দেশে কিডনি রোগে আক্রান্তের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। ২০১৯ সালে প্রকাশিত আটটি গবেষণার ওপর একটি সিস্টেমেটিক রিভিউ অনুযায়ী দেশে কিডনি রোগে আক্রান্তের হার প্রায় ২২ দশমিক ৪৮ শতাংশ। ১৭ কোটি মানুষের এই দেশে এ হিসাব ধরলে কিডনি রোগীর সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৮২ লাখ।
প্রতি বছর ৩০ থেকে ৪০ হাজার রোগীর কিডনি বিকল হচ্ছে এবং নতুন রোগীদের প্রায় ৮০ শতাংশ প্রয়োজনীয় চিকিৎসার অভাবে বা বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছে। বর্তমানে মৃত্যুর কারণ হিসেবে কিডনি রোগের অবস্থান অষ্টম; ২০৪০ সালের মধ্যে এটি পঞ্চম স্থানে উঠে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) শহীদ ডা. মিল্টন হলে বিশ্ব কিডনি দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সেমিনারে বক্তারা এসব বলেন। এতে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম।
বক্তাদের মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য সচিব ডা. মো. ফরহাদ হাসান চৌধুরী, কোষাধ্যক্ষ ডা. মো. আব্দুল মুকীত, সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. মো. রেজাউল আলম, যুগ্ম আহ্বায়ক ডা. শাহনেওয়াজ দেওয়ান, সহযোগী অধ্যাপক ডা. মেজবাহ উদ্দিন নোমান প্রমুখ।
বক্তারা বলেন, কিডনি রোগ প্রতিরোধমূলক সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণ ও স্ক্রিনিং সম্প্রসারণ, প্রাথমিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় কিডনি সেবাকে অন্তর্ভুক্ত ও শক্তিশালী করা, কিডনি প্রতিস্থাপন সম্পর্কে গণসচেতনতা বৃদ্ধি এবং মরণোত্তর কিডনি প্রতিস্থাপন সফল করার আহ্বান জানানো হয়।
‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষিত সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা বাস্তবায়িত হলে কিডনি রোগ প্রতিরোধ, দ্রুত শনাক্তকরণ ও চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসবে। কারণ কিডনি রোগ দীর্ঘদিন নীরবে বৃদ্ধি পায় এবং সময়মতো পরীক্ষা ও চিকিৎসা না পাওয়ায় এ রোগ জটিল আকার ধারণ করে।’ বলেন বক্তারা।
বিজ্ঞাপন
সমাবেশে বক্তারা কিডনি রোগ প্রতিরোধের উপর গুরুত্বারোপ করেন। তারা বলেন, কিডনি রোগের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হলেও রোগ নির্ণয়ের ব্যয় তুলনামূলক কম। তাই রোগ নির্ণয়ে অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। একটি পরিবারের জন্য কিডনি চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এই ব্যয়ভার প্রভাব শুধুমাত্র রোগী বা তার পরিবারের উপর নয়, বরং এটি সমগ্র জাতির জন্য এবং সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সুতরাং চিকিৎসক হিসেবে, স্বাস্থ্য সেবার অভিভাবক হিসেবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে অবশ্যই কিডনি রোগ প্রতিকারের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।
আশার বিষয় হচ্ছে, কিডনি রোগ নির্ধারণের প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে সহজ। শুধুমাত্র একটি প্রস্রাব পরীক্ষার মাধ্যমে একজন কিডনি রোগী শনাক্ত করা সম্ভব। যদি প্রতিটি ইউনিয়ন সাব-সেন্টার, উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্স, সদর হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ ও ডায়াবেটিক কেয়ার সেন্টারে এই তথ্য ও প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়া যায়, তাহলে কিডনি রোগ শনাক্ত করা অনেক সহজ হয়ে যাবে। কিডনি রোগের প্রতিকারও মানুষের সক্ষমতার মধ্যে চলে আসবে। এবারের প্রতিপাদ্য হচ্ছে—সুস্থ কিডনি সকলের তরে, মানুষের যত্নে বাঁচাও ধরণীরে।’
সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম বলেন, নীরব ঘাতক কিডনি রোগ প্রতিরোধে জনসচেতনতা সৃষ্টি অপরিহার্য। কিডনি রোগ প্রতিরোধে ভেজাল খাবার এড়িয়ে চলা উচিত, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা দরকার, এবং উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
এর আগে বিএমইউর বি ব্লকের বটতলা থেকে একটি কিডনি রোগ সচেতনতামূলক র্যালি বের করা হয়। ‘সুস্থ কিডনি সকলের তরে, মানুষের যত্নে বাঁচাও ধরণীরে’—এই প্রতিপাদ্যে আয়োজিত র্যালিটি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। র্যালিটির উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম।
প্রসঙ্গত, এর আগে ৮ মার্চ বিএমইউর বি ব্লকের বটতলায় বিশ্ব কিডনি দিবসের প্রাক্কালে কিডনি রোগ সচেতনতামূলক ভ্রাম্যমান ছাদখোলা গাড়ির উদ্বোধন করা হয়। সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণ মন্তব্য করেন, কিডনি রোগ সময়মতো চিহ্নিত না হলে রোগীর জন্য বড় ক্ষতি হতে পারে। এছাড়া ১১ মার্চ ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ কিডনি ডিজিজ এ্যান্ড ইউরোলজির অডিটোরিয়ামে কিডনি রোগ বিষয়ে জনসচেতনতামূলক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
এসএইচ/ক.ম

