নিয়মিত দাঁড়াতেন ক্যামেরার সামনে। বিভিন্ন গল্পে মেলে ধরতেন নিজেকে। নিজের জীবনের গল্প যে এত করুণ হয়ে উঠবে বুঝতে পারেননি অভিনেতা আব্দুল হান্নান শেলী। প্রায় দুই বছর ধরে কিডনি ও হার্টের অসুখে বিপর্যস্ত অভিনেতা। নেই চিকিৎসাব্যয় মেটানোর অর্থ। কাঁদতে কাঁদতে জানালেন ঢাকা মেইলকে।
আব্দুল হান্নান শেলী বলেন, ‘আমি কিডনি ও হার্টের রোগে আক্রান্ত। কিডনির জটিলতা বেশি। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন কিডনিতে ক্যানসারের উপসর্গ পাওয়া গেছে।’
বিজ্ঞাপন
গেল এপ্রিলে উন্নত চিকিৎসা নিতে ভারতের চেন্নাইয়ে যান অভিনেতা। সেখানেই রোগ সনাক্ত হয় তার। তার কথায়, ‘এপ্রিলের ২৮ তারিখ চেন্নাই যাই। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চিকিৎসক জানান আমার কিডনিতে ক্যানসারের উপসর্গ রয়েছে৷ কেমোথেরাপি নিতে হবে। মুখে খাওয়ার ওষুধও দেয়।’

কিন্তু দেশে ফিরে অভিনেতা জানতে পারেন কেমো নেওয়ার উপযুক্ত না তার শরীর। তিনি বলেন, ‘দেশে ফেরার পর চিকিৎসকের কাছে গেলে জানান আমার শরীর কেমোর উপযুক্ত নয়৷ হিমোগ্লোবিন কম। এই মুহুর্তে নিলে উল্টো ক্ষতি হতে পারে৷’
বিজ্ঞাপন
শরীরে কবে অসুখ বাসা বেঁধেছে— জানতে চাইলে ফিরে যান পেছনে। বলেন, ‘অসুখটা কবে ভেতরে দানা বেঁধেছে বুঝতে পারিনি। ২০২৪ সালের ২০ অক্টোবর শুটিংয়ের সময় হঠাৎ শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। আস্তে আস্তে শরীর নিস্তেজ হতে থাকে। পরিচালকসহ সবাই গাড়ি করে নিয়ে আমাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করে। পরের দিন স্কয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। বেশকিছু টেস্ট করানো হয়। চিকিৎসক জানান লাঞ্চে পানি জমেছে। পানি বের করে রিলিজ দেওয়া হয়। তখন থেকে চিকিৎসা নিচ্ছি, ওষুধ খাচ্ছি।’
তবে প্রায় দুই বছর দেশে চিকিৎসা নিলেও সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় করা যায়নি বলে জানান অভিনেতা। বলেন, ‘আমার রোগটা ভালোভাবে সনাক্ত হয় চেন্নাইয়ে। এখানকার চিকিৎসকরা কিডনির জটিলতা সনাক্ত করেছিলেন। কিন্তু সেখানে যে ক্যানসারের উপসর্গ আছে বলেননি। হয়তো ধরতে পারেননি। কেননা আমি চিকিৎসা নিতাম ফোনের মাধ্যমে। অসুবিধাগুলো শুনে ওষুধ দিত চিকিৎসক। হয়তো সেকারণে সুক্ষভাবে রোগ নির্ণয় করতে পারেনি।’

বর্তমানে অবস্থা নাজুক শেলীর। বিছানা-ই সঙ্গী। উঠে দাঁড়ালে শরীর কাঁপে। তবে চেন্নাই গিয়ে উপকার পেয়েছেন জানিয়ে বললেন, ‘চেন্নাইয়ের চিকিৎসকের থেকে দেওয়া ওষুধ খাচ্ছি। এরপর থেকে শরীরে কিছুটা গতি এসেছে। তিন মাসের ওষুধ নিয়ে এসেছি। ছয় মাসের ভিসা করা আছে। শেষের দিকে যেতে বলেছে।’
সুস্থ থাকাকালীন ঢাকা-পাবনা ছোটাছুটি করে সময় কাটত অভিনেতার। শুটিং থাকলে ঢাকায় আসতেন। দুই একদিন ছুটি পেলে ফিরতেন পাবনায়। অসুস্থতার পর থেকে করছেন পাবনায় অবস্থান। কাজ বন্ধ। বন্ধ রোজগারও। কিন্তু সে অজুহাত শুনতে নারাজ সময়। অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকতে ব্যয় হচ্ছে প্রচুর অর্থ।
তিনি বলেন, ‘প্রচুর খরচ হচ্ছে। চেন্নাই গেলাম। চিকিৎসা নিয়ে এলাম। ৬-৭ লাখ খরচ হয়ে গেছে। তাছাড়া অনেক দিন ধরে অসুস্থ। দশ লাখের ওপর খরচ হয়ে গেছে।’
কীভাবে মিটছে চিকিৎসাব্যয়— জানতে চাইলে নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। অঝোরে কাঁদতে লাগলেন। ধরা গলায় বললেন, ‘আমার কোনো টাকা-পয়সা নেই। সবাই মিলে সাহায্য করছে। তাই দিয়ে চিকিৎসা চলছে। চেন্নাই যাওয়ার আগে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন এসেছিলেন। উনি সাহায্য করেছেন। মাছরাঙা টেলিভিশনের পরিচালক অঞ্জন চৌধুরী পিন্টু দিয়েছেন। পাবনার বনমালী শিল্পকলা কেন্দ্রের কার্যকরী পরিষদের সবাই দিয়েছেন। পাবনার বর্তমান জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জহুরুল ইসলাম বিশু ভাই সাহায্য করেছেন। এভাবে বিভিন্ন জায়গা থেকে অনুদান নিয়ে আমার চিকিৎসা চলছে।’

শেলীর পরিবারে এখন একমাত্র উপার্জনক্ষম তার স্ত্রী। সংসারের ঘানি টানতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে। অভিনেতার বলেন, ‘আমার তিন ছেলে মেয়ে। মেয়ে জামাই চিকিৎসক। এক ছেলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করেছে। এখনও চাকরি পায়নি। ছোট ছেলে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচ তো জানেন। আমার স্ত্রী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। সে-ই পরিবারের ব্যয় বহন করছেন। কিন্তু সব মিলিয়ে কুলিয়ে ওঠা কষ্ট। হিমশিম খেতে হচ্ছে।’
শেষে আক্ষেপ করলেন অভিনেতা বললেন, ‘থিয়েটার পাগল ছিলাম। সেখানে সময় দিতে গিয়ে সংসার-সন্তানদের দিকে সেভাবে নজর দিতে পারিনি। সারাটা জীবন নষ্ট করেছি। শেষ বয়সে বুঝতে পারছি অর্থ মানুষের বড় একটি শক্তি।’
নাটক-সিনেমায় সমান বিচরণ ছিল শেলীর। তার অভিনয় কুড়িয়েছে প্রশংসা। জনপ্রিয় ওয়েব কনটেন্ট ‘দুই দিনের দুনিয়া’য় ছিলেন তিনি। এ অভিনেত্রা চলচ্চিত্রের মধ্যে ‘কিত্তনখোলা’, ‘দ্য লাস্ট ঠাকুর’ উল্লেখযোগ্য।
আরআর




