একসময় ইউরোপ তছনছ করে দিয়েছিল এক ভয়ঙ্কর মহামারী। ইতিহাসে তা প্রসিদ্ধ ‘ব্ল্যাক ডেথ’ নামে। প্রজন্মের পর প্রজন্মকে সেই ক্ষত বহন করতে হয়েছিল।
ইউরোপের মোট জনসংখ্যার ৩০-৬০ ভাগ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল সেই রোগে। আবারও সেই নিউমোনিক প্লেগের আতঙ্ক ফিরে এসেছে।
রাশিয়ার গবেষণাগারে প্লেগের জীবাণুভর্তি টেস্টটিউব ভেঙে যাওয়া এবং তার পরেই নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে এক তরুণী গবেষকের মৃত্যুর ঘটনায় আতঙ্ক আরও বেড়েছে।
দারিয়া শিপিলোভা নামে ওই তরুণী প্লেগরোধের ওষুধ নিয়েই গবেষণা করছিলেন। নিউমোনিক প্লেগ রাশিয়ায় ছড়াতে পারে কি-না, সে নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। গোটা বিশ্বই এ নিয়ে উদ্বেগে। রাশিয়ার কাছে রিপোর্ট চেয়ে পাঠিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)।
করোনাভাইরাসের অতিমারী, তার পরেই মাঙ্কিপক্সের ধাক্কা সামলে যখন ডিজিজ এক্স নিয়ে সতর্কতা জারি হচ্ছে, সেই সময়ে নিউমোনিক প্লেগের ফিরে আসার খবরে আশঙ্কার মেঘ ঘনিয়েছে।
প্লেগ ব্যাক্টেরিয়াঘটিত রোগ। ইঁদুর বা মাছিবাহিত হয়ে ছড়ায়। প্লেগের অনেক ধরন আছে। বিউবনিক প্লেগের নামই বেশি পরিচিত। ইঁদুরের মলমূত্র, দেহাবশেষ থেকে ছড়ায় এই রোগ।
আরও দু’রকম প্লেগ আছে— সেপ্টিসেমিক প্লেগ ও নিউমোনিক প্লেগ। সেপ্টেসেমিক প্লেগে গোটা শরীর সংক্রমিত হয়, আর নিউমোনিক প্লেগে ফুসফুসে সংক্রমণ ঘটে।
‘ইয়ার্সিনিয়া পেস্টিস’ নামে একপ্রকার ব্যাক্টেরিয়া এই রোগটির জন্য দায়ী। সাধারণত মাছিবাহিত হয়ে ওই ব্যাক্টেরিয়া মানুষের শরীরে ঢোকে ও সরাসরি ফুসফুসে হামলা করে।
নিউমোনিক প্লেগের ব্যাক্টেরিয়া শরীরে ঢুকলে ফুসফুস বিকল হতে শুরু করে। ফলে ফুসফুসে পানি জমতে থাকে ও মারাত্মক শ্বাসকষ্ট শুরু হয় রোগীর।
সেই সঙ্গে তীব্র মাথাব্যথা, কাশির সঙ্গে রক্তও বেরোতে থাকে। খুব তাড়াতাড়ি একজনের শরীর থেকে অন্যজনের শরীরে এই রোগ ছড়াতে পারে।
১৮৯৬ সালে প্লেগ আঘাত হেনেছিল ভারতেও। ছড়িয়েছিল পুণে, কলকাতা ও অবিভক্ত ভারতের করাচিতে। বিশ্ব-ইতিহাসে এমন বহু অতিমারীর লিখিত উল্লেখ মেলে, যেগুলি খুব দ্রুত কোনও জনগোষ্ঠী বা দেশ থেকে দেশান্তরে প্রবল আকার ধারণ করেছিল।
তার মধ্যে প্লেগ একটি। তাই স্বভাবতই রাশিয়ার ঘটনার পরে সিঁদুরে মেঘই দেখছেন গবেষকেরা।
হু জানিয়েছে, নিউমোনিক প্লেগ সবচেয়ে বেশি সংক্রামক। আক্রান্ত হওয়ার সাত দিনের মধ্যেই ফুসফুস ছারখার করে দিতে পারে রোগের জীবাণু।
শুধু তা-ই নয়, আক্রান্তের থেকে চারপাশের মানুষজনের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। এক সময়ে নিউমোনিক প্লেগের কোনও চিকিৎসা ছিল না, তবে এখন অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে এর নিরাময় সম্ভব।
তবে রোগটি ছড়িয়ে পড়ার আগেই চিহ্নিত করতে হবে। না হলে ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেও মৃত্যু হতে পারে রোগীর।
গবেষকেরা জনাচ্ছেন, এখন এত রকমের অ্যান্টিবায়োটিক তৈরি হয়েছে যে প্লেগ অতিমারীর পর্যায়ে পৌঁছোনোর আগেই তাকে রুখে দেওয়া হয়তো সম্ভব হবে। তবে রোগটি যেহেতু ছোঁয়াচে, তাই সতর্ক না হলে বিপদ ঘটতে পরে যখন-তখন।
-এমএমএস




