উচ্চ রক্তচাপে হার্ট, কিডনি, মস্তিষ্ক, রক্তনালী ও চোখসহ বিভিন্ন অঙ্গের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। অর্থাৎ উচ্চ রক্তচাপ এসব অঙ্গের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এ অবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ঔষধ নীতি নির্ধারণ করা জরুরি।
শনিবার (১৬ মে) বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের লেকচার হলে আয়োজিত এক সেমিনারে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক ডা. এফ. এম. সিদ্দিকী এসব বলেন।
বিজ্ঞাপন
ডিপার্টমেন্ট অব পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিক্সের উদ্যোগে আয়োজিত এই সেমিনারে নীরব ঘাতক উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে চিকিৎসা, ওষুধ সরবরাহ, বাজেট বৃদ্ধি ও বহুমুখী সমন্বিত উদ্যোগের বিষয়ে আলোচনা করা হয়।
বিএমইউ উপাচার্য বলেন, ‘বাংলাদেশে প্রায় ২১ থেকে ২৩ শতাংশ মানুষ হাইপারটেনশনে ভুগছেন, তবে এর মধ্যে মাত্র ১৪ শতাংশ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী কার্যকারিতাসম্পন্ন ওষুধ ব্যবহারের পাশাপাশি দেশের ড্রাগ পলিসি আরও উন্নত করার করতে হবে।’
উপাচার্য বলেন, ‘উচ্চ রক্তচাপ হার্ট, কিডনী, ব্রেইন, রক্তনালী, চোখসহ পাঁচটি অর্গানের উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। নীরব ঘাতক উচ্চ রক্তচাপ হৃদরোগ, স্ট্রোকসহ মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকির বড় কারণ। আজকের সেমিনার উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে হেলথ কেয়ার পলিসিতে বিশেষ ভূমিকা রাখবে।’
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিএমইউর প্রো-ভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ। বিশেষ অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের হেলথ সার্ভিস ডিভিশনের অতিরিক্ত সচিব মোমেনা মনি, প্রো-ভিসি (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মো. মুজিবুর রহমান হাওলাদার, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নাহরীন আখতার প্রমূখ। সেমিনারের অংশ হিসেবে ‘হাইপারটেনশন প্রিভেনশন ইন বাংলাদেশ: ইমাজিং চ্যালেঞ্জেস এন্ড ফিউচার ডাইরেকশন’ শীর্ষক বইয়ের মোড়ক উম্মোচন করা হয়।
বিজ্ঞাপন
সেমিনারে উদ্বোধনী বক্তব্য দেন ডিপার্টমেন্ট অফ পাবলিক হেল্থ এন্ড ইনফরমেটিক্সের চেয়ারম্যান ও প্রিভেন্টিভ এন্ড সোশ্যাল মেডিসিনের ডীন অধ্যাপক ডা. মো. আতিকুল হক। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদের ডিন, বিভাগীয় প্রধান, শিক্ষক, গবেষক এবং পাবলিক হেলথ বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন।
অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘উচ্চ রক্তচাপ শুধু হৃদরোগ বা স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায় না, এটি ধীরে ধীরে শরীরের রক্তনালীর স্বাভাবিক কার্যকারিতা নষ্ট করে বিভিন্ন জটিলতা সৃষ্টি করে। তিনি জানান, গবেষণায় দেখা গেছে, অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ পুরুষদের মধ্যে ইরেক্টাইল ডিসফাংশনের মতো সমস্যার কারণ হতে পারে, যা ভবিষ্যৎ হৃদরোগের আগাম সতর্কসংকেত।’
অধ্যাপক আজাদ বলেন, ‘নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, ধূমপান বর্জন এবং সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ওষুধের দাম কমানো যেমন জরুরি একই সাথে যে ধরণের ওষুধ উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে অধিক কার্যকর সেটা বিবেচনায় নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করতে হবে।’
এ সময় বক্তারা বলেন, এই সেমিনারের উদ্দেশ্য হলো সচেতনতা বৃদ্ধি করা, রোগ নির্ণয়ের হার উন্নত করা এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ ও হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং মৃত্যুর ঝুঁকি কমানোর জন্য জীবনযাত্রার পরিবর্তনে উৎসাহিত করা। প্রাথমিক পর্যায়ে রক্তচাপ শনাক্তকরণ এবং তা দীর্ঘস্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা।
অতিরিক্ত সচিব মোমেনা মনি বলেন, উচ্চ রক্তচাপ মানুষের উপর একটি সংকট তৈরি করেছে। এটা শুধু রোগীর ব্যক্তিগত বিষয় নয়। বর্তমানে ৩০ থেকে ৭৯ বছর বয়সে ২৮ শতাংশ মানুষ বা আড়াই কোটি মানুষ উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। তরুণদের মধ্যেও রোগটি ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকে মারা যাচ্ছে। কিশোর কিশোরীরা প্রি হাইপার টেনশনে ভুগছে। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, মানসিক চাপ ও তামাক ব্যবহার তরুণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। উচ্চ রক্তচাপ সমস্যা এখন মানুষের স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অধ্যাপক নাহরীন আখতার বলেন, ‘নগরায়ন ধুমপান, বায়ুদুষণ, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভাস, মানসিক চাপ, শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া ইত্যাদি উচ্চ রক্তচাপের কারণ। এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে বহুমুখী ও সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।’
হেল্থ সার্ভিস ডিভিশনের যুগ্ম সচিব মামুনুর রশিদ বলেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গ্লোবাল রিপোর্ট অন হাইপারটেনশন ২০২৫ অনুযায়ী, আক্রান্ত মানুষের একটি বড় অংশ এখনও তাদের রোগ সম্পর্কে সচেতন নয়। তাই জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং জনগণকে শিক্ষিত করা অত্যন্ত জরুরি।’
অধ্যাপক জাকির হোসেন বলেন, ‘দেশে ৩০ থেকে ৭৯ বছর বয়সীদের মধ্যে প্রায় ৩৩ শতাংশ মানুষ হাইপারটেনশনে আক্রান্ত এবং আক্রান্তদের মধ্যে ৪৪ শতাংশ এখনও শনাক্ত হয়নি। এছাড়া দেশের মোট স্বাস্থ্য বাজেটের একটি সীমিত অংশ এনসিডি খাতে বরাদ্দ থাকায় প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম আরও জোরদার করার প্রয়োজন রয়েছে।’
এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডের (ইডিসিএল) ডিজিএম মোহাম্মদ রিয়াদ আরেফিন বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এনসিডি ওষুধ ক্রয়ের বাজেট না থাকায় কিছু সময় ওষুধ সরবরাহ বন্ধ ছিল, যা পরবর্তীতে পুনরায় চালু হয়েছে। কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয় বলে আগাম চাহিদা জানা থাকায় সরবরাহ নিশ্চিত করা সহজ হয়।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন ও রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, এনসিডি কর্নারের মাধ্যমে দেশের ৩১০টি উপজেলায় গ্রামীণ জনগণকে সেবা দেওয়া হচ্ছে। রোগীদের ওষুধ সরবরাহের সময়সীমা বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
ন্যাশনাল টোব্যাকো কন্ট্রোল সেলের মহাপরিচালক মো. আখতারউজ-জামান বলেন, তামাক নিয়ন্ত্রণ শুধুমাত্র স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজ নয়; এটি একটি বহুমুখী সমন্বিত উদ্যোগ।
ইডিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ এ সামাদ মৃধা বলেন, সরকারের ওষুধের মোট চাহিদার বড় একটি অংশ ইডিসিএল সরবরাহ করে থাকে। ডলারের দাম বৃদ্ধি সত্ত্বেও ইডিসিএল ৪৮টি ওষুধের দাম কমিয়েছে। এটা ছিল একটি চ্যালেঞ্জিং বিষয়। ওষুধের দাম বৃদ্ধির প্রধান কারণ ছিল একটি বিশেষ সিন্ডিকেট যা ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছে। রোগীসহ সাধারণ মানুষকে স্বল্প ও সুলভ মূল্যে ওষুধ সরবরাহ করতে ইডিসিএল অঙ্গীকারবদ্ধ।
এসএইচ/ক.ম




