জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে ভয়াবহ দিনগুলোর একটি ছিল ১৮ জুলাই। সেদিন রাজধানীর জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের জরুরি বিভাগে প্রতি ১০ সেকেন্ডে একজন করে আহত আসছিলেন। একসঙ্গে চালু ছিল ১০টি অপারেশন থিয়েটার। পরদিন সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১২টিতে। চার দিনের ব্যবধানে শত শত গুলিবিদ্ধ মানুষের চোখ বাঁচানোর লড়াইয়ে নেমেছিলেন চিকিৎসকেরা। কিন্তু সব চোখ আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি। সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোর স্মৃতি আজও তাড়া করে বেড়ায় জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের ভিট্রিও-রেটিনা বিভাগে সহকারী অধ্যাপক ডা. জাকিয়া সুলতানাকে।
ঢাকা মেইলের সঙ্গে আলাপকালে তিনি তুলে ধরেছেন অপারেশন থিয়েটারের ভেতরে-বাইরে দেখা সেই রক্তাক্ত সময়ের স্মৃতি, আহতদের অসহায় আর্তনাদ এবং চিকিৎসকদের নিরলস লড়াইয়ের কথা।
‘নিচে নরকের দরজা খুলে গেছে’
জুলাইয়ের শুরু থেকেই আন্দোলনকে ভিন্নভাবে দেখছিলেন ডা. জাকিয়া সুলতানা। তার ভাষায়, ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের সাহস দেখে তখনই মনে হয়েছিল, হয়তো এবার সত্যিই কোনো পরিবর্তন আসতে পারে।

এই চিকিৎসক বলেন, ‘জুলাইয়ের শুরু থেকেই আমার মনে একটা আশার আলো জেগেছিল। মনে হয়েছিল, এই ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরাই হয়তো এবার বাংলাদেশে একটা পরিবর্তন আনতে পারবে। আবু সাঈদকে দেখেছি, আন্দোলন দেখেছি। তখনই মনে হচ্ছিল, এবার হয়তো কিছু একটা হবে।’
জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে প্রথম গুলিবিদ্ধ রোগী আসে ১৭ জুলাই। তবে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয় পরদিন। ডা. জাকিয়া বলেন, ‘১৭ জুলাই চার-পাঁচজন আহত এসেছিল। কিন্তু ১৮ জুলাই ছিল একেবারেই রক্তস্নাত একটি দিন। আমি সবসময় বলি, ১৮ জুলাইকে রক্তস্নাত দিন হিসেবেই মনে রাখতে হবে।’
সেদিন ছিল তার অপারেশন থিয়েটারের নির্ধারিত দিন। একের পর এক অস্ত্রোপচার চলছিল। ইন্টারনেট বন্ধ থাকলেও হাসপাতালের ওয়াই-ফাই দিয়ে বাইরে কী ঘটছে, তার খোঁজ রাখছিলেন।
শেষ অপারেশন শুরু করার আগমুহূর্তে চারদিকে গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছিল। ঠিক তখনই অপারেশন থিয়েটারের দরজায় কড়া নাড়েন হাসপাতালের তৎকালীন মেডিকেল অফিসার, বর্তমানে সহকারী পরিচালক ডা. রেজানুর রহমান সোহেল। তার সেই একটি বাক্য আজও কানে বাজে। ‘নীলা, নিচে চলে আয়। নিচে নরকের দরজা খুলে গেছে।’
সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামার সময় মোবাইলে প্রথম দেখেন আহত ইয়ামিনকে কাঁধে বহন করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ডা. জাকিয়া স্মরণ করেন, ‘আমি তখন বলেছিলাম, হায় হায়, এটা কোথায় হচ্ছে? এটা তো বাংলাদেশ! দেখে তো গাজার কোনো ভিডিও মনে হচ্ছে।’
আরও পড়ুন: জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদের গেজেট প্রকাশ
‘চারদিকে শুধু আহত আর আহত’
জরুরি বিভাগে পৌঁছে তিনি যে দৃশ্য দেখেছিলেন, তা একজন চিকিৎসক হিসেবেও তাকে মানসিকভাবে ভেঙে দিয়েছিল। তার ভাষায়, ‘নিচে নেমে দেখি শত শত ছেলে-মেয়ে। বেশির ভাগের বয়স ১৪ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। কেউ এক হাত দিয়ে একটি চোখ চেপে ধরে আছে, কেউ দুই হাত দিয়ে দুই চোখ ঢেকে রেখেছে। মুখ, শরীর, চোখ—সব জায়গা থেকে রক্ত ঝরছে। চারদিকে শুধু আহত আর আহত।’
সেই দৃশ্য সহ্য করতে পারেননি তিনি। ডা. জাকিয়া বলেন, ‘আমি একজন চিকিৎসক হয়েও সেই দৃশ্য সহ্য করতে পারিনি। নিজেকে সামলাতে না পেরে পড়ে গিয়েছিলাম। দুজন আমাকে ধরে তুলেছিলেন। আমি শুধু বলছিলাম, এটা কী হচ্ছে?’
এরপর আর থামার সুযোগ ছিল না। জরুরি বিভাগে প্রতি ১০ সেকেন্ডে একজন করে আহত আসছিলেন। চিকিৎসকেরা জীবন বাঁচানোর লড়াইয়ে নেমে পড়েন। তিনি বলেন, ১৮ জুলাই রাত ১০টা পর্যন্ত টানা অপারেশন হয়েছে। সেদিন ১০টি অপারেশন টেবিল একসঙ্গে চালু ছিল।
তিনি আরও বলেন, পরদিন ১৯ জুলাইও একই চিত্র। সকাল আটটা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত টানা অপারেশন হয়েছে। সেদিন ১২টি অপারেশন টেবিল চালু ছিল। শুধু ১৮ ও ১৯ জুলাই এই দুই দিনে প্রায় ৩০০ আহত আমাদের হাসপাতালে এসেছে। তাদের মধ্যে প্রায় ২০০ জনের অস্ত্রোপচার করা হয়েছে।
কারফিউ জারির পরও পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হয়নি বলে জানান এই জুলাইযোদ্ধা অদম্য চিকিৎসক।

তিনি বলেন, ‘২০ জুলাই কারফিউর মধ্যেও প্রায় ৭০ জনের অস্ত্রোপচার হয়েছে। ১৮, ১৯, ২০ ও ২১ জুলাই—এই চারটি দিন ছিল ভয়াবহ। একই ধরনের পরিস্থিতি আবার ৩, ৪, ৫ ও ৬ আগস্টও আমরা দেখেছি।’
চোখে ছিল ধাতব পেলেট, মিলেছে রিয়েল বুলেটও
২০২৪ সালের জুলাইয়ে হাসপাতালগুলোতে সবচেয়ে বেশি রোগী এসেছিল ১৮-১৯ জুলাই এবং ৫ আগস্ট। ডা. জাকিয়ার পর্যবেক্ষণ, আহতদের অধিকাংশই ছিলেন শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, ‘আমাকে সবচেয়ে অবাক করেছে, অধিকাংশ আহতই ছাত্র। তাদের বয়স ১৪ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। কারও এক চোখে, কারও দুই চোখেই পেলেট লেগেছে।’
চোখে বিদ্ধ হওয়া গুলির ধরন নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন তিনি। বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালে যেসব অস্ত্রোপচার হয়েছে, সেখানে কোনো রাবার বুলেট পাইনি। সবই ছিল ধাতব পেলেট। কিছু ক্ষেত্রে রিয়েল বুলেটও পেয়েছি।’
জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের সময় ও পরবর্তী সময়ে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন ৮৬৪ জন আহত। ভর্তি না হয়েও চিকিৎসা নেন আরও প্রায় এক হাজার মানুষ। প্রায় ৬৫০ জনের অস্ত্রোপচার করা হয়। তবে সবচেয়ে কষ্টের পরিসংখ্যানটি ছিল অন্য জায়গায়।
ডা. জাকিয়া বলেন, ‘১১ জন মানুষ এই পৃথিবীর আলো আর কোনো দিন দেখতে পারবেন না। তাদের দুই চোখই সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। আর ৪৯৩ জনের একটি চোখ চিরতরে নষ্ট হয়েছে।’
‘ভাবুন তো, ৪৯৩ জন মানুষ জীবনের বাকি সময় একটি চোখ দিয়ে পৃথিবী দেখবেন। আর ১১ জন সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে গেছেন।’ কিছুক্ষণ থেমে যুক্ত করেন তিনি।
তিনি জানান, এই পরিসংখ্যান শুধু জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের। অন্য হাসপাতালেও আহতদের চিকিৎসা হয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় চাপ সামলাতে হয়েছে তাদের হাসপাতালকেই।
‘ম্যাডাম, আমার হাতটা ছাড়বেন না’—জুলাইয়ের সেই আর্তনাদ এখনো কানে বাজে
চার দিন ধরে টানা অস্ত্রোপচার, রক্তে ভেজা করিডোর আর শত শত আহত মানুষের ভিড়ের মধ্যেও কিছু মুখ আজও ভুলতে পারেন না ডা. জাকিয়া সুলতানা। একেকটি মুখ, একেকটি সংলাপ আজও তাকে তাড়া করে ফেরে। তিনি বলেন, দুটি স্মৃতি আমি কোনোদিন ভুলতে পারব না। প্রথম স্মৃতিটি ৩ আগস্টের। সেদিন হাসপাতালে এসেছিলেন নেত্রকোনার তরুণ মেহেদী হাসান মিন্টু (নবাব)। তার চোখ পরীক্ষা করে ডা. জাকিয়ার মনে হয়েছিল, বাইরে পরিস্থিতি এতটাই অনিরাপদ যে তাকে একা ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে না।’
জাকিয়া বলেন, ‘আমি তাকে বলেছিলাম, তুমি কোথায় যাবে? কোথাও নিরাপদ জায়গা না থাকলে আমার সঙ্গে চলো। আমার স্বামীর হাসপাতাল অরোরা স্পেশালিস্ট হাসপাতালে তোমাকে ভর্তি করে দিই।’
কিন্তু তরুণটি রাজি হয়নি। সে বলে, ‘না ম্যাডাম, আমি আশুলিয়ায় আত্মীয়ের বাসায় চলে যেতে পারব’—এটাই ছিল তার উত্তর।
বিদায়ের সেই মুহূর্ত এখনো চোখে ভাসে এই চিকিৎসকের। তিনি বলেন, ‘আজও মনে আছে, নীরব রাস্তায় তাকে বিদায় দিয়েছিলাম। ওর চোখে যেমন পানি ছিল, আমার চোখেও তেমন ছিল। মনে হচ্ছিল, হয়ত আর কোনোদিন এই ছেলেটাকে দেখতে পাব না।’
ভাগ্যক্রমে আশঙ্কা সত্যি হয়নি। ৫ আগস্টের পর আবারও হাসপাতালে ফিরে আসেন মিন্টু। তার দুই চোখেই ধাতব পেলেট বিদ্ধ হয়েছিল। দীর্ঘ চিকিৎসার পর একটি চোখের দৃষ্টিশক্তি কিছুটা রক্ষা করা সম্ভব হয়। পরে সরকারি উদ্যোগে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে তুরস্কে পাঠানো হয়।
আরেকটি স্মৃতি ৫ আগস্টের। সকালে রাজপথে যাওয়ার উদ্দেশে বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন ডা. জাকিয়া। বিজয় সরণি পর্যন্ত যাওয়ার পর পরিস্থিতির খবর পেয়ে ছুটে যান হাসপাতালে। সেখানেই দেখা হয় তার রোগী ইমামের সঙ্গে। চোখে পানি নিয়ে ইমাম তাকে একটি প্রশ্ন করেছিলেন, যার উত্তর আজও দিতে পারেননি এই চিকিৎসক।
ইমাম তাকে প্রশ্ন করেন, ‘ম্যাডাম, সবাই তো আনন্দ করছে। কিন্তু আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। আমি কি আর এই চোখ দিয়ে কোনোদিন দেখতে পাব না?’
ডা. জাকিয়া বলেন, ‘আমি তাকে কোনো উত্তর দিতে পারিনি।’
তার ভাষায়, এসব আঘাত ছিল সাধারণ কোনো গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা নয়। অত্যন্ত দ্রুতগতির গরম ধাতব পেলেট চোখের ভেতরে ঢুকেছে। শুধু কর্নিয়া নয়, রেটিনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মানুষের চোখে একটি ছোট ধুলা পড়লেও আমরা অস্বস্তি বোধ করি। সেখানে এত দ্রুতগতির ধাতব পেলেট চোখের ভেতরে ঢুকে যে ক্ষতি করেছে, সেটা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব।
তিনি বলেন, ইমামের চিকিৎসার অভিজ্ঞতাও তাকে এখনো নাড়া দেয়। তার কর্নিয়ায় ছিদ্র দেখে আমি সত্য কথাটা বলতে পারিনি। শুধু বলেছিলাম, 'বাবা, তুমি ভর্তি হও। এখন কোনো ভয় নেই, আমরা তোমার চিকিৎসা করব।' পরে কর্নিয়া রিপেয়ার করা গেলেও চোখ আর কখনো আগের অবস্থায় ফেরেনি।’
১৮ জুলাই বিকেলের আরেকটি ঘটনা আজও ভুলতে পারেন না তিনি। অপারেশন থিয়েটারে এক কিশোরের অস্ত্রোপচার চলছিল। অপারেশন করছিলেন চিকিৎসক ডা. মেহেদী। ভয় আর অনিশ্চয়তায় কাঁপছিল ছেলেটি।
ডা. জাকিয়া বলেন, ‘ছেলেটি আমার হাত ধরে বলছিল, ম্যাডাম, আমার হাতটা ছাড়বেন না। আমার খুব ভয় লাগছে। পরে আহতদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) তৈরির সময় চিকিৎসকেরা আরও এক নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হন ডা. জাকিয়া সুলতানা নীলা। অনেক আহতের তখনো এনআইডি হয়নি। কারণ তারা এত ছোট ছিল যে জাতীয় পরিচয়পত্র করার বয়সই হয়নি। এমনও শিশু ছিল, যে আহত হওয়ার পরের বছর স্কুলে ভর্তি হয়েছে।
নারী আহতও ছিলেন, কেউ চেয়েছিলেন শুধু চোখটা সুন্দর থাকুক
ডা. জাকিয়া জানান, নারী আহতের সংখ্যা তুলনামূলক কম ছিল। আট থেকে নয়জনের মতো নারী তার হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।
তাদের মধ্যে ছিলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেওয়া পারভীন এবং জেনেভা ক্যাম্পের আরবি শিক্ষিকা নিলু পারভীন। তার দুই চোখেই ধাতব পেলেট বিদ্ধ হয়েছিল।
আরেক নারী আহত মানসুরার একটি কথা এখনো ভুলতে পারেন না তিনি। মেয়েটি তাকে বলেন, ‘ম্যাডাম, আমি আপনাকে আমার বিয়েতে দাওয়াত দেব। অন্তত আমার চোখটা যেন দেখতে সুন্দর থাকে।’
ডা. জাকিয়া বলেন, তিনি কখনোই রোগীদের মিথ্যা আশ্বাস দিতেন না। তার ভাষায়, ‘আমি বলতাম, আমরা চিকিৎসা করছি। কিন্তু কতটুকু ভালো হবে, সেটা একমাত্র আল্লাহই জানেন।’
তবে সব গল্প বেদনার নয়। সম্প্রতি এক আহত ভিডিও কলে নিজের নবজাতক সন্তানের মুখ দেখিয়েছেন তাকে। ডা. জাকিয়া বলেন, ‘সে তার সন্তানের নাম রেখেছে জাকিয়া। একজন চিকিৎসকের জন্য এর চেয়ে বড় ভালোবাসা আর কী হতে পারে।’
মৃত্যুকে ভয় পাই না, সত্য বলেছি, ভবিষ্যতেও বলব
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহতদের চিকিৎসা দেওয়ার মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ডা. জাকিয়া সুলতানা। চিকিৎসক হিসেবে হাসপাতালের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি রাজপথেও ছিলেন তিনি। পরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন। সেই সাক্ষ্যের পর হুমকি-হয়রানিরও শিকার হয়েছেন। তবে তার ভাষায়, সত্য বলার কারণে কোনো ভয় কাজ করে না।
ডা. জাকিয়া জানান, সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়ার আগে তিনিও বিভিন্ন আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন। তবে সন্তান হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা শঙ্কা কাজ করত।
২ আগস্ট বৃষ্টিভেজা সকালে রিকশার ওপর দাঁড়িয়ে দুই তরুণীকে স্লোগান দিতে দেখে নিজের ছাত্রজীবনের কথা মনে পড়ে যায়। তিনি বলেন, তখন মনে হলো, আর বাসায় থাকার সময় নেই।
পরদিন স্বামী ডা. মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমানকে নিয়ে রাজপথে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। স্বামীর সেই কথাটি এখনো মনে আছে তার। তিনি বলেন, ‘আমরা দুই জায়গায় থাকব। কোথাও যদি গুলি হয়, অন্তত নুসাইবার (চিকিৎসক দম্পতির একমাত্র সন্তান) একজন অভিভাবক বেঁচে থাকুক।’
ডা. জাকিয়া বলেন, ‘৩ আগস্ট আমি রাজপথে ছিলাম, ৪ আগস্টও ছিলাম। এরপর ৫ আগস্ট দেশ স্বাধীন হলো।’
ডা. জাকিয়া জানান, শুধু তিনি নন, তার পুরো পরিবারই জুলাইয়ের দিনগুলোতে আহতদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তার স্বামী ডা. মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন। আহতদের মাথার খুলির আঘাত নিয়ে বিশেষজ্ঞ সাক্ষ্য দিয়েছেন তিনি।
তার বাবা, ময়মনসিংহের অবসরপ্রাপ্ত চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ আব্দুল খালেক তালুকদার কারফিউর মধ্যেও অলিগলি পেরিয়ে আহতদের চোখের অস্ত্রোপচার করেছেন। এছাড়া তার বোন ডা. ইরশাদ জাহান নীভাও ময়মনসিংহে গুলিবিদ্ধ রোগীদের চিকিৎসা দিয়েছেন। এমনকি নিরাপত্তার ঝুঁকি এড়াতে আহতদের কেবিনে লুকিয়ে রাখতেন।
ডা. জাকিয়া বলেন, ‘আমরা পুরো পরিবার নিয়েই জুলাইয়ে অবদান রাখার চেষ্টা করেছি।’
জিজ্ঞাসাবাদ, বদলির চেষ্টা, তারপরও পিছিয়ে যাননি
আহতদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে শুধু পেশাগত চাপই নয়, প্রশাসনিক চাপের মুখেও পড়তে হয়েছিল বলে জানান এই চিকিৎসক। তার ভাষায়, ‘সম্ভবত ২৭ বা ২৮ জুলাই হাসপাতালে এসেই আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। আমি কী করেছি, কী দেখেছি—এসব জানতে চাওয়া হয়েছিল।’
তিনি জানান, শুধু জিজ্ঞাসাবাদই নয়, তাকে বদলির তালিকাতেও রাখা হয়েছিল। শুধু বদলি নয়, আরও নানা ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। তবে এসব ঘটনায় চিকিৎসকদের মনোবল ভাঙেনি বলে দাবি করেন ডা. জাকিয়া।
মানবিক এই চিকিৎসক বলেন, ‘১৮, ১৯ ও ২০ জুলাই আমাদের জুনিয়র ও মিড-লেভেলের চিকিৎসকেরা প্রাণপণ কাজ করেছেন। কাউকে পিছিয়ে যেতে দেখিনি। অবশ্যই কিছু সিনিয়র চিকিৎসকেরও অসাধারণ সহযোগিতা ছিল।’
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেওয়ার পর ব্যক্তিগতভাবে নানা ধরনের হুমকি ও হয়রানির শিকার হওয়ার কথাও জানান ডা. জাকিয়া। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং ফোনে প্রচুর হয়রানির শিকার হয়েছি। হোয়াটসঅ্যাপে অশালীন বার্তা, ফোনে হুমকি, অশোভন কল—এসব প্রায় এক বছর ধরে সহ্য করেছেন তিনি।
জাকিয়া বলেন, গণমাধ্যমে প্রথম দিকেই আহতদের চোখে ধাতব পেলেট এবং কিছু ক্ষেত্রে রিয়েল বুলেট পাওয়ার তথ্য প্রকাশ করেছিলাম। এই বক্তব্যটি আলোচিত হওয়ার পর থেকেই হয়রানি আরও বেড়ে যায়। কিন্তু আমি সত্য ছাড়া কিছু বলিনি।
জুলাইয়ে আহতদের নিয়ে বিদ্রুপ বা প্রশ্ন তোলার প্রবণতায় ব্যথিত এই চিকিৎসক। তিনি বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালে ৪৯৩ জনের একটি চোখ সম্পূর্ণ অন্ধ হয়েছে। ১১ জনের দুই চোখই অন্ধ হয়েছে। ২৮ জনের দুই চোখ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৪৭ জনের একটি চোখ গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’
তার মতে, একটি চোখ হারানোর কষ্ট যিনি ভোগ করেননি, তিনি তা উপলব্ধি করতে পারবেন না। যারা আহতদের নিয়ে ব্যঙ্গ করেন, তাদের বলব, একবার অন্তরের চোখ খুলে এই মানুষগুলোর জীবনটা দেখুন।
সবচেয়ে বড় কাজ এখন পুনর্বাসন
সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কথা উল্লেখ করলেও আহতদের পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসনকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন ডা. জাকিয়া। তিনি বলেন, জুলাই যোদ্ধারা এখন ভাতা পাচ্ছেন, গেজেটভুক্তদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে, বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চলছে এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষায় অতিরিক্ত সময় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে তার মতে, এগুলোর পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের।
এমএইচ/জেবি




