রোববার, ৩১ মে, ২০২৬, ঢাকা

সাক্ষাৎকার

স্রষ্টা আমাকে মিউজিক করতে এই দেশে পাঠিয়েছেন: ইমন চৌধুরী

রাফিউজ্জামান রাফি
প্রকাশিত: ১৮ মে ২০২৬, ০৬:২৩ পিএম

শেয়ার করুন:

স্রষ্টা আমাকে মিউজিক করতে এই দেশে পাঠিয়েছেন: ইমন চৌধুরী
ইমন চৌধুরী
তার সুর প্রাণ ধরিয়া মারে টান। তার সংগীতে কালা পাখি, ট্যাকা পাখি ডানা মেলে। মনের মানুষ হারানোর হাহাকার আকড়ে আঁকড়ে ধরে। তার হাতে পড়ে বাদ্যযন্ত্র হয়ে ওঠে সুরের পুষ্পক রথ। বলছিলাম ইমন চৌধুরীর কথা। একাধারে এই গায়ক, সুরকার, সংগীত পরিচালক ও যন্ত্রশিল্পী ঝাঁপি খুলেছিলেন ঢাকা মেইলের কাছে। 

‘মন ছাড়া কি’ গানটির অভিজ্ঞতা জানতে চাই। কোন দিকগুলো মাথায় রেখে করেছেন?


বিজ্ঞাপন


‘মন ছাড়া কি’  গানটি করার অভিজ্ঞতা খুব ভালো। মেজবাউর রহমান সুমন ভাইয়ের সঙ্গে অনেকদিন পর কাজ করলাম। ‘হাওয়া’ সিনেমায় আমাদের দুটি গান ছিল। ‘আটটা বাজে দেরি করিস না’ এবং ‘সাদা সাদা কালা কালা’। সুমন ভাই খুব গোছালো মানুষ। ওনার সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা সবসময় দারুণ। ‘হাওয়া’ য় একরকম প্যাটার্নে কাজ করেছিলাম। এবার একটু আলাদাভাবে করেছি। সুমন ভাই বলেছিলেন, গানটা এমনভাবে করো যেন খুব মায়াময় হয়। ধ্যানের মতো আবেশ তৈরি করে। ওনাকে বলেছিলাম, গানটির আগের ভার্সনগুলো এত সুন্দর যে সেগুলো থেকে বের হওয়া কঠিন। এটা করতে গেলে আমাকে অনেকদিন ডুবে থাকতে হবে। সময় দেন। উনি বললেন সময় নাও সমস্যা নেই। এভাবেই গানটি করা। সবার চাওয়া ছিল গানটায় যেন খুব হাহাকার থাকে। মায়া থাকে। শুনে যেন মনে হয় ধ্যানে আছি। সেভাবেই করার চেষ্টা করেছি। দেড় বছর আগে রেকর্ডিং হয়। ওই সময় কানাই দাস বাউল শান্তিনিকেতনের আশেপাশে কোনো এলাকায় থাকতেন। আমাদের খুব ইচ্ছা ছিল ওনার সঙ্গে দেখা করার। ভিসা জটিলতার কারণে হয়নি। অনলাইনে ভয়েস রেকর্ড করি। সেখানেই কথা ও দেখা। দেড় বছর ধরে আস্তে আস্তে গানটি প্রাণ পায়।

325331296-910122703754341-6522461544368087569-n-20230622151419

কানাই দাস বাউলের সঙ্গে কী কথা হয়েছিল? গানটির ক্ষেত্রে কোনো পরামর্শ ছিল তার?

কানাই দাস বাউলের সঙ্গে রেকর্ডিংয়ের দিন কথা হয়। খুব অসুস্থ ছিলেন। ঠিক করে কথা বলতে পারছিলেন না। গাইতেও কষ্ট হচ্ছিল। উনি বলেছিলেন, তোমরা যেরকম আয়োজনের পরিকল্পনা করছো গানটি ভালো হবে মনে হচ্ছে। ওনাকে বলেছিলাম, আপনি যেভাবে গান সেভাবে গাইলেই চলবে। ভালো অংশটুকু আমরা কাজে লাগাব। পরে লাগলে মিউজিকের সময় আবার ভয়েজ নেব। উনি কয়েকবার গাইলেন। খুব কষ্ট হচ্ছিল। তাই দেখে সুমন ভাই বললেন, থাক আর কষ্ট দিও না। পরে নেওয়া যাবে। আরও কয়েকবার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু উনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। সুমন ভাইও না করছিলেন ওনার অবস্থা দেখে। ওই সময় আমি রিকোয়েস্ট করি— দাদা আর দুইবার গাইলেই হয়ে যাবে। আপনি আপনার মতো করে দুইটা পার্ট একটু গেয়ে দেন। ওনার কষ্ট হচ্ছিল। তবুও আমার কথা রেখেছিলেন। সব মিলিয়ে আটবার গানটা গেয়েছিলেন। আটটা ট্র্যাকই আমাদের কাছে আছে। সেখান থেকে ভালো অংশগুলো দিয়ে ‘মন ছাড়া কি’ তৈরি করি।


বিজ্ঞাপন


গানটি জনপ্রিয়তা পেল। গায়ক শুনে যেতে পারলেন না। আক্ষেপটি কীরকম?

গানটি অনেক মানুষ পছন্দ করছেন। আমাদেরও প্রিয়। কিন্তু ওনাকে ফাইনাল ট্র্যাক শোনাতে পারলাম না। রেকর্ডিংয়ের দিন বলেছিলেন, গানটা হলে শোনাইও। আমাদেরও পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু তার আগেই চলে গেলেন। সারাজীবন এই আফসোস থেকে যাবে। ওনাকে বলেছিলাম— অনেক হারমোনিয়াম বাজবে, ইন্স্ট্রুমেন্ট বাজবে। খুব উত্তেজিত ছিলেন। বলছিলেন, আমাকে শোনায়েন শোনায়েন। শোনাতে পারলাম না। তবে উনি যা দিয়ে গেছেন তা দুনিয়ার মানুষ শুনছে। ওনাকে প্রমোশনাল শোয়ে আমন্ত্রণ জানানোর পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য। তবে এটা পরম সৌভাগ্যের যে ওনার মতো অসাধারণ এক শিল্পীর সঙ্গে কাজ করতে পেরেছি। 

মাটির গান, মহাজনি গান যারা করেন তাদের গান করেন আপনি। গান নিয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গী কেমন মনে হয়েছে?

অনেক অসাধারণ মহাজনি গানের স্রষ্টার সঙ্গে কাজের সৌভাগ্য হয়েছে আমার। এরমধ্যে রয়েছেন হাশিম মাহমুদ ভাই এবং মনিরুদ্দিন দাদা। ওনারা শতবর্ষে হয়তো একবার আসেন। তাদের গান করার সৌভাগ্য সবার হয় না। এজন্য স্রষ্টাকে ধন্যবাদ। কাজ করে সময় কাটিয়ে বুঝতে পেরেছি ওনারা পবিত্র মনের মানুষ। গানকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসেন। বেশি চাওয়া নেই। গানগুলো যেন ছড়ায়, মানুষ গায়, শোনে এবং ওনাদের বানীগুলো যেন সবার কাছে পৌঁছায়— এতটুকুই চাওয়া। মনিরুদ্দিন সাহেবের সঙ্গে যখন কথা হয় ওনাকে বলছিলাম, আমরা আপনার সঙ্গে আগে যোগাযোগ করতে পারিনি। এখন পারলাম। শান্তি লাগছে। উনি বলেছিলেন, তোমরা যে আমার গান করেছ, এটা একটা সিনেমায় গেছে, মানুষ শুনেছে— এটাই আমার জীবনের বড় স্বার্থকতা। তখন ভাবলাম কী অদ্ভুত বিষয়! এরকম একটা গান করতে পেরে আমরা ধন্য। আর ওনারা চিন্তা করেন গানটি সবাই শুনছে! এছাড়া তাদের কোনো স্বার্থ নেই! শুধু মানুষ ভালোবাসছে, পছন্দ করছে— এতেই তারা খুশি! আর হাশিম মাহমুদ ভাই চান— তার গানে শত শত ইন্স্ট্রুমেন্ট বাজুক, লাখ লাখ মানুষ গাক, সবাই পছন্দ করুক। তারা সবাই মাটির মানুষ। গান গেয়ে যেতে চান, রেখে যেতে চান। দুজন মানুষও যদি পছন্দ করে তাতেই তারা আনন্দিত। ওনাদের বানী সবার কাছে পৌঁছে দেওয়াটাই তাদের মূল লক্ষ্য।

emon-20230622150554_(1)

মাটির গানের সঙ্গে প্রত্যন্ত অঞ্চলের যারা জড়িত তারা কেমন আছেন বলে মনে হয় আপনার?

মাটির গান নিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলে যারা কাজ করেন তারা কেমন আছেন— উত্তর হবে দুই ধরণের। অনেক বাউল সাধক নিজেদের মতো করে থাকতে চান। সমস্ত জাগতিক চাকচিক্য থেকে দূরে থাকতে পছন্দ করেন। আত্মতুষ্টি-ই বেশি প্রাধান্য পায় তাদের কাছে। আবার অনেক সাধকদের দেখেছি খুব কষ্টে জীবনযাপন করতে। দেখে খারাপ লাগে। নিজের জায়গা থেকে চেষ্টা করি তাদের যতটা সম্ভব ভালোভাবে কাজে লাগানোর। তবে আমার মনে হয় ওনারা আরও বেটার কিছু ডিজার্ভ করেন। কারণ মৈমনসিংহ গীতিকার মতো অসাধারণ ভাণ্ডার এই মাটির মানুষদের তৈরি। এরকম অসংখ্য বাউল, সাধক চারপাশে ছড়িয়ে আছেন। তাদের যত্ন নেওয়া উচিত। সামাজিকভাবে সুনজর দেওয়া দরকার। তারা ভালো থাকলে আমরা আরও অসাধারণ সব সৃষ্টি পাব। 

মাটির গান নিয়ে কাজ করে ভেতরে কী কোনো পরিবর্তন অনুভব করেন?

মাটির গান নিয়ে কাজ করতে করতে নিজের ভেতর পরিবর্তন আসে। ব্যক্তিগতভাবে বোধ করি, দিনশেষে কিছুই আমার না। পৃথিবী থেকে কোনোকিছুই নিয়ে যেতে পারব না। তাই যাই করি না কেন দেশের জন্য যেন কিছু রেখে যেতে পারি। আমি মনে করি আমাকে এই দেশে কোনো একটি কাজে পাঠানো হয়েছে। কাজটি হলো আমি যেন ভালো মিউজিক করতে পারি। আমার গান শুনে যেন মানুষ শান্তি পায়। আর মাটির মানুষদের সঙ্গে মিশে আমার মনে হয়েছে তারা মনের আনন্দে গান বানিয়ে গেছেন। আমিও আজকাল গান বানানোর ক্ষেত্রে প্রশান্তিকে প্রাধান্য দিচ্ছি। মনে হচ্ছে যেন ভালো কিছু গান রেখে যেতে পারি যেগুলো দিনের পর দিন মানুষকে প্রশান্তি দেবে। এজন্যই প্রতিজ্ঞা করেছি, চেষ্টা করব আমার গানের নূন্যতম মান ও অর্থ যেন থাকে। শুনে যেন সবাই নতুনত্ব খুঁজে পায়। আমি যেন ভালো মিউজিক করতে পারি— এটাই লক্ষ্য। 

বেঙ্গল সিম্ফনির কার্যক্রম কেমন চলছে?

বেঙ্গল সিম্ফনি নিয়ে সবসময় অদ্ভুত অনুভূতির ভেতর দিয়ে যাই। পরিবারটি বড়। ৩০-৩৫ জনের মতো সদস্য। আমরা অনেক সুন্দর সুন্দর গান করছি। অল্প অল্প করে অ্যালবামের কাজ আগাচ্ছি। যে রকম অ্যালবাম করতে চাচ্ছি সেটি একটু বড় পরিসরে হবে। মনে হচ্ছে বেঙ্গল সিম্ফনি খুব ভালো করছে। নিয়মিত অনুশীলন করি। নতুন গান করি। 

497518912_1259406302861440_5837912895734524858_n

বেঙ্গল সিম্ফনি নিয়ে দেশের বাইরেও শো করছেন। গানগুলো প্রবাসী ও ভিনদেশিরা কীভাবে নিচ্ছেন?

এরইমধ্যে আমরা দেশের বাইরে বেশ কিছু শো করেছি। ভারত, জাপান, চীনে ইন্টারন্যাশনাল কমিউনিটি শোয়ে অংশ নিয়েছি। বিশ্বের বড় মেলাগুলোর একটি জাপানের ওসাকা এক্সপো। সেখানে পারফর্ম করেছি। অধিকাংশই ছিল জাপানসহ বিভিন্ন দেশের শ্রোতা। আমাদের গানে তারা খুব আনন্দ করেছেন। হয়তো অর্থ বোঝেননি। তবে সুর ও পারফর্মেন্সে মুগ্ধ হয়েছেন। আমাদের কালচার, মিউজিকের ঘরানা তাদের অবাক করেছে। তারা বলেছেন, তোমাদের দেশের মিউজিক এত সমৃদ্ধ আগে জানতাম না। আমাদের হাতে বানানো বাদ্যযন্ত্র, পোশাকাদি দেখেও অবাক হয়েছেন। বলেছেন, বাহ তোমাদের তো আলাদা কালচার! আমাদের বাংলাদেশ দূতাবাস থেকেও বলেছে, ওই এক্সপোর অনেকে আমাদের গান, সংস্কৃতি নিয়ে খুব আগ্রহ দেখিয়েছেন। মেলা শেষে মজার ঘটনা ঘটেছে। যেটা আমাদের জন্য বিশাল প্রাপ্তির। জাপানী এক নারী আমাদের সামনে এসে কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, তোমরা এত ভালো, এত অদ্ভুত মিউজিক করেছ যে চোখে পানি ধরে রাখতে পারছিলাম না। এটাই সংগীতের শক্তি। আমি অনুভব করি দুনিয়ার সব ফোক মিউজিক একটি সুতায় গাঁথা। কখন কাকে কীভাবে ধরে ফেলে— স্রষ্টা ভালো জানেন। তা না হলে জাপানের একজন মানুষ আবেগে আপ্লুত হয়ে যান! চীনেও একই অবস্থা। আমরা ৫০টি দেশের রাষ্ট্রদূতদের সামনে পরিবেশন করেছি। একজনও শো শেষ হওয়ার আগে উঠে যাননি। সবাই অ্যাপ্রিশিয়েট করেছেন। আমি মনে করি বাইরে গেলে দেশের কালচার নিয়ে যাই। বহির্বিশ্বকে শোনাই। এটা অনেক বড় বিষয়। যখন সবাই মন ভরে গানগুলো নেয় তখন আমাদেরও ভালো লাগে। অনুভব করি— আমাদের সংস্কৃতি কত সমৃদ্ধ! আসছে ১ ও ৪ আগস্ট অস্ট্রেলিয়ার সিডনি ও মেলবোর্নে শো করতে যাচ্ছি। আশা করি এটাও অসাধারণ শো হবে। কেননা সিডনিতে নরওয়েস্ট কনভেনশন সেন্টারে শো করব। আমরাই প্রথম বাংলাদেশি আর্টিস্ট এই ভেন্যুতে শো করতে যাচ্ছি। এটা হচ্ছে বাংলাদেশ নাইট। মেলবোর্নে সম্ভবত রিসাইকেল সেন্টারে শো হবে। ওখানেও বাংলাদেশের কমিউনিটির কেউ এর আগে শো করেনি। ভেন্যু দুটি খুব মর্যাদাপূর্ণ। সিডনির শোয়ে ৩০০০ বাংলাদেশি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। মেলবোর্নেরটাতেও ২০০০-এর ওপর থাকবে মানুষ। অনেক বড় আয়োজন। পুরো দল যাচ্ছি। প্রস্তুতি শেষ। সবার কাছে দোয়া চাই।

আরআর 

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর