বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬, ঢাকা

‘স্বাস্থ্য খাতের পরিবর্তনে প্রয়োজন দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন’

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৪:২২ পিএম

শেয়ার করুন:

‘স্বাস্থ্য খাতের পরিবর্তনে প্রয়োজন দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন’
ডিআরইউতে ‘ড্রাফট প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা (পিএইচসি) আইন পর্যালোচনা’ শীর্ষক উচ্চ-স্তরের নীতি সংলাপ। ছবি: ঢাকা মেইল

দুর্নীতি, অনিয়ম আর অপশাসনে জর্জরিত দেশের স্বাস্থ্যখাত। রোগীরা বঞ্চিত হচ্ছেন সঠিক সেবা থেকে। আবার কেউ কেউ চিকিৎসা নিতে যাচ্ছে বিদেশ। এতে ক্ষতি হচ্ছে দেশের। তাই দেশের স্বাস্থ্যখাতের পরিবর্তনে প্রয়োজন দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন। 

বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টাস ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে এক আলোচনায় এসব বলেন বিশেষজ্ঞরা। ‘ড্রাফট প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা (পিএইচসি) আইন পর্যালোচনা’ শীর্ষক উচ্চ-স্তরের নীতি সংলাপের আয়োজন করে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) এবং ইউএইচসি ফোরাম। সহযোগিতায় ছিল ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরাম।
 
সংলাপে অংশগ্রহণকারীরা স্বাস্থ্য সংস্কারের রাজনৈতিক অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। এছাড়া শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি, প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ এবং আসন্ন নির্বাচনি আদেশে স্বাস্থ্য সংস্কারের অগ্রাধিকারের অন্তর্ভুক্তির প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন। 


বিজ্ঞাপন


সভায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সমর্থিত চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) মহাসচিব ডা. মো. জহিরুল ইসলাম শাকিল বলেন, এই সরকার আসার পর স্বাস্থ্যখাত সংস্কারে একটি কমিশন গঠন করে। এটি ছিল ভালো উদ্যোগ। স্বাস্থ্য নীতি, ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্য বিমা এবং চিকিৎসা শিক্ষার মানোন্নয়নসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনা সংস্কার কমিশনের কাছে জমা দিয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, গত ৬-৭ মাসে বড় আকারের পদোন্নতি ছাড়া স্বাস্থ্য খাতের মূল সংস্কারে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।

জহিরুল ইসলাম শাকিল বলেন, বেশিরভাগ উপজেলা অ্যাম্বুলেন্স পড়ে আছে এবং ওটি হয় না। উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যখাতের অবস্থা করুণ, চিকিৎসক সংকট, যন্ত্রপাতি নষ্টসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত। স্বাস্থ্যখাত আর জনগণ এখন মুখোমুখি। আগামী দিনে যেই সরকার আসবে স্বাস্থ্যখাত ঢেলে সাজাবে। আমরা কেউ কারো প্রতিপক্ষ নয়।

জামায়াতে ইসলামীর সমর্থিত চিকিৎসক সংগঠন ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের (এনডিএফ) সিনিয়র সহ-সভাপতি ডা. একেএম ওয়ালি উল্লাহ বলেন, এটি সংস্কার তখনই সম্ভব, যখন রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে। স্বাস্থ্যখাতের পরিবর্তনে রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও দেশের স্বাস্থ্যখাতের অবস্থা নাজুক, মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বাস্থ্যের যে দুরবস্থা তা মেনে নেওয়া যায় না। একটি তথ্য আপনাদের দিই—যেখানে মিয়ানমারের মতো দেশের স্বাস্থ্য সূচক ৬৪, সেখানে আমাদের সূচক মাত্র ৫০ শতাংশ। শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া বা মালয়েশিয়া আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে। এটি আমাদের জন্য যেমন দুঃখজনক, তেমনি অপমানজনক।

একেএম ওয়ালি উল্লাহ বলেন, স্বাস্থ্যখাতের পরিবর্তনে লিগ্যাল রিফর্ম লাগবে এবং সুশাসন অর্থাৎ দুর্নীতিমুক্ত সরকার প্রয়োজন। আমাদের প্রচুর অবকাঠামো রয়েছে এবং প্রয়োজন দক্ষ জনবল। অবকাঠামোগুলো যথাযথ কাজে লাগালে স্বাস্থ্যখাতের বড় পরিবর্তন আসবে।


বিজ্ঞাপন


বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি প্রতীক ইজাজ বলেন, দেশের স্বাস্থ্য খাতের বড় সংকট হলো অতি-দলীয় রাজনীতি, যার কারণে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দক্ষ চিকিৎসকরা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন এবং রোগীরা কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হন। 

প্রতীক ইজাজ বলেন, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা উপেক্ষা করে কেবল বিদেশি ফান্ডের ওপর ভিত্তি করে পরিকল্পনা সাজানো এবং আইসিইউ বা বেড সংকটের মতো মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধান না হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। বহু বছর ধরে সচেতনতামূলক কাজের পরেও আজও এইডস রোগীদের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে চিকিৎসকদের জড়তা কাটেনি, যা আমাদের নীতিমালার ব্যর্থতাকেই ফুটিয়ে তোলে। 

স্বাস্থ্য সেবাকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে রেখে একটি উদার ও সার্বজনীন নীতিমালা গ্রহণ করলেই কেবল সাধারণ মানুষের জন্য প্রকৃত সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব বলে মনে করেন এই সাংবাদিক।

বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির পরিবার কল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক ডা. মহসিন জিল্লুর করিম বলেন, দেশের বর্তমান ধ্বংসপ্রায় চিকিৎসা শিক্ষা ও বাণিজ্যিকীকরণ বন্ধ করে যোগ্য চিকিৎসক এবং জনবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাই আমাদের মূল লক্ষ্য। ভুল চিকিৎসা ও সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে টাকা চুষে নেওয়ার অমানবিক সংস্কৃতি বদলে দিয়ে আমরা গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত সুষম চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে চাই। 

ডা. মহসিন জিল্লুর করিম বলেন, আমাদের পরিকল্পনা হলো এমন এক ব্যবস্থা গড়া, যেখানে আস্থার অভাবে কাউকে আর বিদেশে যেতে হবে না এবং গুলশান বা গ্রাম—সবখানের রোগী সমান অধিকার পাবেন। ফাঁকা প্রতিশ্রুতি নয়, বরং সবার জন্য মানসম্মত চিকিৎসার নিশ্চয়তা দিয়ে আমরা এই ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন আনতে বদ্ধপরিকর। 
 
স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এম এ ফয়েজ বলেন, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত বর্তমানে একটি কাঠামোহীন ও বিশৃঙ্খল অবস্থায় রয়েছে, যেখানে ১১৬টিরও বেশি মেডিকেল কলেজ কেবল সংখ্যা বাড়ালেও মানসম্মত চিকিৎসক তৈরিতে ব্যর্থ হচ্ছে। আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি সমন্বিত, মানসম্মত ও জবাবদিহিমূলক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, যা সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে এবং যার কোনো বিকল্প নেই। 

অধ্যাপক এম এ ফয়েজ বলেন, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও যোগ্য নেতৃত্ব ছাড়া এই সংকট মোকাবেলা অসম্ভব, তাই কেবল অবকাঠামো নয়, বরং চিকিৎসা শিক্ষা পদ্ধতিরও আমূল সংস্কার প্রয়োজন। সর্বোপরি, বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত ‘পলিটিক্যাল ডিটারমিনেন্ট’ বা রাজনৈতিক সদিচ্ছাকে কাজে লাগিয়েই এই ভঙ্গুর ব্যবস্থাকে একটি টেকসই ও কার্যকর স্বাস্থ্যখাতে রূপান্তর করতে হবে।

এই চিকিৎসক মনে করেন, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কোনো ব্যবস্থা নয়। মেডিকেল কলেজ যদি স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নের চাবিকাঠি হয়, তাহলে স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এক নম্বর হতো বাংলাদেশ। স্বাস্থ্যখাত চালাতে প্রয়োজন দক্ষ মানবসম্পদ এবং তাদেরকে পরিচালনা করার যোগ্যতা।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, দেশে স্বাস্থ্য অবকাঠামো যথেষ্ট বিস্তৃত হলেও এর কার্যকারিতা বা ‘ফাংশনালিটি’ নিয়ে বড় সংকট রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ৫০০ বেডের হাসপাতালের ভবন থাকলেও সেবা মিলছে মাত্র ৫০ বেডের। তিনি বড় বড় নির্মাণ প্রকল্পের চেয়ে বিদ্যমান সুবিধাগুলোতে দক্ষ জনবল ও নেতৃত্ব নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।
 
হোসেন জিল্লুর রহমান সতর্ক করে বলেন, স্বাস্থ্যসেবাকে উপেক্ষা করলে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি টেকসই হবে না। গবেষণার বরাত দিয়ে তিনি জানান, প্রতি বছর চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে দেশের একটি বড় অংশ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের শিকার হচ্ছে। ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রেক্ষাপট টেনে তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে সামগ্রিক বৈষম্যের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘স্বাস্থ্য বৈষম্য’।

দেশের স্বাস্থ্য খাতে অনৈতিক বাণিজ্যিকীকরণ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে হোসেন জিল্লুর রহমান জানান, বাংলাদেশে অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান অপারেশনের হার বর্তমানে ৭০ শতাংশে পৌঁছেছে। এই ধরনের অনৈতিক চর্চা বন্ধে সরকারকে কঠোর অবস্থানে যাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যখাত সংস্কার কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ডা. আকরাম হোসেন, বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সাবেক সভাপতি রাশেদ রাব্বি ও সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদ শুভ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

এসএইচ/ক.ম 

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর