বুধবার, ১৩ মে, ২০২৬, ঢাকা

অতিরিক্ত লবণ খেয়ে দেশে বছরে মারা যায় ২৪ হাজার মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৩ মে ২০২৬, ০৯:০০ পিএম

শেয়ার করুন:

অতিরিক্ত লবণ খেয়ে দেশে বছরে মারা যায় ২৪ হাজার মানুষ

অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ এখন দেশে একটি বড় জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশের তুলনায় দেশে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ প্রায় দ্বিগুণ লবণ গ্রহণ করছেন। এর ফলে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, স্ট্রোক, কিডনি রোগসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ছে এবং প্রতি বছর প্রায় ২৪ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
  
বুধবার (১৩ মে) বিশ্ব লবণ সচেতনতা সপ্তাহ-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে এবং ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের কারিগরি সহায়তায় রাজধানীতে এ সেমিনারের আয়োজন করা হয়।
 
বক্তারা জানান, দেশে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ দৈনিক গড়ে প্রায় ৯ গ্রাম লবণ গ্রহণ করেন, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশকৃত মাত্রার প্রায় দ্বিগুণ। অতিরিক্ত লবণ গ্রহণের কারণে উচ্চ রক্তচাপের পাশাপাশি হৃদরোগ, স্ট্রোক, কিডনি রোগ ও পাকস্থলির ক্যানসারের মতো নানা জীবনঘাতী রোগের ঝুঁকি বাড়ছে।
 
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. আনোয়ারুল ইসলাম। প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের মহাপরিচালক ফারুক আহম্মেদ। সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন সংস্থাটির সদস্য (খাদ্য শিল্প ও উৎপাদন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব। 

এছাড়া বক্তব্য দেন ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালের অ্যাসিস্টেন্ট সাইন্টিস্ট ডা. আহমাদ খাইরুল আববার, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রোগ্রাম অফিসার (ডায়েট রিলেটেড রিস্ক ফ্যাক্টর) সামিনা ইসরাত, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. সাইদুল আরেফিন প্রমুখ।
 
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের মহাপরিচালক ফারুক আহম্মেদ বলেন, অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ বর্তমানে একটি নীরব জনস্বাস্থ্য হুমকিতে পরিণত হয়েছে। খাদ্যে অতিরিক্ত লবণের ব্যবহার মানুষের অজান্তেই উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর খাদ্য নিশ্চিত করতে খাদ্যের মোড়কে সঠিক পুষ্টি তথ্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা এবং তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি। একইসঙ্গে জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে সরকার, খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
 
স্বাগত বক্তব্যে অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব বলেন, অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ বর্তমানে বিশ্বব্যাপী একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে স্বীকৃত। উচ্চমাত্রায় লবণ গ্রহণ রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয় এবং হৃদরোগসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করে। একইসঙ্গে এটি অস্বাস্থ্যকর ওজন বৃদ্ধি ও অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। লবণ গ্রহণ কমাতে ব্যক্তি ও পরিবার পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি খাদ্যশিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যে লবণের পরিমাণ কমিয়ে স্বাস্থ্যসম্মত পণ্য উৎপাদনে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে কার্যকর জনস্বাস্থ্য নীতি ও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ কাঠামো গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
 
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালের অ্যাসিস্টেন্ট সাইন্টিস্ট ডা. আহমাদ খাইরুল আববার বলেন, দেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশই অসংক্রামক রোগের কারণে ঘটে এবং এর মধ্যে ৫১ শতাংশ মানুষ অকালে মারা যান। অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ উচ্চ রক্তচাপের পাশাপাশি হৃদরোগ, স্ট্রোক, কিডনি রোগ ও পাকস্থলির ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। বাংলাদেশে প্রতি চারজনের মধ্যে একজন উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা নিয়ন্ত্রণে থাকে না। অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ উচ্চ রক্তচাপ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে।
 
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রোগ্রাম অফিসার সামিনা ইসরাত বলেন, বাংলাদেশে ফ্রন্ট-অব-প্যাক লেবেলিং ব্যবস্থা চালু করা খাদ্যজনিত অসংক্রামক রোগ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্যাকেটজাত খাদ্যের সামনের অংশে স্পষ্ট ও সহজবোধ্য পুষ্টি তথ্য উল্লেখ থাকলে ভোক্তারা স্বাস্থ্যকর খাদ্য বেছে নিতে সক্ষম হবেন। পাশাপাশি খাদ্যশিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোও পণ্যের পুষ্টিগুণ উন্নত করতে উৎসাহিত হবে।
 
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, চিপস, চানাচুর, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, আচার, স্যুপ ও বিস্কুটসহ বিভিন্ন জনপ্রিয় খাদ্যে উচ্চমাত্রার লবণ থাকে। এমনকি অনেক মিষ্টি খাবারেও অতিরিক্ত সোডিয়াম বিদ্যমান, যা অধিকাংশ ভোক্তার অজানা। ফলে মানুষ না জেনেই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি লবণ গ্রহণ করছেন। তিনি উচ্চ লবণযুক্ত খাবার সহজে চিহ্নিত করার জন্য বাধ্যতামূলক ফ্রন্ট-অফ-প্যাক ওয়ার্নিং লেবেলিং ব্যবস্থা চালু, প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্রস্তুত প্রণালী পুনর্গঠন এবং শিক্ষামূলক প্রচারণা জোরদারের আহ্বান জানান।
 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. সাইদুল আরেফিন বলেন, দেশে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের ব্যবহার উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। শিশু, কিশোর-কিশোরী ও প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে প্যাকেটজাত খাবার খাওয়ার প্রবণতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে।
 
এএইচ/ক.ম 

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর