জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজধানীর শাহবাগে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার আসামিকে বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ (বিএমসি) হাসপাতালে নিয়োগের প্রতিবাদ জানানোকে কেন্দ্র করে শাখা ছাত্রদল সভাপতি রিফাত রায়হানের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ডা. ফারহানুল ফারুক মৃন্ময় ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ।
বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) রাতে ঢাকা মেইলকে এসব তথ্য জানিয়েছেন ডা. রিফাত রায়হান।
বিজ্ঞাপন
সোমবার (১২ জানুয়ারি) প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকের কক্ষে এ ঘটনার সূত্রপাত। পরে মেডিকেলের সামনের সড়কেও উভয়পক্ষ মারামারিতে জড়িয়ে পড়েন।
জানা গেছে, তিন মাস আগে হাসপাতালটির সহকারী অধ্যাপক ও নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) ইনচার্জ হিসেবে নিয়োগ পান বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সাবেক সহকারী অধ্যাপক ডা. আশরাফুজ্জামান সজীব।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ৪ আগস্ট তৎকালীন বিএমইউয়ের সামনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় জড়িত ছিলেন তিনি। পরবর্তীতে তার নামে রাজধানীর শাহবাগ থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়।
একই সঙ্গে বিএমইউ থেকেও চাকরিচ্যুত হন ডা. সজীব। এদিকে বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়োগের অল্প সময়ের মধ্যেই সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয় তাকে। এই ঘটনায় তাকে ফোন দিয়ে ‘জেরা’ করেন ছাত্রদলের বেসরকারি মেডিকেল শাখা কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক ডা. মশিউর রহমান মুসা।
তিনি একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার ও শাখা ড্যাবের নেতা। এ অবস্থায় গত ১১ জানুয়ারি তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দিয়ে গত সোমবার সশরীরে উপস্থিত হয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয় আওয়ামীপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) শাখা সভাপতি ডা. দবির হোসেনকে।
বিজ্ঞাপন
গত ১২ জানুয়ারি মশিউর রহমান মুসা ও রিফাত রায়হানসহ পরিচালকের কক্ষে বেসরকারি মেডিকেল ছাত্রদলের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। ছাত্রদলের দাবি, জুলাই গণহত্যার সমর্থনকারী ও আন্দোলনরত ছাত্রদের ওপর হামলা মামলার আসামিকে ফোন দিয়ে কথা বলার কারণে কোনো তদন্ত গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এছাড়া দবির হোসেনকে তদন্ত কমিটির প্রধান করারও প্রতিবাদ জানান তারা। পরে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন ডা. ফারহানুল ফারুক মৃন্ময় উপস্থিত হন।
ছাত্রদলের একাংশের অভিযোগ, শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হাসপাতাল পরিচালকের কক্ষ থেকে ‘বহিরাগত’ ছাত্রদল নেতাদের বের হয়ে যেতে চাপ প্রয়োগ করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে পড়ে। এ সময় এক ছাত্রদল নেতা মৃন্ময়ের উপর চড়াও হয়। তবে উপস্থিত নেতাকর্মী ও শিক্ষকদের হস্তক্ষেপে বিষয়টি সেখানে সমাধান হয়।

একই সঙ্গে গঠিত তদন্ত কমিটি বাতিল করে তদন্ত প্রক্রিয়া স্থগিত করা হয়। এদিকে পরিচালকের কক্ষ থেকে বেরিয়ে ডা. মশিউর রহমান মুসা ও শাখা ছাত্রদল সভাপতি রিফাত রায়হানসহ বেসরকারি মেডিকেল ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা হাসপাতালের বাইরে একটি চায়ের দোকানে অবস্থান করার সময় সেখানে উপস্থিত হন ইন্টার্ন চিকিৎসক ডা. দীপু।
তিনি ছাত্রদলের শাখা সাধারণ সম্পাদক মৃন্ময়ের ওপর হামলার বিষয়ে কথা বলতে গেলে কথা কাটাকাটি শুরু হয়।
মৃন্ময়ের অনুসারীদের অভিযোগ, এ সময় মশিউর রহমান মুসাসহ তার অনুসারীরা ডা. দীপুকে ব্যাপক মারধর করেন। ফলে উভয়পক্ষের মধ্যে মারামারি শুরু হয়। পরে শাখা মশিউর রহমান মুসা ও রিফাত রায়হানকে মারধর করেন মৃন্ময় ও শাখা ছাত্রদলের সহসভাপতি তাকি তাজওয়ার সাদের অনুসারীরা।
মারামারির বিষয়ে শাখা ছাত্রদলের সভাপতি রিফাত রায়হান বলেন, আওয়ামী লীগ পূনর্বাসন বিরোধী কর্মসূচিতে সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে আমাদের ওপর হামলা হয়েছে। আমি এবং মুসা ভাই আহত হয়ে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলে চিকিৎসা নিয়েছি। সাধারণ সম্পাদকের প্রত্যক্ষ নির্দেশে সহ-সভাপতি তাকি তাজওয়ার সাদ আমাকে লাথি-ঘুষি মারতে থাকে। আমাকে রাস্তায় ফেলেও পেটানো হয়েছে।
তিনি বলেন, মূলত জুলাই অভ্যুত্থানের আসামি ডা. সজিবের নিয়োগ ও পদোন্নতির প্রতিবাদ করায় ডা. মশিউর মুসাকে শোকজ করে এবং পরদিন তদন্ত কমিটির সঙ্গে দেখা করার জন্য আদেশ দেন। ওই দিন ডা. মুসার সঙ্গে বেসরকারি মেডিকেল ছাত্রদলের অপর দুই জয়েন্ট সেক্রেটারি মমি আনসারী এবং ওমর খৈয়াম উপস্থিত ছিলেন।
তিনি আরও বলেন, এক পর্যায়ে শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক জোরপূর্বক রুমে প্রবেশ করে তদন্ত কার্যক্রমকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। ফলে উপস্থিত কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার উত্তপ্ত বাক্য-বিনিময় হয় এবং অশোভন আচরণে রুমে উপস্থিত নেতাকর্মীদের বাধার সম্মুখীন হন। যা এক পর্যায়ে হাতাহাতিতে রূপ নেয়।
তখন সাধারণ সম্পাদক মৃন্ময়কে বাঁচানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করি আমি। তবুও পরবর্তী সে ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে প্রপাগাণ্ডা ছড়ায় যে আমার দ্বারা সে শারীরিক ভাবে লাঞ্চনার শিকার। যা সম্পূর্ণভাবে ভিত্তিহীন ও বানোয়াট।
জানতে চাইলে ডা. ফারহানুল ফারুক মৃন্ময় বলেন, ‘আমি মারধর করিনি। আর কে মারধর করেছে সেটা জানি না। আমাকে রিফাত রায়হান ও মশিউর রহমান মূসা মারধর করেছে, আমার কলার ধরেছে, এটার ভিডিও ফুটেজ আমার কাছে আছে।’
সার্বিক বিষয়ে বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ছাত্রদল কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. মশিউর রহমান মুসা বলেন, ‘ডা. আশরাফুজ্জামান সজীবের নিয়োগ ও পদোন্নতির বিষয়ে জানার পর আমি তাকে ফোন দিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলাম তার বিরুদ্ধে শোনা অভিযোগগুলো সত্য কিনা? কীভাবে পদোন্নতি পেলেন। তাকে কোনো ধরনের হুমকি-ধামকি দেইনি। তার সঙ্গে মাত্র ৩ মিনিট কথা বলেছি।’
তিনি বলেন, ‘এটি খুবই দুঃখজনক। জুলাইয়ে আমরা অনেক রক্ত দেখেছি। অনেক বুলেট আমরা ছাত্র-ছাত্রীদের শরীর থেকে বের করেছি। এসব ঘটনায় যারা জড়িত ছিল, তারা নিয়োগ পাচ্ছে এবং অল্প সময়ের মধ্যে পদোন্নতিও পাচ্ছে। এ জায়গা থেকে আমি তার সঙ্গে কথা বলেছিলাম। কিন্তু এতে উল্টো আমাকে শোকজ করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় এবং এই কমিটির প্রধান করা হয় আবার আওয়ামীপন্থী চিকিৎসকদের একজনকে।
‘ফলে আমি সেখানে কোনো তদন্তের জবাব দিতে উপস্থিত হইনি। এই তদন্ত চলতে পারে না, সেটি বলতেই গিয়েছিলাম। স্বাভাবিকভাবেই আমার সঙ্গে বেসরকারি মেডিকেল ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির লোকজন ছিল। এ বিষয়টিকে ইস্যু করে শাখা ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক যে কিনা ওই চক্রের সঙ্গেই চলাফেরা করে, সে আমাদের ওপর চড়াও হয়। ফলে উভয়পক্ষের মধ্যে মারামারি শুরু হয়।’
ডা. মশিউর রহমান মুসা আরও বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে যেসব ছাত্রলীগ নেতা চলাফেরা করে, তারা জুলাইয়ের সম্মুখসারির লোক। ছাত্রলীগ থেকে ওই সময়ে পদত্যাগ করে তারা জুলাইয়ে ভূমিকা রেখেছে। আর মৃন্ময় ৫ আগস্টের পরও বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে নোংরামি করেছে।’
ডা. আশরাফুজ্জামান সজীবের নিয়োগ ও পদোন্নতির বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. মিজানুর রহমান ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমি হাসপাতালে কর্মরত আছি, নিয়োগ হয়েছে কলেজে। প্রিন্সিপাল বলতে পারবে। এই নিয়োগ আমার আওতাধীন নয় এবং তাকে কলেজ থেকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।’
এসএইচ/এএস

