একটা সময় এপার বাংলায় ছিল ওপারের শিল্পীদের গানের প্রভাব। সুরের শক্তিতে সে প্রভাব কমিয়ে নিজেদের আধিপত্যের জানান দেন এ ভূখণ্ডের কয়েকজন মেধাবী শিল্পী। তাদের একজন সুবীর নন্দী। নাম শুনলেই কানে বাজতে থাকে ‘দিন যায় কথা থাকে ’, ‘বৃষ্টির কাছ থেকে কাঁদতে শিখেছি ’ র মতো অসংখ্য কালজয়ী গান।
বিজ্ঞাপন
সুবীর নন্দীর বাবা সুধাংশু নন্দী ছিলেন চা বাগানের মেডিকেল অফিসার। গায়কের বেড়ে ওঠাও চা বাগানের কোলে। ১৯৫৩ সালের ১৯ নভেম্বর হবিগঞ্জ তেলিয়াপাড়া চা বাগানে জন্মগ্রহণ করেন। তার মা পুতুল রানী ছিলেন একজন গৃহিণী।
চা বাগানের চঞ্চল সবুজের মাঝে ছোট্ট সুবীরের ছেলেবেলা কেটেছে দুরন্তপনায়। দুটি গল্পেই তা স্পষ্ট হবে। চা বাগান অঞ্চলের প্রতিটি বাড়িতেই একটি করে বাগান ছিল। শোভা পেত জবা গোলাপ গাদা বেলীসহ নানা জাতের ফুল। বাড়ির শোভাবর্ধনের পাশাপাশি পূজা অর্চনাসহ বিভিন্ন উৎসবে ব্যবহৃত হতো সেসব ফুল। তবে এক বাড়ির কর্তা তার বাগানের ফুল ছুঁতে দিতেন না। এতে জেদ চেপেছিল বালক সুবীরের। সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ওই বাগানের ফুলেই দুর্গা দেবীর অঞ্জলী দেবেন। একদিন দলবল নিয়ে হানা দেন রাতের অন্ধকারে। কিন্তু গোলাপ পাড়তে গিয়ে ঘটে অঘটন। গাছের সাথে বাঁধা বাঁশের খুঁটি ছুটে এসে কেটে যায় সুবীরের নাক। আরেকটি ঘটনা কালী পূজার। অন্যদের মতো সুবীরও পটকা-বাজি ফুটিয়ে শুধু আনন্দে মেতেই উঠতেন। পকেটে নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন। একবার দৌড়ানোর সময় পড়ে গিয়ে পকেটে পটকা ফুটে আহত হন তিনি।

গান বাজনার মধ্য দিয়েই বেড়ে উঠেছেন সুবীর নন্দী। বাবা চিকিৎসক হলেও ছিলেন সংগীত অনুরাগী। শেলফে সাজানো থাকত হেমন্ত মুখোপধ্যায়ের, সন্ধ্যা মুখোপধ্যায়, লতা মুঙ্গেশকরদের গানের ক্যাসেট। সেখান থেকেই তাদের সঙ্গে পরিচয় সুবীরের। মামারাও গান করতেন। মায়ের কাছে নেন হাতেখড়ি। পরে ওস্তাদ বাবর আলী খায়ের কাছে শেখেন শাস্ত্রীয় সংগীতের বিভিন্ন পাঠ।
১৯৬৭ সালে প্রথমবার সিলেট বেতারে গান করার সুযোগ পান সুবীর। বেতার গেলেন, গান করলেন, সন্তুষ্টও হলেন সবাই। কিন্তু গোলটা বাঁধল অন্য জায়গায়। কণ্ঠ প্রাপ্তবয়স্কদের মতো হলেও তখন সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র সুবীর। শেষে এফিডেবিট করে প্রাপ্তবয়স্ক দেখিয়ে গাওয়ানো হয় তাকে। এরপর থেকে নিয়মিত গাইলেও সিলেটেই সীমাবদ্ধ ছিল তা। একদিন যিনি সংগীতাঙ্গন শাসন করবেন, স্বয়ং মান্না দে যার কন্ঠের প্রশংসা করবেন তার কি আর এক শহরে সীমাবদ্ধ থাকলে চলে?
সুবীর ঢাকা আসেন স্বাধীনতার পর। সুযোগটি এসেছিল তৎকালীন বাংলাদেশ বেতারের প্রোগ্রাম অর্গানাইজার মোহাম্মদ মোজাকখের আহমেদের হাত ধরে। ঢাকায় পোস্টিংয়ের আগে মোজাকখের সাহেব সিলেট বেতারে প্রোগ্রাম প্রডিউসার ছিলেন। অল্পস্বল্প গানও লিখতেন। সুবীরের সাথে সেখানেই জানাশোনা। পোস্টিংয়ের পর তিনিই সুবীরকে ঢাকায় এসে গান করতে খবর পাঠান। গান পাগল সুবীরও দেরি করেননি। কয়েকদিন হাতে নিয়ে ছুটে আসেন।

তবে আসামাত্রই সুযোগ মেলেনি। শুরুর দিকে ব্যস্ততার কারণে মোজাকখের আহমেদ সময় দিতে পারছিলেন না। ফলে রোজ বেতারে গেলেও ফিরতে হচ্ছিল খালি হাতে। হাতের সময় ফুরিয়ে এলে গান না গেয়েই বাড়ি ফিরবেন বলে মনঃস্থির করেন। শেষ দিনও মোজাকখের আহমেদের কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন সুযোগের আশায়। এমন সময় সেখানে আসেন বিখ্যাত সেতার বাদক ওস্তাদ মীর কাশেম খাঁ।
তিনি রোজই আসতেন বেতারে। সুবীরকে দেখে ভাবতেন হয়তো মোজাকখের সাহেবের কাছে চাকরির জন্য আসেন। পরে মোজাকখের তাকে খুলে বলেন। সেইসঙ্গে জানান ব্যস্ততার কারণে সময় দিতে পারছেন না। ঘটনা শুনে মীর কাশেম খাঁ সুবীর নন্দীর জন্য লিরিক চেয়ে বসেন মোজাকখেরের কাছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই গানটি তুলে ফেলেন সুবীর। এভাবেই ‘যদি কেউ ধূপ জ্বেলে দেয়’ গানটির মাধ্যমে বাংলাদেশ বেতারে অভিষেক ঘটে সুবীর নন্দীর।
এরপর থেকে বেতারে নিয়মিত গাইতেন সুবীর নন্দী। কর্মস্থল সিলেট হলেও ঢাকা এসে ভয়েস দিয়ে যেতেন। ছোট বড় অনুষ্ঠানেও গাইতেন। আস্তে আস্তে ব্যস্ততা বাড়তে থাকে। গায়ক হিসেবেও ছড়াতে থাকে নাম। ওই সময় তার দেখা লোক গানের দিকপাল বিদিত লাল দাসের সঙ্গে। তার সান্নিধ্য সুবীরকে সমৃদ্ধ করে তোলে। বিদিত লাল দাসকে নিজের লোকগানের গুরু মানতেন তিনি।

ঢাকা বেতারে সুবীর নন্দী তালিকাভূক্ত হয়েছিলেন নজরুল গীতির শিল্পী হিসেবে। তবে খুব যত্নসহকারে নজরুল পরিবেশন করেও বোদ্ধাগোষ্ঠীর মন পেতেন না। কেউ তালে ভুল ধরতেন কেউ কথা বিচ্যুতির অভিযোগ আনতেন। সে যন্ত্রণা থেকে রেহাই পেতে সিদ্ধান্ত নেন আধুনিক গান করার। মনের কথা খুলে বলেন মোজাকখের আহমেদকে। শুনে মোজাকখের জানান আধুনিক গানের পথ আরও কঠিন।নিজের রাস্তা নিজেকেই তৈরি করতে হবে। তবেই সফলতা সম্ভব। কিন্তু সুবির ছিলেন অটল। সেদিনের সেই সিদ্ধান্তেই নজরুল সংগীত শিল্পী থেকে আধুনিক গানের গায়ক হন সুবীর নন্দী।
দেশের আানাচে কানাচে সুবীরের নাম ছড়িয়ে পড়েছিল চলচ্চিত্রের গান দিয়ে। সে ১৯৭৬ সালের কথা। রাজা হোসেন পরিচালিত সূর্য গ্রহণ চলচ্চিত্রে সুজেয় শ্যামের সুরে ‘দোষী হইলাম রে দয়াল’ শিরোনামের একটি লোকগানে কণ্ঠ দেওয়ার মাধ্যমে অভিষেক ঘটে তার।
পরের বছর কণ্ঠ দেন অশিক্ষিত সিনেমায়। নায়করাজের ঠোঁটে তার ‘মাস্টার সাব আমি নাম দস্তখত শিখতে চাই’ শ্রোতারা লুফে নেয়। পরের বছর ১৯৭৭ সালে সুবীর নন্দীকে ডেকে পাঠান প্রখ্যাত গীতিকার ও নির্মাতা খান আতাউর রহমান। তার ‘দিন যায় কথা থাকে’ সিনেমার সবকটা গানই গাওয়ান। এরপর তো ইতিহাস। সুবীর নন্দী হয়ে ওঠেন সংগীতাঙ্গনের অপ্রতিদ্বন্দ্বী গায়ক। কাজ করতে থাকেন শেখ সাদী, সত্য সাহা, খান আতা, সুজেয় শ্যামের মতো বিখ্যাত সংগীতজ্ঞদের সঙ্গে। একের পর এক কণ্ঠ দিতে থাকেন সিনেমার গানে।

অডিও অ্যালবামেও সফল ছিলেন সুবীর নন্দী। ১৯৮১ সালে ডিসকো রেকর্ড থেকে বাজারে আসা তার প্রথম অ্যালবাম সুবীর নন্দীর গান। পরে দুঃখের পরে সুখ’, প্রেম বলে কিছু নেই’, ভালবাসা কখনো মরে না’, সুরের ভুবনে’, ‘গানের সুরে আমায় পাবে’ অ্যালবামগুলো মুক্তি পায়। ‘প্রণামঞ্জলী’ নামে তার ভক্তিমূলক গানেরও অ্যালবাম রয়েছে।
জীবদ্দশায় আড়াই হাজারের মতো গান গেয়েছেন সুবীর নন্দী। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য দিন যায় কথা থাকে, বন্ধু হতে চেয়ে তোমার, আমি সাত সাগর পাড়ি দিয়ে, ও আমার উড়াল পঙ্খী, কত যে তোমাকে বেসেছি ভালো, আমার এ দুটি চোখ, পাখি রে তুই দূরে থাকলে, প্রেমের নাম বেদনা, তোমারি পরশে জীবন, বন্ধু তোর বরাত নিয়া, হাবলঙ্গের বাজারে, আমি পথে পথে ঘুরি, নীড় ছোট ক্ষতি নেই, দিন যায় কথা থাকে, বৃষ্টির কাছ থেকে কাঁদতে, চাঁদে কলঙ্ক আছে, গানেরই খাতায়, একটা ছিল সোনার কন্যা প্রভৃতি।
কিংবদন্তি এ কণ্ঠশিল্পী চল্লিশ বছরের সংগীত জীবনে স্বীকৃতি স্বরুপ পেয়েছেন অসংখ্য সম্মাননা ও পুরস্কার। তিনবার বাচসাস, পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার জিতেছেন তিনি। ২০১৯ সালে শিল্পকলায় অবদানের জন্য পান সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা একুশে পদক।

ব্যক্তি জীবনে সুবীর নন্দী ছিলেন একজন ব্যাংক কর্মকর্তা। তার স্ত্রীর পূরবী নন্দী। ফাল্গুনী নন্দী নামে তাদের এক কন্যাসন্তান রয়েছে।
শেষের দিকে কিডনি ও হার্টের অসুখ পেয়ে বসেছিল গায়ককে। ২০১৯ সালের ১৪ এপ্রিল মৌলভীবাজার থেকে ঢাকার আসার পথে অসুস্থ হয়ে পড়লে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ৩০ এপ্রিল উন্নত চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয় সিংগাপুর৷ ৭ মে সেখানকার জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় চলে যান না ফেরার দেশে।
আরআর




