রোববার, ৯ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

‘জুলাই পরবর্তী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন‍্য জুলাই ব‍্যর্থ হয় কেমনে’

বিনোদন ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৯ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৩৭ পিএম

শেয়ার করুন:

‘জুলাই পরবর্তী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন‍্য জুলাই ব‍্যর্থ হয় কেমনে’

বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে ছাত্র জনতার পক্ষে ছিলেন নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় পালন করেছেন সংস্কৃতি উপদেষ্টার দায়িত্ব। দায়িত্ব শেষেও সামাজিক মাধ্যমে ফারুকী সোচ্চার জুলাই নিয়ে। সম্প্রতি এক দীর্ঘ পোস্ট দিয়েছেন। কেন জুলাই ব্যর্থ না— দিয়েছেন সে ব্যাখ্যা।  

স্বভাব সুলভ ভঙ্গিতে দেওয়া সে পোস্টে ফারুকী লিখেছেন, জুলাই ব‍্যর্থ নাকি ব‍্যর্থ না? পড়ে দেখতে পারেন। কথা হচ্ছিল এক তরুণ শিল্পীর সাথে। সে বলল, ভাই, জুলাই নিয়া ছবি বানাইতে চাই। কিন্তু সেটা বানাইতে গেলে তো মাজার ভাঙার সিনসহ বানাইতে হবে। আমি তারে প্রশ্ন করলাম, মুক্তিযুদ্ধ নিয়া ছবি বানাইতে গেলে কি তুমি মুক্তিযুদ্ধের পর টানা তিন বছর নৈরাজ্যের কথা বলো? হাজার হাজার রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক হত‍্যা কিংবা বিহারী গণহত্যার উল্লেখ করো? ডজন ডজন ব‍্যাংক ডাকাতির কথা উল্লেখ করো? খাদ্যের অভাবে মানুষের আত্মহত্যার কথা উল্লেখ করো? লুটপাট জনিত দুর্ভিক্ষের কথা বলো? কিংবা সিলেটের ওই বীরাঙ্গনার কথাও বলো যে বীরাঙ্গনা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানের হাতে নির্যাতিত আর যুদ্ধের পরে বাংলাদেশী মাস্তানের হাতে নির্যাতিত? 

এরপর লেখেন, নাকি শুধু পাকিস্তানিদের অত্যাচার-নির্যাতনের কথা বলো? তো জুলাই নিয়া ছবি বানাইতে গেলে তোমার জুলাইয়ের গণহত্যা এবং ফ‍্যাসিবাদের ১৬ বছরের লক্ষ লক্ষ্য ঘটনার কথা মাথায় না আইসা প্রথমেই জুলাইয়ের পরের কথা আসে কেনো? আসে কারণ এই ন‍্যারেটিভ কেয়ারফুলি ফোকাস করা হইছে। আমি বলতেছি না একই ছবিতে দুইটা বিষয় থাকতে পারবে না। আমি শুধু দুইটা মাইন্ডসেটের পার্থক্যটা বোঝার চেষ্টা করতেছি। 
তার কথায়, জুলাইয়ের পর থেকে দেখবেন একটা কোঅরডিনেটেড ন‍্যারেটিভ পুশ করা হয়েছে। এটা কারা করেছে, তাদের উদ্দেশ্য কী-এটা আপনারাই বুঝে নেন। তো সেই কোঅরডিনেটেড এফোর্টটা ছিল জুলাইকে পোস্ট জুলাই সময়ের ভালো দিকগুলা বাদ দিয়া ক্রিটিক্যাল দিকগুলার সাথে এটাচ করার প্রাণপণ চেষ্টা করা নানান প্রোপাগান্ডা ন্যারেটিভের মাধ্যমে। 

এ নির্মাতা বলেন, জুলাইয়ের পরে যে মানুষ কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে নিজেরাই পুলিশিং করেছে, বাজার মনিটর করেছে, হিন্দু মন্দিরে আক্রমণের ষড়যন্ত্র হচ্ছে অনুমান করে দল বেঁধে মন্দির পাহারা দিয়েছে, ব‍্যাংকিং খাত সংস্কার এবং অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সফলভাবে কাজ করেছে, লালনের মতো উদার দার্শনিককে জাতীয় পর্যায়ে উদযাপন করা শুরু হয়েছে, গুম বন্ধ হয়েছে, ক্রসফায়ার বন্ধ হয়েছে, বহু আইনি সংস্কার হয়েছে, স্বাধীন পররাষ্ট্র নীতির সূচনা হয়েছে, সবচেয়ে বড় কথা সবগুলো রাজনৈতিক দল মিলে এক হয়ে আন্তরিক আলোচনা করে সংস্কারের পথরেখা ঠিক করার মতো ঐতিহাসিক কাজ করলো, একটা অসাধারণ নির্বাচন হলো- এগুলো নিয়া কোনো আওয়াজ দেখবেন না। এগুলো সব হাওয়া করে দেয়ার প্রাণপণ চেষ্টা হচ্ছে। তাতে আসলে লাভ নাই। জাতির জীবনের বড় সত্য প্রোপাগান্ডায় হাওয়া হয় না। 

তিনি লেখেন, মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সরকারি দলের ভয়াবহ নৈরাজ্যের জন্য কি মুক্তিযুদ্ধ ব্যর্থ হয়ে যায়? বা মুক্তিযুদ্ধের নামে ফ‍্যাসিবাদি ষোলো বছরে হওয়া গুম, খুন, নৈরাজ্যের জন‍্য মুক্তিযুদ্ধ ব‍্যর্থ হয়? তাহলে জুলাই পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন‍্য জুলাই ব‍্যর্থ হয় কেমনে?

ফারুকীর ভাষ্য, এবার আসি জুলাই পরবর্তী ‘মব’ প্রসঙ্গে। প্রথমেই পরিষ্কার বলে নেওয়া সব রকমের মবই নিন্দনীয়। সেটা জুলাইয়ের পরে হোক, আগে হোক, বা ভবিষ্যতেই হোক। মব জিনিসটার আভিধানিক অর্থ যা সেটা বাংলাদেশে সবসময়ই ছিল, মাত্রার ভিন্নতায়। সবচেয়ে বড় মব হইছিল বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তর। কথায় কথায় খুন-লুট-ধর্ষণ! প্রকাশ‍্য স্টেডিয়ামে সারিবদ্ধ মানুষকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মারা হইছে। ওই সময়ের হাজার হাজার খুনের ইতিহাসের কিছুটা জানতে পারেন তখনকার পত্রিকার হেডলাইন থেকে। তবু সেটার নাম মব হয় নাই (ওয়েট করেন, এগুলোর নমুনা সামনে মিউজিয়ামে আসবে)। 

সাবেক সংস্কৃতি উপদেষ্টা লেখেন, হাসিনার আমলে হেলমেট বাহিনী, হাতুড়ি বাহিনী দিনে দুপুরে যখন যেখানে মানুষরে পিটাইছে, কোপাইছে। ওটার নাম মব হয় নাই। বহু বাউলের চুল কাটা হইছে, বাদ‍্য যন্ত্র ভাঙ্গছে। নামাজ শেষে এক মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষকে আগুনে পোড়াইয়া মারা হইছে। ওটার নাম মব হয় নাই। মাহবুব উল্লাহ ভাইকে প্রকাশ্যে হেনস্থাতেও মব হয় নাই, মাহমুদুর রহমানকে প্রকাশ্য কোর্টে মেরে রক্তাক্ত করলেও মব হয় নাই। 

তার কথায়, মব নামে একটা আলাদা শব্দ তাদের আমদানি করতে হইছে স্রেফ জুলাইকে অ‍্যাড্রেস করার জন্য। এই শব্দটা শুধু জুলাই পরবর্তী সময়ের জন‍্য বরাদ্দ করতে হইলো কেনো? যাতে জুলাইকে কলংক দেয়া যায়। অথচ বাস্তবতা হইলো ওই সময় দেশে পুলিশ নাই, প্রশাসন নাই, এমন কি জাতীয় মসজিদের খতিব গেছে পালাইয়া। এই অবস্থায় দেশ চালানো যে কি কঠিন জিনিস ছিল সেটা আমরা যারা ওইখানে ছিলাম আমরা টের পাইছি। এরকম ভঙ্গুর অবস্থায় বহু শক্তি সুযোগ নেয়। ওতে জুলাই ব‍্যর্থ হয় না, ছোট্ট সোনারা! 

সবশেষে তিনি লেখেন, আমরা বাংলাদেশিরা জানি আমাদেরকে একটা লম্বা রিবিল্ডিং প্রসেসের ভেতর দিয়া যাইতে হবে। আমরা উত্থান-পতনের ভিতর দিয়া যাবও। ফলে কারা কোন কারণে এটারে ব‍্যর্থ বলতে চায় এসব পাত্তা না দিয়া আমাদের নিজেদের কাজটা করি চলেন। 

আরআর 

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর