মঙ্গলবার, ৩ মার্চ, ২০২৬, ঢাকা

রাজধানীর আইসিইউতে ওষুধ প্রতিরোধী ছত্রাক: গবেষণা

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৩ মার্চ ২০২৬, ০৭:২৬ পিএম

শেয়ার করুন:

ICU
দেশের একটি হাসপাতালের আইসিইউ (ফাইল ছবি)

রাজধানীর বিভিন্ন ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) একটি ওষুধ প্রতিরোধী ছত্রাক ছড়িয়ে পড়ার তথ্য উঠে এসেছে গবেষণায়। ‘ক্যানডিডা অরিস’ নামের এই ছত্রাক সহজে নিরাময়যোগ্য নয়। এই ধরনের ছত্রাক পূর্ববর্তী গবেষণায় নবজাতকের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ) দেখা গেলেও, নতুন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে সমস্যাটি আরও বিস্তৃত এবং অন্য আইসিইউগুলোতেও প্রাপ্তবয়স্ক রোগীদের মধ্যে সংক্রমণ ঘটাচ্ছে। 

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) পরিচালিত এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। মঙ্গলবার (৩ মার্চ) এসব তথ্য তুলে ধরেছে আইসিডিডিআর,বি। 


বিজ্ঞাপন



 
সংস্থাটি জানায়, মাইক্রোবায়োলজি স্পেকট্রাম জার্নালে সম্প্রতি প্রকাশিত এ গবেষণাটি ঢাকার একটি সরকারি এবং একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে পরিচালিত হয়। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সহযোগিতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি) কারিগরি সহায়তায় এটি পরিচালিত হয়।

২০২১ সালের আগস্ট থেকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ৩৭২ জন আইসিইউ রোগীকে এ গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করা হয় বলে জানিয়েছে আইসিডিডিআর,বি। 


বিজ্ঞাপন


ICU_ii
আইসিইউ

সংস্থাটি জানিয়েছে, রোগীদের আইসিইউতে ভর্তি করার পরপরই এবং পরবর্তী সময়ে সেখানে তাদের অবস্থানকালীন তাদের ত্বকে ক্যানডিডা অরিস রয়েছে কি না অথবা রক্তে সংক্রমণ হয়েছে কি না তা নির্ণয়ের জন্য পরীক্ষা করা হয়। ত্বক ও রক্তের নমুনা পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করা হয় এবং সন্দেহজনক নমুনাগুলো ভিটেক-২ পদ্ধতিতে নিশ্চিত করা হয়।

গবেষণার তথ্য বলছে, ক্যানডিডা অরিস উপসর্গ ছাড়াই ত্বকে বসবাস (কলোনাইজেশন) করতে পারে। তবে কিছু ক্ষেত্রে এটি রক্তে প্রবেশ করে মারাত্মক সংক্রমণ ঘটায়। গুরুতর অসুস্থ রোগী এবং যাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম— তাদের জন্য এই ছত্রাক বেশি ক্ষতিকর। এছাড়া প্রায় সব ধরনের ‘ক্যানডিডা অরিস’ সাধারণত ব্যবহৃত অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী হওয়ায় এর চিকিৎসা বেশ কঠিন। এসব কারণে বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যসেবা কর্তৃপক্ষ ক্যানডিডা অরিসকে গুরুতর একটি স্বাস্থ্যবিষয়ক হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে। 

গবেষণায় দেখা গেছে, আইসিইউতে থাকার কোনো একপর্যায়ে প্রায় ৭ শতাংশ রোগীর শরীরে ক্যানডিডা অরিসের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই রোগীদের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি আইসিইউতে থাকার সময়ই ছত্রাকটির দ্বারা সংক্রমিত হয়েছেন—যা থেকে বোঝা যায় যে, এই সংক্রমণ মূলত হাসপাতাল থেকে ছড়িয়ে পড়ছে।

আইসিডিডিআর,বি বলছে, সরকারি হাসপাতালে এই হার বেসরকারি হাসপাতালের তুলনায় বেশি। সরকারি হাসপাতালে প্রায় ১৩ শতাংশ রোগী আইসিইউতে থাকার সময় ক্যানডিডা অরিস দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন, যেখানে বেসরকারি হাসপাতালে এ হার প্রায় ৪ শতাংশ। এর মাধ্যমে এই দুটি হাসপাতালে সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার পার্থক্যের বিষয়টি বোঝা যায়।

আন্তর্জাতিক গবেষণার সঙ্গে তুলনা করলে ঢাকার আইসিইউগুলোতে পাওয়া এই হার তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। যেখানে কানাডা ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো উচ্চ-আয়ের দেশগুলোতে পরিচালিত গবেষণায় সাধারণত ০.৫ শতাংশেরও কম হারে এই ছত্রাকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। 

গবেষণার ফলাফলে বলা হয়েছে, যেসব রোগীর শরীরে ক্যানডিডা অরিস পাওয়া গেছে, তারা বেশি গুরুতর অসুস্থ ছিলেন, আইসিইউতে দীর্ঘদিন অবস্থান করছিলেন এবং তাদের জন্য মেকানিক্যাল ভেন্টিলেশন বা সেন্ট্রাল ও ইউরিনারি ক্যাথেটারের মতো ইনভেসিভ চিকিৎসা পদ্ধতির প্রয়োজন হয়েছে। আবার এসব পদ্ধতি অনেক সময় জীবনরক্ষাকারী হলেও যথাযথ পরিচ্ছন্নতা ও জীবাণুনাশের ব্যবস্থা না থাকলে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় দেখা গেছে, সব ক্যানডিডা অরিস জীবাণু ফ্লুকোনাজলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী এবং একটি বাদে প্রায় সব জীবাণুই ভরিকোনাজলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী, অর্থাৎ জীবাণু ধ্বংসে কাজ করছে না। এগুলো সাধারণত প্রথম ও দ্বিতীয় সারির অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আবার কিছু জীবাণু একাধিক ওষুধের বিরুদ্ধে অকার্যকর ছিল। এতে এসব সংক্রমণের চিকিৎসা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ার বিষয়টি এবং অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধ ব্যবহারে উন্নত দিকনির্দেশনার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে।

আইসিডিডিআর,বি-এর ইনফেকশাস ডিজিজেস ডিভিশনের এএমআর রিসার্চ ইউনিটের প্রধান এবং গবেষণাটির প্রধান গবেষক ড. ফাহমিদা চৌধুরী বলেন, এই গবেষণা স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে যে, ক্যানডিডা অরিস শুধু গুরুতর অসুস্থ নবজাতকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি সব ধরনের আইসিইউ পরিবেশের জন্য একটি বড় হুমকি।  

ICU_iii
আইসিইউ

ফাহমিদা চৌধুরী বলেন, আমরা হাসপাতালের ভেতরেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার সুস্পষ্ট প্রমাণ পেয়েছি এবং সচরাচর ব্যবহৃত অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধের বিরুদ্ধে উচ্চমাত্রার প্রতিরোধ দেখতে পাচ্ছি। তাই সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার, উন্নত নজরদারি এবং চিকিৎসা কার্যক্রম আরও সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনা করা এখন অত্যন্ত জরুরি।

নির্বাচিত কিছু নমুনার জিনগত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আইসিইউগুলোতে পাওয়া ক্যানডিডা অরিস মূলত দক্ষিণ এশীয় ধরনভুক্ত। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, এই ছত্রাকটি এখন অঞ্চলটিতে স্থায়ীভাবে অবস্থান করছে, শুধু বাইরের দেশ থেকে আসা কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়।

গবেষকরা হাসপাতালের বিভিন্ন স্থান নিয়মিত ও যথাযথভাবে ক্লোরিনভিত্তিক কার্যকর জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করা, স্বাস্থ্যকর্মীদের সঠিকভাবে হাত ধোয়ার অভ্যাস নিশ্চিত করা এবং উচ্চঝুঁকিপূর্ণ ইউনিটগুলোতে নিয়মিত স্ক্রিনিং চালুর সুপারিশ করেছেন—যেন সংক্রমিত বা জীবাণু বহনকারী রোগীদের দ্রুত শনাক্ত করা যায়।

পাশাপাশি, অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধের সংযত ও যুক্তিসঙ্গত ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপরও তারা গুরুত্ব দিয়েছেন, যেন কার্যকর চিকিৎসার সীমিত বিকল্পগুলো দীর্ঘদিন ব্যবহার করা যায়।
 
গবেষকরা বলছেন, ঢাকা শহর ও সারাদেশে সমস্যাটির বিস্তৃতি ভালোভাবে বোঝার জন্য আরও বেশি হাসপাতালে বৃহৎ পরিসরের গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রয়োজন।

ক.ম/

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর