রোববার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

বাবার শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই বাচ্চু ভাইকে হারাই: পান্থ কানাই

রাফিউজ্জামান রাফি
প্রকাশিত: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৫৫ পিএম

শেয়ার করুন:

বাবার শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই বাচ্চু ভাইকে হারাই: পান্থ কানাই
আজ ১৮ অক্টোবর। ২০১৮ সালের এই দিনে কিংবদন্তি ব্যান্ড তারকা আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুতে নড়ে ওঠে দেশ। শোকে স্তব্ধ হয় বাংলা ভাষাভাষীরা। আট বছর পরও শোকের দাগ শুকায়নি। দিনটিতে অন্যদের মতো শোকাতুর হন জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী পান্থ কানাই। গায়ককে হারানো দিনে ঢাকা মেইলের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। 

পান্থ কানাই মনে করেন আইয়ুব বাচ্চু বিশাল মহীরুহু। যাকে ছোট থেকে দেখে বেড়ে উঠেছেন তিনি। সম্পর্কও ছিল ছোট-বড় ভাইয়ের। গায়ক বলেন, ‘বাচ্চু ভাই এত বিশাল একজন মানুষ ছিলেন যে ওনাকে নিয়ে বলার ক্ষমতা আমার নেই। ছোটবেলা থেকে উনাকে দেখেছি। ওনাদের বাসা আমাদের বাসা থেকে বেশি দূরে না। উনার ছোট ভাই ছোট্টু আর আমি একই ক্লাসে পড়তাম। তাই মিউজিশিয়ানের বাইরেও ওনার সঙ্গে আলাদা সম্পর্ক ছিল। বড় ভাই-ছোট ভাইয়ের মতো।’ 

তার কথায়, ‘বাচ্চু ভাই যখন সোলসে বাজাতেন তখন আমরা স্কুলে পড়ি। ওনাকে দেখে ভয় লাগত। সামনে যেতেও সাহস পেতাম না। কারণ চেহারাটা রাগী রাগী ছিল। কোকড়া চুল ফুলে ফুলে থাকত। স্টাইল, ব্যক্তিত্বের মধ্যে রাশভারী বড় ভাইয়ের ছাপ ছিল। কিন্তু ভেতরে ভেতরে খুবই নরম স্বভাবের ছিলেন। এটা বড় হয়ে বুঝতে পেরেছি।’

25-1711273006_20260512_144954322

ড্রামার হিসেবে প্রথমবার আইয়ুব বাচ্চুর নজরে পড়ার ঘটনা আজও ভোলেননি। সেটি ছিল পান্থ কানাইয়ের এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা। বললেন, ‘মিউজিশিয়ান হিসেবে প্রথম বাচ্চু ভাইয়ের নজরে পড়ি ওনার বোনের বিয়েতে৷ তখন আমি নতুন। চট্টগ্রামে ব্যান্ড করছি। পার্থদার (পার্থ বড়ুয়া) কাছে শিখছি। বাচ্চু ভাই পর্যন্ত পৌঁছতে পারিনি। স্টেজে বাজানোর সুযোগের অপেক্ষায় থাকতাম। পেলেই বাজাতাম। যেটা বাজানোর সেটাও বাজাতাম। যেটা না বাজানোর সেটাও। উরাধুরা একটা ব্যাপার ছিল। ওখানেও বাজাচ্ছিলাম। বাচ্চু ভাই পেছন থেকে দেখছিলেন। আমাকে দেখিয়ে পার্থদাকে বলছিলেন, কিরে এইটা কেরে? এই জিনিস কোত্থেকে পেলি। আমার এখনও কানে বাজে কথাটা।’ 

আরও একটি ঘটনা বললেন পান্থ কানাই। এটিও বিচিত্র। গায়কের কথায়, ‘‘বাচ্চু ভাই তখন সোলস থেকে বের হবে হবে। সলো করছেন। ওনার ‘ময়না’ গানটা বের হয়েছে। লাইন আপ ঠিক করছেন। একটা শো ছিল। সেজন্য ড্রামার খুঁজছিলেন। বাচ্চু ভাইয়ের নাম শুনে সব ড্রামার লাইন দিল। আমিও দিলাম। ওনাকে পার্থদা আমার কথা বলেছিলেন, জুয়েল ভালো বাজায়। ওকে ট্রাই করতে পারেন। তখন আমাকে সবাই জুয়েল নামে ডাকত। বাচ্চু ভাই আমাকে বললেন, কীরে তুই ‘ময়না’ গানটা বাজাইতে পারবি? আমি বেশ ভাব নিয়ে বললাম, বাচ্চু ভাই পারব না কেন? অবশ্যই পারব। চাচ্ছিলাম আমার প্রতি ওনার আত্মবিশ্বাস বাড়াতে। কিন্তু হলো উল্টো। ওনার ইগোতে লাগল। গেলেন ক্ষেপে। বললেন, এত বড় সাহস তুই ‘ময়না’ গান বাজাতে পারবি! এত সোজা! আমাকে অডিশন থেকে বাদ দিয়ে দিলেন। বললেন, হবে না। ও বেশি আত্মবিশ্বাসী।’’ 

তবে শেষ পর্যন্ত সেই শোয়ে বাচ্চুর সঙ্গে বাজানোর সুযোগ মিলেছিল পান্থ কানাইয়ের। বললেন, ‘শোয়ের দিন মন খারাপ করে বসে আছি। উনি জয় ভাইকে নিয়ে বাজাচ্ছিলেন। হঠাৎ আমাকে ডাকলেন। বললেন, এই জুয়েল এদিকে আয়। এই দুই গান বাজা। আমার মন ভালো করার জন্য এটা করলেন। এরকম অনেক ঘটনা আছে। আমিও ওনাকে শ্রদ্ধা করতাম। যখনই দেখতাম পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতাম। উনিও আমাকে ছোট ভাইয়ের মতো, ঘরের মানুষের মতো দেখতেন। সুখে দুঃখে পাশে থেকেছেন। আমার এক বড় বিপদের সময় ওনাকে পাশে পেয়েছিলাম। মিউজিশিয়ান হিসেবে অতুলনীয় ছিলেন। মানুষ হিসেবেও এত বড় মনের ছিলেন যা কল্পনার বাইরে।’

AYUB-BACHHU-4_Hq9YXO6

একসময় নগরবাউল ব্যান্ডে বাজাতেন পান্থ কানাই। পরে ব্যান্ড ছেড়ে শুরু করেন গায়ক জীবন। জানালেন, তখনও উৎসাহ উদ্দীপনা পেয়েছেন আইয়ুব বাচ্চুর থেকে। বললেন, ‘বাচ্চু ভাই খুব উৎসাহ দিতেন আমাকে। যখন নগরবাউল থেকে বের হয়ে গান গাওয়া শুরু করলাম সবার আগে বাচ্চু ভাই সাহস দিলেন। বললেন, সাবাস ব্যাটা একদম মন খুলে গান গা, ফাটিয়ে গা। কীভাবে গাইতে হবে, কোন কোন গান গাইতে হবে, কোন গানকে না বলতে হবে— সব বোঝালেন। এভাবেই মেন্টর হিসেবে এবং ভাই হিসেবে সবসময় সৎ উপদেশ দিয়ে গেছেন।’ 
 
আইয়ুব বাচ্চুর সঙ্গে পান্থ কানাইয়ের শেষ দেখা হয় একটি বেসরকারি টেলিভিশনের অনুষ্ঠানের সেটে। বাচ্চুর শারীরিক ক্লান্তি ধরা পড়েছিল গায়কের চোখে। করেছিলেন সতর্কও। সেসব উল্লেখ করে বললেন, ‘‘বাচ্চু ভাইয়ের সঙ্গে আমার শেষ দেখা উইন্ড অব চেন্জে। আমার ‘নৌকা’ গানের রেকর্ডিংয়ের সময়। ওনাকে দেখে মনে হচ্ছিল উনি খুবই টায়ার্ড। চোখগুলা লাল। দেখেই বুঝতে পারছিলাম, অসুস্থ। কিন্তু উনি পাত্তা দিতেন না। প্রচুর পরিশ্রম করতেন। মনের জোরে চলতেন।’’ 

এরপর বলেন, ‘ভিড় থেকে ওনাকে আলাদা করে ডেকে বলেছিলাম, বাচ্চু ভাই আমার মনে হচ্ছে আপনি অসুস্থ। প্লিজ একটু রেস্ট নেন। আপনাকে দেখে কিন্তু খুব একটা ভালো মনে হচ্ছে না। ওটাই শেষ কথা। এর কিছুদিন পর সকালে ঘুম থেকে উঠে শুনলাম উনি আর নেই। তাড়াতাড়ি বাইক নিয়ে বেরিয়ে গেলাম হাসপাতালে। ততক্ষণে ওখান থেকে বের করে ফেলেছে। ওনার জানাজায় দেখলাম লক্ষ লক্ষ লোক। শহীদ মিনারেও ছিল জনসমুদ্র।’  

kanai

সবশেষে পান্থ কানাই বলেন, ‘২০১৮ থেকে অক্টোবর মাসটা আমার কাছে ভারি হয়ে গেছে। কারণ বাচ্চু ভাইকে হারাই ১৮ তারিখ। তার কদিন আগে ১৩ তারিখ আমার বাবা মারা যান। বাবার শোক সামলে ওঠার আগে বাচ্চু ভাইকে হারাতে হয়। এক মাসে দুটি শোক। মাসটি কঠিন ছিওল আমার জন্য।’ 

আরআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর