হাসিমুখের মায়ায় দর্শকদের বেঁধেছিলেন শার্লিন ফারজানা। বিভিন্ন চরিত্রে নিয়মিত মুগ্ধতা ছড়াতেন। মাতৃত্বজনিত কারণে ঘটে ছন্দপতন। এরপর নাটক-বিজ্ঞাপনে মাঝেসাঝে দেখা গেলেও নিয়মিত হননি। এবার আটঘাট বেঁধে প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় অভিনেত্রী। ইতোমধ্যে দুইটি সিনেমার কাজ শেষ হয়েছেন। সম্প্রতি শেষ করেছেন ‘নীলপরী’ নামের একটি নাটকে। তারই সূত্র ধরে আলাপ জমেছিল ঢাকা মেইলের সঙ্গে।
‘নীলপরী’ দিয়ে নাটকে ফিরলেন। সব কি আগের মতোই লাগছে নাকি পরিবর্তন পাচ্ছেন?
অবশ্যই পরিবর্তন হয়েছে। ‘নীলপরী’ নাটক ৬ দিন ধরে শুট করলাম। আগে হয়তো ১-২ দিনে কাজ শেষ করতে হতো। সময়, বাজেট কম থাকতো— এখন সেটা নেই। গল্পের স্ক্রিপ্টিংয়ের পেছনে সময় দেওয়া হচ্ছে। নতুন অনেক ভালো শিল্পী যুক্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে ভালো লাগছে। তবে একটাই আফসোস, আগে উত্তরার যে শুটিং হাউজগুলোতে নিয়মিত কাজ করতাম সেখানে আর কাজ হচ্ছে না। এখন সবাই পূর্বাচল বা অন্যান্য দিকে শুট করছে। আমার বাসা বসুন্ধরায় হওয়ায় পূর্বাচলে সুবিধা হচ্ছে। তবে উত্তরার হাউজগুলো অনেক বেশি হোমলি ছিল। সেখানে কাজ করে আরাম পেতাম।
‘নীলপরী’ নিয়ে যদি কিছু বলতেন...
‘নীলপরী’-এর স্ক্রিপ্ট খুব সুন্দর। গল্পটাও বেশ বড়। গল্পের মধ্যে অনেক এলিমেন্ট আছে। পরিবারিক গল্পের পাশাপাশি সুন্দর প্রেমের আমেজ আছে। ইদানিং কেন সম্পর্কগুলো ভেঙে যাচ্ছে এবং কীভাবে যত্ন নিতে হয়— সেগুলো তুলে ধরা হয়েছে। একটি চাকরিতে যেমন দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে হয়, তেমনই ভালোবাসা বা সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে হলেও দায়িত্ববোধ লাগে— এই বার্তাটি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

আপনি বলেছেন, মনে মনে চাইছিলাম আগে যাদের সঙ্গে কাজ করতাম তাদের সঙ্গেই ফিরি। কেন? এটা কি নতুনদের সঙ্গে কাজের অনীহা থেকে?
না। আরশ খানের সঙ্গে তো কাজ করলাম। ওঁর সঙ্গে কাজ করতে খুব ভালো লেগেছে। এরপর খায়রুল বাসারের সঙ্গেও একটি কাজ করেছি। বাসার আমার বন্ধু। ওঁর সঙ্গে তুই-তোকারি সম্পর্ক। ওঁর সঙ্গে কাজ করাটা আমার কাছে কাজই মনে হয় না। বাসারের সঙ্গে আগেও কাজের অভিজ্ঞতা ছিল। তৌসিফ মাহবুবের সঙ্গে কাজ করার ইচ্ছা আছে। যখন ক্যারিয়ার শুরু করেছিলাম তখন অভিনয়ের দক্ষতা ছিল না। কীভাবে অভিনয় করে কিছুই জানতাম না। অপূর্ব ভাই (জিয়াউল ফারুক অপূর্ব) ও নিশো ভাই (আফরান নিশো) অভিনয়ে নিজেদের এমনভাবে তৈরি করেছেন, তাঁদের সঙ্গে কাজ করা সত্যিই স্বাচ্ছন্দ্যের। প্রতিটি দৃশ্য ধরে ধরে করেন। তাঁদের সঙ্গে অন-স্ক্রিন কেমিস্ট্রি খুব মিস করি। তাই চমৎকার দুজন সহশিল্পীকে মিস করাটা স্বাভাবিক।
আফরান নিশো এখন সিনেমা আর ওটিটি নিয়ে ব্যস্ত
হ্যাঁ, ওনার সঙ্গে কাজ হলে সিনেমা বা ওটিটিতেই হবে। এখন একটি নির্দিষ্ট প্রযোজনা সংস্থার হয়ে কাজ করছেন। যদি ভিন্ন কোনো প্রোডাকশনে কাজ করেন এবং গল্পের প্রয়োজনে কখনও ব্যাটে-বলে মেলে তবে অবশ্যই কাজ হতে পারে। এছাড়া আমি যে নিয়মিত কাজ করব সেটা সবাইকে জানানো হচ্ছিল না। সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে সবাই জানতে পারছে। আমি নিশ্চিত অনেকেই নতুন পরিকল্পনা করবে।

অপূর্ব-শার্লিন জুটিকে পছন্দের কারণ কী?
আমার মনে হয়, ওনার (জিয়াউল ফারুক অপূর্ব) সঙ্গে কাজ করতে যে কেউ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে। সে খুব কেয়ারিং মানুষ। সেটে সবাই একসঙ্গে খেলো কি না খেয়াল রাখেন। শুটিং শেষে বাড়ি ফিরলে ফোন করে জিজ্ঞাসা করেন ঠিকভাবে পৌঁছেছি কি না। আমার মনে হয়, কাজের জায়গাতে উনি যেমন কো-অপারেটিভ তাতে যে কেউ ওনার সঙ্গে কাজ কারতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে। আর জুটি পছন্দ করার কারণ হলো, আমরা যেসব গল্পে কাজ করেছি মানুষ সেগুলো রিলেট করতে পারেন। এ কারণে স্ক্রিনে আমাদের দুইজনকে দেখতে দর্শক পছন্দ করেন।
এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, দীর্ঘদিন ঘরে থাকতে থাকতে হয়তো অভিনয়টা ভুলেই গেছেন। ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর পর কী মনে হলো? অস্ত্র জমা দিলেও ট্রেনিং জমা দেইনি এরকম?
প্রথম দিন একটু কষ্ট হচ্ছিল। কারণ ঘরে থাকলে অলসতা পেয়ে বসে। দ্বিতীয় দিন থেকে এনজয় করেছি। অভিনয়ের ব্যাপারে বলতে গেলে, ক্যামেরা আমার কাছে খুব আপন লাগে। মানুষ একবার সাইকেল চালানো শিখে গেলে আর ভোলে না, অভিনয়টাও তেমনই। অভিনয় পারি কি না জানি না। তবে আগে যেমন স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতাম, এবারও তেমনই লেগেছে। হয়তো পাশে অপূর্ব ভাই ছিলেন বলে এটা সম্ভব হয়েছে। কারণ উনি অনেক সাহায্য করেছেন।

চলচ্চিত্রে কম দেখা যাওয়ার কারণ কী?
ইতোমধ্যে দুইটি সিনেমার কাজ শেষ করেছি। একটি মাহমুদুল হকের উপন্যাস ‘জীবন আমার বোন’ অবলম্বনে নির্মিত। মুক্তিযুদ্ধের উপর নির্মিত সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন এনায়েত করিম বাবুল। দুই-তিনটি চলচ্চিত্র উৎসব জমা পড়েছে। পরবর্তীতে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাবে। এতে আমার সহশিল্পী খায়রুল বাশার, প্রান্তিক দস্তিদার ও আজাদ আবুল কালাম। আর দ্বিতীয়টি সৈকত রেজার ‘সন্দেশ’, যা একটি হিন্দু দম্পতির গল্প। এতে ইন্তেখাব দিনারের সঙ্গে কাজ করেছি।
সন্তানদের নিয়ে জানতে চাই
আমার বড় ছেলে স্কুলে যাচ্ছে। ছোট মেয়েকে এ বছর স্কুলে দিলাম। ওঁদের হাসি, কথা বলার ধরণ বদলে যাচ্ছে— এই মুহূর্তগুলো একদম মিস করতে চাই না। কয়েক বছর পর ওরা বড় হয়ে গেলে হয়তো আমাকে খুঁজবে না! আমার মনে হয়, সন্তানদের প্রথম হাঁটা শেখা, প্রথম ‘মা’ বলে ডাকা— এগুলো পরে কখনও ফেরত পাওয়া যাবে না। তাই এগুলোকে বাদ দিয়ে শুটিংয়ে যাওয়ার কথা ভাবতে পারিনি। এখন ওরা স্কুলে যাচ্ছে বলে কিছুটা সময় পাই। বেছে বেছে কাজ করার সময় হয়েছে। টানা কাজ করার মতো সময় হয়তো দিতে পারব না। কারণ ওঁদের বেড়ে ওঠাটা মিস করতে চাই না। তবে অবশ্যই কাজ করব।

একজন মেয়ের মা হিসেবে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
যুক্তরাজ্যে পড়াশোনা করতে গিয়ে এক মাসের মধ্যে দেশে ফেরত আসার জন্য কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছিলাম। দেশের ট্রাফিক, মাটির গন্ধ ছাড়া থাকতেই পারি না। আমার মনে হয়, দেশে অনেক আরাম। কিন্তু এখনকার পরিস্থিতি দেখে মনে হয়, বাইরে কোথাও একটা সেকেন্ড হোম তৈরি করি। দেশের পরিবেশ খুব অনিশ্চিত ও অস্থিতিশীল। চিন্তা করি, কবে যে স্থিতিশীলতা ফিরবে। আর নিরাপত্তার নিশ্চিত হবে! নিজেই তো এখন একা চলতে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগি।
মাতৃত্বের কারণে ক্যারিয়ারে বিরতি নেওয়া নিয়ে কোনো আফসোস কাজ করে?
না। ক্যারিয়ারে একটা বিরতি নেওয়া প্রয়োজন। ভারতের অভিনয়শিল্পীরা সবাই নেয়। ওঁরা হয়তো একটু কম সময়ের মধ্যেই কামব্যাক করতে পারে। আমরাও যদি চাই সেটা করতে পারি। বিরতির মধ্যে আল্লাহ আমাকে দুটি সন্তান দিয়েছেন। তাঁদের বেড়ে ওঠার মুহূর্তগুলো এক্সপেরিয়েন্স করতে পারছি।

ওটিটি প্ল্যাটফর্মে আপনাকে কম দেখা যায় কেন?
ওটিটিতে কাজের পরিমাণ খুব কম। ‘চরকি’তে যা-ও হয়, তা ঘুরেফিরে নির্দিষ্ট কিছু মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। যাদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত দেখা হয়, তাদের নিয়েই কাজ হয়। তবে আমি আশাবাদী তারা একই বৃত্ত থেকে বের হয়ে আসবে। বিভিন্ন ধরণের গল্প নিয়ে কাজ করা উচিত। তাদের পর্যাপ্ত বাজেট আছে। তবে এটা নিয়ে খুব একটা আফসোস নেই। আমার ধারণা, যখন নিয়মিত কাজ শুরু করব তারাও জানতে পারবে। তখন নিজেরাই যোগাযোগ করবে।
অনেকে বলছেন আপনি ৭ বছর পর নাটকে ফিরেছেন, কিন্তু গত বছরও তো আপনাকে দেখা গেছে
সবাইকে বলছি গত বছরই কাজে ফিরেছি। খায়রুল বাসারের সঙ্গে ভালোবাসা ভালো রাখার উপায়’ ছাড়াও একাধিক টিভিসি ও দুটো সিনেমার কাজ শেষ করেছি। অপূর্ব ভাইয়ের সাথে দীর্ঘ অনেক বছর পর কাজ করায় হয়তো সবার এমন মনে হয়েছে।
ইএইচ/




