দেশে প্রতি বছর আট থেকে দশ লাখ ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হলেও স্বেচ্ছায় রক্তদানে পূরণ হচ্ছে এর মাত্র এক-তৃতীয়াংশ। এ অবস্থায় নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন নিশ্চিত ও স্বেচ্ছায় রক্তদাতার সংখ্যা বাড়াতে একটি সমন্বিত ডাটাবেজ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলেন, রক্তের কোনো বিকল্প নেই, তাই জীবন রক্ষায় স্বেচ্ছায় রক্তদানকে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে হবে। একই সঙ্গে তরুণদের সম্পৃক্ততা বাড়ানো ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনারও আহ্বান জানান বক্তারা।
রোববার (১৪ জুন) বিশ্ব রক্তদাতা দিবসে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) র্যালিপূর্ব আলোচনায় স্বাস্থ্যখাতের বিশেষজ্ঞরা এসব কথা বলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
বিজ্ঞাপন
নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন নিশ্চিতকরণ এবং স্বেচ্ছায় রক্তদানের গুরুত্ব সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এই কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। ব্লাড ট্রান্সফিউশন সোসাইটি অব বাংলাদেশ (বিটিএসবি) এই আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএমইউ ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী বলেন, দ্রুত সরবরাহযোগ্য ও জীবন রক্ষাকারী একটি চিকিৎসার অংশ হিসেবে রক্তের কোনো বিকল্প হয় না। এর বিকল্প কেবল রক্তই। আজকের দিবসের উদ্দেশ্য হলো, রক্তদাতাদের উৎসাহিত করার পাশাপাশি রক্তগ্রহণ প্রক্রিয়াকে কাঠামোবদ্ধ উপায়ে সংরক্ষণের উদ্যোগ, ডাটাবেজ তৈরি ও সেটি প্রয়োজন অনুযায়ী কাজে লাগানো।
দাতার সংখ্যা বাড়াতে রক্তদাতা দিবসে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদেরকে স্কুল-কলেজ-মাদরাসায় শিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় আনা যেতে পারে, যার মাধ্যমে রক্তদানের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব তুলে ধরা সম্ভব হবে। জাতীয় কোনো সংকটে রক্তদান ব্যবস্থাপনায় আমরা হিমশিম খাই, এজন্য এতে সবার সম্পৃক্ততা বাড়ানো জরুরি।
অনেকে অনেক সময় রক্ত দিতে চায়, কিন্তু কোথায়, কীভাবে, কার কাছে রক্ত দেবে সেটা বুঝে উঠতে পারে না। এজন্য বিটিএসবি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
বিজ্ঞাপন
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, রক্তদাতাদের ডাটাবেজ নিয়ে দুর্বলতা রয়েছে। আমাদের দেশে প্রতি বছর প্রায় আট থেকে দশ লাখ ইউনিট রক্তের প্রয়োজন হয়। রক্তদাতাদের কাছ থেকে ৩০ ভাগ পাওয়া যায়। ৭০ ভাগ পাওয়া যায় রোগীর স্বজনদের কাছ থেকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্দেশনা হলো— স্বেচ্ছায় রক্তদানের বিষয়টি শতভাগে উন্নীত করতে হবে। কারণ এর সঙ্গে নিরাপদ রক্ত সঞ্চালনের বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
তিনি আরও বলেন, প্রযুক্তির মাধ্যমে সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ গড়ার বিষয়ে বর্তমান সরকারের যে অঙ্গীকার ও লক্ষ্য রয়েছে, এর মাধ্যমে স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের ডাটাবেজ বাস্তবায়িত হলে ব্লাড ট্রান্সফিউশন বিভাগ আরও বেশি কার্যকর উদ্যোগ রাখতে পারবে।
স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচিকে আরও বেগবান করতে তরুণ, যুবক ও মধ্যবয়সীদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তাহলে ডব্লিউএইচও’র নির্দেশনা সফল করা সহজ হবে।
ব্লাড ট্রান্সফিউশন সোসাইটি অব বাংলাদেশের (বিটিএসবি) মহাসচিব ডা. মো. খায়রুল ইসলাম বলেন, রক্ত মানবদেহের এমন একটি উপাদান, যার ঘাটতিতে মানুষের মৃত্যু হতে পারে। রক্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিমোগ্লোবিন, সেটা কমে গেলে অনেক উপসর্গ দেখা দেয়। সেই চিকিৎসা রক্ত দিয়েই করতে হয়। তরুণ ও যুবকদের প্রতি আমাদের আহ্বান, রক্তদান করলে নিজের কোনো ক্ষতি হয় না, বরং এর মাধ্যমে মানবতার মহান কাজে ভূমিকা রাখার সুযোগ হয়। রক্ত সঞ্চালনের সময় দাতা বিনামূল্যে অনেকগুলো পরীক্ষার সুযোগ পান এবং বিভিন্ন রোগ-জীবাণু তার মধ্যে আছে কি-না, তা জানার সুযোগ পান।
রক্তদানে এগিয়ে আসতে নাগরিকদের আহ্বান জানান বিটিএসবি সভাপতি অধ্যাপক ডা. ফারহান ইসলাম। তিনি বলেন, আমাদের বছরে আট-দশ লাখ ব্যাগ রক্তের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু এর মাত্র ৩৪ শতাংশ চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয়। সুতরাং দেশে স্বেচ্ছায় রক্তদানের পরিমাণ খুবই কম। আমরা চাই, শতভাগ স্বেচ্ছায় রক্তদান। এটা হলে রক্তের একটি রিজার্ভ তৈরি করা সম্ভব হবে। আর সুনির্দিষ্ট ডাটাবেজের মাধ্যমে দান করা ও সংরক্ষণ করা গেলে নিদানকালে রক্তদাতাও সেই রক্ত নিজের ও স্বজনদের প্রয়োজনে পেতে পারেন।
অধ্যাপক ডা. ফারহান ইসলাম বলেন, রক্তের যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে চাই। রক্তে যেমন জীবন বাঁচে, তেমনি ভুলভাবে রক্ত পরিসঞ্চালন অথবা ভুল রক্ত দেওয়ার কারণে অনেক সময় জীবন শেষ হয়ে যায়। এখানে সামান্য ভুল করার কোনো সুযোগ নেই, আবেগের কোনো সুযোগ নেই।
ব্লাড ট্রান্সফিউশন সোসাইটি অব বাংলাদেশের কোষাধ্যক্ষ ডা. মো. ওয়াসিমের সঞ্চালনায় আলোচনা শেষে র্যালিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা চত্বর প্রদক্ষিণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে গিয়ে শেষ হয়। বর্ণাঢ্য এই র্যালিতে বিএমইউসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসক, প্রশিক্ষণার্থী চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
এসএইচ/এফএ




