বছর খানেক আগে ধর্মের টানে শোবিজ ছাড়ার ঘোষণা দেন আলোচিত শিশুশিল্পী সিমরিন লুবাবা। সে সময় এ তারকা জানিয়েছিলেন, তাকে আর প্রকাশ্যে দেখা যাবে না এবং ধর্মীয় জীবনধারার দিকেই তিনি মনোনিবেশ করতে চান। তার মা-ও জানিয়েছিলেন, লুবাবা নিজের জীবনযাপনে পরিবর্তন আনতে চাইছেন এবং ইসলামের পথে চলতে আগ্রহী।
তবে শোবিজ ত্যাগ করলেও সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব লুবাবা। সেখানে পর্দা প্রথা মেনে সক্রিয়। গেল ২৮ মার্চ তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে জানা যায়, তিনি ওমরা করতে সৌদি আরবের মদিনা থেকে মক্কা নগরীতে যাচ্ছেন। যাত্রাপথের একটি ভিডিও প্রকাশ করে লেখেন, ‘ওমরা পালনের উদ্দেশ্যে মদিনা থেকে মক্কায় রওনা হইলাম। অনেক দিনের স্বপ্ন আমার পূরণ হতে যাচ্ছে ইনশাল্লাহ সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন।’
বিজ্ঞাপন
এরপরের একটি পোস্টে মসজিদ আল-কুবার ভিডিও শেয়ার করেন তিনি। তার পরের পোস্টটি রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতো। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলের সে ফেসবুক পোস্টে একটি ছবি প্রকাশ করেন লুবাবা। লেখেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ। দুইটি আত্মা, এক কিবলা। দুনিয়া এবং আখিরাতের জন্য। আল্লাহ আমাকে একজন দ্বীন শেখার সঙ্গী উপহার দিয়েছেন।’
লুবাবার ওই ইঙ্গিতপূর্ণ পোস্ট থেকে তার বিয়ের গুঞ্জন ছড়ায়। তবে এ ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু লেখেননি লুবাবা। তার মা জাহিদা ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে মুঠোফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত একাধিকবার কল করে, খুদে বার্তা পাঠিয়েও মেলেনি উত্তর। তাই লুবাবার বিয়ের তথ্য যাচাই করতে পারেনি ঢাকা মেইল।
তবে লুবাবা পোস্ট দেখে নেটিজেনদের দাবি তিনি বিয়ে করেছেন। এতে ঘি ঢেলেছে অনন্ত জলিলের স্ত্রী বর্ষার পোস্ট ও মন্তব্য। লুবাবার ওই ইঙ্গিতপূর্ণ পোস্টে বর্ষা লিখেছেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ।’ এরপর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে তিনি লুবাবার উদ্দেশে লেখেন, ‘তোমাদেরকে সুস্থতা দান করুন এবং বিবাহিত জীবন সুখের করুন আমিন। অভিনন্দন জানিয়ে আরও লেখেন, খুব ইচ্ছা ছিল যাবার কিন্তু সময় করতে পারিনি।’
বিজ্ঞাপন
এতে লুবাবার বিয়ের গুঞ্জন সত্য বলে ধরে নিচ্ছেন অনেকে। জানাচ্ছেন অভিনন্দন। তবে অনেকের অভিযোগ, বাল্যবিবাহ করেছেন লুবাবা। তাকে ১৫-১৬ বছরের কিশোরী দাবি করে এ অভিযোগ আনা হচ্ছে। কেননা বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী কন্যার বয়স ১৮ বছরের নিচে হলে বাল্যবিবাহ বলে গণ্য হয়। এ সব বিষয় নিয়েও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি লুবাবা কিংবা তার পরিবার।
এদিকে সংবাদপত্রের তথ্য অনুযায়ী ২০২১ সালে লুবাবা চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী ছিলেন। ২০২৩ সালেও স্কুলছাত্রী ছিলেন। এসব তথ্য ধরে গণনা করলে বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী বিয়ের বয়স হয়নি লুবাবার।
এক্ষেত্রে কোনো বিবাহ বাল্যবিবাহ বলে গণ্য হলে কী কী অপেক্ষা করে সংশ্লিষ্টদের জন্য— জানতে যোগাযোগ করা হয় সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আজমীর সুমীর সঙ্গে। ঢাকা মেইলকে তিনি বলেন, ‘বাল্যবিবাহর আইন অনুযায়ী কন্যার ১৮ এবং পাত্রের ছেলেদের ক্ষেত্রে ২১। যদি কোনো কারণে বয়স গোপন করা হয় সেক্ষেত্রে বাল্যবিবাহ আইন ও প্যানেল কোড অনুযায়ী তাদের শাস্তি হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কন্যার বয়স ১৮-এর নিচে থাকলে কাজী বিয়ের রেজিস্ট্রেশন করতে পারবেন না। আর কাজীর রেজিস্ট্রেশন ছাড়া কোনো বিবাহ আইনত বৈধ না। তবে যদি কাজী যদি ১৮ বছরের নিচের কোনো কন্যার বিয়ে নিবন্ধন করেন তবে তার লাইসেন্স বাতিল হবে। এ অপরাধে অনেক কাজীকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। কেননা ১৯৬১ সালের আইন অনুযায়ী কন্যার বয়স ১৮ হতেই হবে। আর কোর্ট স্ট্যাম্পে যে বিয়ে হয় সেটা কোনো ভ্যালিড বিয়ে না।’
এ আইনজীবীর কথায়, ‘আমাদের দেশে বাল্যবিবাহ হয় না যে তা না। দরিদ্র পরিবারে এটি দেখা যায়। তৎক্ষণাৎ সেক্ষেত্রে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এই বিবাহ বন্ধের ক্ষমতা রাখেন। বাল্যবিবাহ রোধে সচেতনতা তৈরিতে ইউএনডিপি অনেক অর্থ খরচ করছে। কিন্তু সচেতন নাগরিকদের ছেলে-মেয়েরা সেটি করলে বিষয়টি দুঃখজনক।’
তবে কেউ যদি দেশের বাইরে গিয়ে বিয়ে করে এবং সেটি যদি বাল্য বিবাহের আওতায় পড়ে সেক্ষেত্রে করণীয় কী? জবাবে অ্যাড. আজমীর সুমী বলেন, ‘কেউ যদি দেশের বাইরে গিয়ে বিয়ে করে; সে যদি বাংলাদেশের পাসপোর্টধারী হয় তাহলে বাংলাদেশে আইন মানতে বাধ্য। দেশের বাইরে কোনো স্ট্যাম্পে সাইন করে বিয়ে করলে বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী সেটি বৈধ বিয়ে না, লিভ টুগেদার বলে গণ্য হবে।’
বয়স লুকানো প্রসঙ্গে এ আইনজীবী বলেন, ‘বয়স লুকানোর বিষয়টি উঠলে অবশ্যই জন্ম সনদ, ভোটার আইডি কার্ড, পড়াশোনা থাকলে মাধ্যমিক উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশনের কাগজপত্র যুক্ত করতে হবে।’
বাল্য বিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ (সংশোধিত) এ উল্লেখ আছে—
“অপ্রাপ্ত বয়স্ক” অর্থ বিবাহের ক্ষেত্রে ২১ (একুশ) বৎসর পূর্ণ করেন নাই এমন কোনো পুরুষ এবং ১৮ (আঠারো) বৎসর পূর্ণ করেন নাই এমন কোনো নারী;
"অভিভাবক” অর্থ Guardians and Wards Act, 1890 (Act No. VIII of 1890) এর অধীন নিয়োগপ্রাপ্ত বা ঘোষিত অভিভাবক এবং অপ্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তির ভরণ-পোষণ বহনকারী ব্যক্তিও ইহার অন্তর্ভুক্ত হইবে;
(“প্রাপ্ত বয়স্ক” অর্থ বিবাহের ক্ষেত্রে ২১ (একুশ) বৎসর পূর্ণ করিয়াছেন এমন কোনো পুরুষ এবং ১৮ (আঠারো) বৎসর পূর্ণ করিয়াছেন এমন কোনো নারী;
"বাল্যবিবাহ” অর্থ এইরূপ বিবাহ যাহার কোন এক পক্ষ বা উভয় পক্ষ অপ্রাপ্ত বয়স্ক;
বাল্যবিবাহের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ ও নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গের শাস্তি সম্পর্কে আইনে বলা আছে—
(১) আদালত, স্ব-উদ্যোগে বা কোন ব্যক্তির অভিযোগের ভিত্তিতে বা অন্য কোন মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে, যদি এই মর্মে নিশ্চিত হন যে, কোন বাল্যবিবাহের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইয়াছে অথবা বাল্যবিবাহ অত্যাসন্ন তাহা হইলে আদালত উক্ত বিবাহের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করিতে পারিবে।
(২) আদালত স্বেচ্ছায় বা অভিযোগকারী ব্যক্তির আবেদনের ভিত্তিতে উপ-ধারা (১) এর অধীন প্রদত্ত আদেশ প্রত্যাহার করিতে পারিবে।
(১) এর অধীন আরোপিত নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করিলে তিনি অনধিক ৬ (ছয়) মাস কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ (দশ) হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং অর্থদণ্ড অনাদায়ে অনধিক ১ (এক) মাস কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন।
বাল্য বিবাহ নিয়ে মিথ্যা অভিযোগের শাস্তি নিয়ে বলা হয়েছে— কোন ব্যক্তি ধারা ৫ এর অধীন মিথ্যা অভিযোগ করিলে উহা হইবে একটি অপরাধ এবং তজ্জন্য তিনি অনধিক ৬ (ছয়) মাস কারাদণ্ড অথবা অনধিক ৩০ (ত্রিশ) হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং অর্থদণ্ড অনাদায়ে
অনধিক ১ (এক) মাস কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন।
বাল্যবিবাহের শাস্তি—
(প্রাপ্ত বয়স্ক কোন নারী বা পুরুষ বাল্যবিবাহ করিলে উহা হইবে একটি অপরাধ এবং তজ্জন্য তিনি অনধিক ২ (দুই) বৎসর কারাদণ্ড বা অনধিক ১ (এক) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং অর্থদণ্ড অনাদায়ে অনধিক ৩ (তিন) মাস কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন।
অপ্রাপ্ত বয়স্ক কোন নারী বা পুরুষ বাল্যবিবাহ করিলে তিনি অনধিক ১ (এক) মাসের আটকাদেশ বা অনধিক ৫০,০০০ (পঞ্চাশ) হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় ধরনের শাস্তিযোগ্য হইবেন:
তবে শর্ত থাকে যে, ধারা ৮ এর অধীন কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের বা দণ্ড প্রদান করা হইলে উক্তরূপ অপ্রাপ্ত বয়স্ক নারী বা পুরুষকে শাস্তি প্রদান করা যাইবে না।
আরআর

