঁদের মধ্যে প্রাপ্তবয়স্কদের ৯২ দশমিক ৩ শতাংশ এবং শিশু-কিশোরদের ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ কোনো চিকিৎসা নেয়নি।
এএইচ/এএম




