শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

ডেঙ্গুর থাবা সারাদেশে, রেহাই পাচ্ছে না শিশুরাও

সাখাওয়াত হোসাইন
প্রকাশিত: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:২৭ পিএম

শেয়ার করুন:

ডেঙ্গুর থাবা সারাদেশে, রেহাই পাচ্ছে না শিশুরাও
ফাইল ছবি

এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু জ্বর থাবা বসিয়েছে সারাদেশে। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত রোগটিতে ১৭৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। মোট আক্রান্তে সংখ্যা ৬০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। তবে মূল আতঙ্কের বিষয় হচ্ছে, প্রাণঘাতী এই ডেঙ্গু জ্বর থেকে প্রাপ্তবয়স্কদের পাশাপাশি রেহাই পাচ্ছে না শিশুরাও।  

এ তালিকারই একজন ৬ বছর বয়সি রায়হান আহমেদ। গত ১৪ সেপ্টেম্বর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয় সে। প্রথমে জ্বরের তীব্রতা ও ব্যথা কম থাকায় সেভাবে গুরুত্ব না দিলেও গত ১৬ সেপ্টেম্বর চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয় শিশুটির পরিবার। 

এরপরই জানা যায়, শিশু রায়হানের ডেঙ্গু জ্বর হয়েছে এবং প্লাটিলেট কমে গেছে। বর্তমানে সে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে ভর্তি আছে। সে শারীরিকভাবে খুবই দুর্বল। হাঁটাচলা করতে পারছে না রায়হান।

শিশুটির শিক্ষিকা মা সাবেকুন্নাহার ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘ছেলের জ্বর নিয়ে খুবই দুশ্চিন্তায় আছি। কিছু খেতে চায় না। আবার বিছানা থেকে উঠতেও পারে না। হঠাৎ ডেঙ্গু জ্বর হয়েছে। এটি আমার প্রথম সন্তান। আগে কখনো ওর এমন হয়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘ছেলেটা রাতে ঘুমাতে পারে না। শুধু কান্নাকাটি করে। বলে, মা শরীরে অনেক ব্যথা। হাসপাতালে থাকাটাও অসহ্য যন্ত্রণার। ছেলের সুস্থতার অপেক্ষায় আছি। আশা করছি, শিগগিরই সুস্থ হয়ে উঠবে।’

একই অবস্থা ৫ বছরের শিশু জাকিয়া সুলতানারও। তার বাবার আব্দুল হামিদ ঢাকা মেইলকে বলেন, দুদিন হলো হাসপাতালে ভর্তি। স্যালাইনের উপরে আছে বাচ্চাটা। এতো নিতে পারবে? কিছু খায় না। খুবই টেনশনে আছি। একটা দিন মনে হচ্ছে এক মাসের সমান। শিশুর শারীরিক পরিস্থিতিও ভালো না। জানি না কবে সুস্থ হবে এবং হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরব।’

ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে বেশিরভাগই ছেলে

রায়হান ও জাকিয়ার মতো সারাদেশে প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য হারে শিশু ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে। তাদের মধ্যে কারও কারও নাম আসছে স্বাস্থ্য অধিদফতরের গণনার মধ্যদিয়ে, আবার অনেকে হাসপাতালে না যাওয়ার কারণে থাকছে গণনার বাইরে। 

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৮ সেপ্টেম্বর একদিনে সারাদেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয় ১ থেকে ১৫ বছর বয়সি ১১৫ জন শিশু ও কিশোর। এর মধ্যে শূন্য থেকে পাঁচ বছর বয়সি ৫০ জন, ছয় থেকে ১০ বছর বয়সি ৩১ জন এবং ১১ থেকে ১৫ বছর বয়সি ৩৪ জন। আক্রান্তদের মাঝে ছেলের সংখ্যাই বেশি, ৮২ জন।

চলতি বছরে শূন্য থেকে ১৫ বছর বয়সি ৯ হাজার ৬২২ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১১ থেকে ১৫ বছর বয়সিরা বেশি, যার সংখ্যা ৩ হাজার ৭০৪ জন। অন্যদিকে শূন্য থেকে পাঁচ বছর বয়সি শিশু ২ হাজার ৯৬৬ জন। আর ৬ বছর ১০ বছর বয়সি শিশু ২ হাজার ৯৫২ জন।

ডেঙ্গুর থাবায় গেছে ২২ শিশুর প্রাণ

চলতি বছরে সারাদেশে ডেঙ্গু কেড়ে নিয়েছে ২২ জন শিশুর প্রাণ। যাদের বয়স শূণ্য থেকে ১১ বছর। এর মধ্যে শূণ্য পাঁচ বছর বয়সি ৯ জন এবং ছয় থেকে ১০ বছর বয়সি ৭ জন। আর ১১ থেকে ১৫ বছর বয়সি ৬ জন। মারা যাওয়া ২২ জন শিশুর মধ্যে ১১ জন ছেলে ও ১১ জন মেয়ে।

জ্বর হলেই করতে হবে ডেঙ্গু পরীক্ষা

চিকিৎসকরা বলছেন, এই মৌসুমে জ্বর হলেই প্রথমে ডেঙ্গু পরীক্ষা করাতে হবে। জ্বরের প্রথম দিনে এ পরীক্ষা করলে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়। জ্বর হলে বাচ্চাকে পরিপূর্ণ বিশ্রামে রাখতে হবে। পর্যাপ্ত পানি, খাবার স্যালাইন, ডাবের পানি পান করাতে হবে, যেন অন্তত ৬ বার করে প্রস্রাব করে। 

জ্বরে প্যারাসিটামল ছাড়া অন্য কোনো ব্যথার ওষুধ দেওয়া যাবে না। কুসুম গরম পানি দিয়ে শরীর মুছে দেওয়া যেতে পারে। সেইসঙ্গে ডেঙ্গুর বিপদ চিহ্নগুলোর দিকে খেয়াল রাখতে হবে। বিপদচিহ্ন দেখলে শিশুকে নিকটস্থ হাসপাতালে নিতে হবে। কারণ, এ সময় শিশুর শিরাপথে স্যালাইন লাগতে পারে।

রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন ঢাকা মেইলকে বলেন, শিশুদেরকে ডেঙ্গুর হাত থেকে বাঁচাতে হলে বিশেষ পদক্ষেপ নিতে হবে। সারাদেশে ব্যাপক পরিসরে সচেতনতা চালাতে হবে, যেন কোনো শিশু জ্বরে আক্রান্ত হলেই অভিভাবকরা চিকিৎসকের কাছে যান। সেইসঙ্গে ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশুদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে ঘরবাড়ি ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি শিশুদের সুরক্ষায় জোর দিতে হবে। দিনে ও রাতে ঘুমানোর সময় অবশ্যই মশারি ব্যবহার করতে হবে এবং শিশুদের শরীর ঢেকে পোশাক পরানো উচিত। জ্বরকে সাধারণ মৌসুমি রোগ ভেবে অবহেলা না করে শুরুতেই ডেঙ্গু পরীক্ষা করানো এবং চিকিৎসকের নির্দেশ মেনে চলাই মারাত্মক ঝুঁকি থেকে শিশুদের রক্ষা করতে পারে।

শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শহিদুল্লাহর মতে, শিশুর জ্বর হলেই প্রথম দিনে ডেঙ্গু পরীক্ষা করানো অত্যন্ত জরুরি। ডেঙ্গু শনাক্ত হলে শিশুকে পুরোপুরি বিশ্রামে রাখতে হবে এবং পর্যাপ্ত তরল খাবার যেমন— খাবার স্যালাইন, ডাবের পানি ও ফলের রস খাওয়াতে হবে। জ্বরের চিকিৎসায় শুধুমাত্র প্যারাসিটামল ব্যবহার করতে হবে; কোনো অবস্থাতেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অন্য কোনো ব্যথানাশক বা অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া যাবে না।

তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, শিশুর শরীর কুসুম গরম পানি দিয়ে নিয়মিত মুছে দেওয়া ভালো, তবে মূল নজর রাখতে হবে ডেঙ্গুর বিপদ চিহ্নগুলোর দিকে। যদি শিশু ক্রমাগত বমি করে, পেট ব্যথার কথা বলে, অতিরিক্ত নিস্তেজ হয়ে পড়ে কিংবা হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসে, তবে এক মুহূর্তও দেরি না করে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে অনেক সময় শিশুর শরীরে দ্রুত শিরাপথে স্যালাইন দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে।

চিকিৎসকরা জানান, এ বছর ডেঙ্গুতে শিশুদের আক্রান্ত ও প্লাটিলেট কমে যাওয়ার হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। শিশুদের শারীরিক প্রতিরোধ ক্ষমতা বড়দের চেয়ে সংবেদনশীল হওয়ায় খুব দ্রুত তাদের প্লাটিলেট কমে যায় এবং শরীর মারাত্মক দুর্বল হয়ে পড়ে। 

ফলে লক্ষণ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ডেঙ্গু পরীক্ষা করানো ও চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা না গেলে পরিস্থিতি দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে বলেও সতর্ক করছেন চিকিৎসকরা।

এসএইচ/এএইচ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর