তীব্র গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল রক্তক্ষরণ অনেক সময় নীরবে শরীরকে ভেঙে দেয়। কখনো কখনো বারবার পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরও এর প্রকৃত উৎস ধরা পড়ে না। অথচ রোগী ধীরে ধীরে পৌঁছে যায় জীবনসংকটের দ্বারপ্রান্তে। সম্প্রতি ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে এমনই এক জটিল রোগীকে অস্ত্রোপচার ছাড়াই সুস্থ করে তোলার ঘটনা চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
বিজ্ঞাপন
৬৭ বছর বয়সী এক পুরুষ রোগী দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপে ভুগছিলেন। কয়েক বছর আগে তার হৃদ্যন্ত্রে বাইপাস সার্জারি হয়। ২০২৩ সাল থেকে তাঁর মাঝে মাঝে কালচে রঙের মলত্যাগ হতে থাকে, যা অন্ত্রের অভ্যন্তরীণ রক্তপাতের ইঙ্গিত বহন করে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের পর থেকে এই রক্তপাত বেড়ে যায়। ফলে তাঁর শরীরে মারাত্মক রক্তস্বল্পতা দেখা দেয় এবং বারবার রক্ত নিতে হয়।
প্রথমে তিনি ধানমন্ডির একটি স্বনামধন্য হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। সেখানে একজন অভিজ্ঞ সিনিয়র লিভার বিশেষজ্ঞ আপার জিআই এন্ডোস্কপি, সাইড ভিউ ডুওডেনোস্কোপি ও কোলোনোস্কপি করেও রক্তপাতের সঠিক কারণ নির্ণয় করতে ব্যর্থ হন। ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা চললেও রক্তপাত বন্ধ হয়নি।
এরপর রোগী ঢাকায় এভারকেয়ার হাসপাতালে ডা. ইকবাল মূর্শেদ কবীর এর অধীনে ভর্তি হন। ভর্তি হওয়ার সময় তার হিমোগ্লোবিন আবারও বিপজ্জনকভাবে কমে যায় এবং জরুরি ভিত্তিতে রক্ত দিতে হয়। এরপর কনট্রাস্টসহ সিটি স্ক্যান করা হলে অন্ত্রের প্রাথমিক অংশ ডুওডেনামে একটি টিউমার থাকার সন্দেহ দেখা যায়।
বিজ্ঞাপন
এই তথ্যের ভিত্তিতে বিশেষ পদ্ধতিতে আবার এন্ডোস্কপি করা হয়। এ সময় সাধারণ এন্ডোস্কোপের বদলে একটি পেডিয়াট্রিক কোলোনোস্কোপ ব্যবহার করা হয়, যার মাধ্যমে অন্ত্রের আরও গভীরে দেখা সম্ভব হয়। এতে ডুওডেনামের দ্বিতীয় অংশে একটি বড় আকারের পলিপের মতো টিউমার ধরা পড়ে, যেখান থেকে সক্রিয়ভাবে রক্তক্ষরণ হচ্ছিল।
ডুওডেনাম খুব সংবেদনশীল একটি অঙ্গ, তাই এখানে অস্ত্রোপচার ঝুঁকিপূর্ণ। তবে ডাঃ ইকবাল মূর্শেদ কবীর ও তার এন্ডোস্কপি টিম আধুনিক এন্ডোস্কপিক প্রযুক্তির মাধ্যমে অস্ত্রোপচার ছাড়াই টিউমারটি অপসারণ করেন। প্রথমে টিউমারের গোড়ায় এড্রেনালিন ইনজেকশন দিয়ে দুটি বিশেষ মেটালিক ক্লিপ প্রয়োগ করে রক্তক্ষরণের সম্ভাবনা প্রতিরোধ করা হয়। এরপর সতর্কতার সঙ্গে তারের বড় সাইজের স্নেয়ার দিয়ে টিউমারটি গোড়া থেকে কেটে বের করে আনা হয়। টিউমারটি কাটার পর সেই কাটার স্থানে আরো ৬টি মেটালিক ক্লিপ প্রয়োগ করে রক্তক্ষরণ পুরোপুরি বন্ধ করা হয়।
অপসারিত টিউমারটির আকার ছিল প্রায় ৫.৫ সেন্টিমিটার। পরীক্ষায় জানা যায়, এটি ব্রুনার গ্ল্যান্ড অ্যাডেনোমা নামে পরিচিত একটি বিরল কিন্তু ক্যানসারবিহীন টিউমার। এই ধরনের টিউমার অনেক সময় মারাত্মক রক্তক্ষরণের কারণ হয়ে থাকে। চিকিৎসার পর রোগীর অবস্থা দ্রুত ভালো হতে থাকে। তাকে প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত ও আয়রন ইনজেকশন দেওয়া হয়। এক সপ্তাহের মধ্যেই তার হিমোগ্লোবিন প্রায় স্বাভাবিক মাত্রায় ফিরে আসে এবং আর কোনো রক্তপাত হয়নি।
এই ঘটনা প্রমাণ করে, আধুনিক এন্ডোস্কপিক চিকিৎসার মাধ্যমে জটিল জায়গায় থাকা বড় টিউমারও অস্ত্রোপচার ছাড়াই নিরাপদভাবে চিকিৎসা করা সম্ভব। এভারকেয়ার হাসপাতাল ঢাকায় ডাঃ ইকবাল মূর্শেদ কবীর এর তত্ত্ববধানে এ ধরনের উন্নত চিকিৎসাসেবা এখন পাওয়া যাচ্ছে, ফলে রোগীদের আর বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ছে না।
লেখক
ডা. ইকবাল মুর্শেদ কবির
সিনিয়র কনসালটেন্ট
গ্যাসট্রোইন্টেস্টাইনাল, লিভার ডিজিসেস অ্যান্ড মেডিসিন
এভারকেয়ার হসপিটাল ঢাকা

