রাজধানীতে উন্মুক্ত স্থানে দেশি-বিদেশি শিল্পীদের কনসার্টে অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। ঢাকার বাইরে অধকাংশ ক্ষেত্রেই বিভিন্ন কারণে কনসার্টের অনুমতি দিতে নারাজ প্রশাসন। অনুমতি মিললেও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিসহ নানাবিধ কারণে হচ্ছে বাতিল। লম্বা সময় ধরে এ পরিস্থিতি বিরাজমান। অপ্রত্যাশিতভাবে শো কমে যাওয়ায় ধুঁকে ধুঁকে চলছে দেশের সাউন্ড সিস্টেম, লাইট, মাইকসহ কনসার্টে প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, ভালো নেই মালিক থেকে কর্মচারী। কেউ জমানো টাকা খরচ করে জীবন কাটাচ্ছেন, কেউ টিকে থাকতে হচ্ছেন ঋণগ্রস্ত। জীবনযুদ্ধে বিপর্যস্ত কেউ পরিবার পাঠিয়ে দিয়েছেন গ্রামে। অনেকে হারিয়েছেন কাজ।

ভালো নেই মালিক থেকে কর্মচারী
এলআরবি ব্যান্ডের সাবেক শব্দ প্রকৌশলী ও সাউন্ড কোম্পানি ডিজে প্রোর কর্ণধার শামীম আহমেদ ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘গত এক বছর বা তার বেশি সময় ধরে কনসার্টসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান বন্ধ হওয়ায় আমরা ক্ষতিগ্রস্ত। পরিবার নিয়ে খুব একটা ভালো নেই। মাসে একটি বা ছোট দুই-একটি কাজ করে এত বড় সংসার চালানো কঠিন।’
বিজ্ঞাপন
সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘একেক সাউন্ড কোম্পানিতে ১৫-২০ জন কাজ করে। তাদের পরিবারের সদস্য মিলে প্রায় ১০০-১৫০ লোক। এরকম করে হিসাব করলে ভুক্তভোগীদের সংখ্যাটা বড়। কেননা বাংলাদেশে চার-পাঁচ হাজারের মতো কোম্পানি। আমাদের কোনো ধরনের সরকারি প্রণোদনা নাই। নিজেদের অর্থায়নে সব করতে হয়। সাউন্ডের বিভিন্ন জিনিসপত্র পড়ে থাকলে নষ্ট হয়ে যায়। সব মিলিয়ে আমরা চাপের মধ্যেই আছি। ধুঁকে ধুঁকে চলছি। যে কাজগুলো হচ্ছে সেগুলো করে দিন এনে দিন খাইয়ের মতো বাঁচতে হচ্ছে।’
কনসার্টে লাইট সিস্টেম সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এভি প্রোর কর্ণধার মোহাম্মদ সিকান্দারের কণ্ঠেও একই সুর। তিনি বলেন, ‘গত এক বছর যাবত আমাদের খারাপ অবস্থা যাচ্ছে। খরচ ওঠে না। স্টাফদের বেতন ঠিকমতো হয় না। কাজকর্ম এলেও পরে আবার স্থগিত হয়ে যায়। দিন দিন আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে।’
তার কথায়, ‘পাশাপাশি আমাদের জিনিসপত্র প্রচুর নষ্ট হয়। আমরা চীন থেকে যন্ত্রপাতি কিনি। যেগুলো এক-দুই সিজন পর নষ্ট হয়ে যায়। আবার কিনতে হয়। এভাবে কষ্ট করে চলি। এবার তো লোন করে চলছি। কিন্তু যন্ত্রপাতিও পড়ে আছে। কাজে লাগছে না। এরকম চললে বাধ্য হয়ে সব বন্ধ করে দিতে হবে।’
স্বনামধন্য কয়েকটি ব্যান্ড এবং কয়েকজন সলো আর্টিস্টের ব্যবস্থাপক হিসেবে আছেন মো. রাজু আহমেদ। তিনি বললেন, ‘আমাদের ব্যন্ডগুলোর রেভিনিউ জেনারেটের খুব বেশি সুযোগ নেই। সাধারণত কনসার্ট, কিছু ইভেন্ট-ই তাদের উপার্জনের মাধ্যম। যাদের ক্যাটালগ ভালো ডিজিটাল মাধ্যম থেকে তাদের আয় হয়। তবে অংকটা বড় না। দিন শেষে সব ব্যান্ড-ই কনসার্টে নির্ভরশীল। কিন্তু আগের মতো মেগা কনসার্ট, স্টেডিয়াম কনসার্ট বা জেলাভিত্তিক কনসার্টও হয় না। পারমিশনসহ বিভিন্ন জটিলতার কারণে। এমতবস্থায় যারা চাকরি বা ব্যবসার পাশাপাশি মিউজিক করেন তাদের জন্য টিকে থাকার সুযোগ আছে। কিন্তু যারা শুধু মিউজিকের ওপর নির্ভরশীল তারা চরম মাত্রায় ভুক্তভোগী।’
তার কথায়, ‘তবে এই ব্যান্ডগুলোর সঙ্গে যারা কাজ করেন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তারা। যেমন লাইট, স্টেজ, সাউন্ড কোম্পানিগুলো। একটা কোম্পানির ওপর অনেকগুলো মানুষের আয় নির্ভর করে। কনসার্ট বন্ধ থাকায় এই কাজগুলোর সঙ্গে জড়িত সবাই ভুগছে। এই অচল অবস্থার সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে অনেকে যন্ত্রপাতি বিক্রি করেছেন। কেউ তাদের কর্মী ছাটাই করেছেন।’
_20260103_140906856.jpg)
ছাটাইয়ের কবলে কর্মীরা
ঝুমুর সাউন্ড অ্যান্ড মাইক সার্ভিসের কর্ণধার সুমন সরকার বলেন, ‘আমাদের অবস্থা খুবই খারাপ। এখন সিজন। কিন্তু কাজ সেভাবে আসছে না। কর্মী ছাটাই করতে হচ্ছে। গোডাউন ভাড়া, বাসা ভাড়া, স্টাফ খরচ সব মিলিয়ে চাপের মধ্যে যাচ্ছে। আমার আটজন লোক ছিল। চারজনই ছাটাই হয়েছে। নিজের কাছে-ই খারাপ লাগে। কেননা ওরাও বেকার অবস্থায় আছে। চোখের সামনে দিয়ে ঘোরাফেরা করে। দেখে ভালো লাগে না। কিন্তু বাধ্য হয়ে করতে হয়েছে। জানি না সামনের পরিস্থিতি কী হবে।’
বাধ্য হয়ে সিকান্দারকেও করতে হয়েছে কর্মী ছাটাই। বললেন, ‘আমার অধীনে আছে প্রায় ৩০ জন কর্মচারী আছে। তাদের বেতনসহ বিভিন্ন খরচ এতদিন শোধ করেছি জমানো টাকা থেকে। এখন লোনে চলছি। এভাবে চললে বড়জোড় ছয় মাস টানতে পারব। তারপর বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। আশায় আছি সামনে পরিস্থিতি ভালো হোক। তাহলে ব্যবসাটা ধরে রাখতে পারব। তাছাড়া সম্ভব হবে না। অনেকের আরও খারাপ অবস্থা। চালতে পারছে না। বিক্রি করে দিচ্ছে। বন্ধ করে দিচ্ছে।’
ভরা মৌসুমে হতাশা
সিকান্দার বলেন, ‘এই সময়টা অর্থাৎ নভেম্বর-ডিসেম্বর-জানুয়ারি আমাদের সিজন। দুই-তিন মাস কাজ থাকে। বাকি সময়টা অল্প স্বল্প কাজ হয়। কিন্তু এবার যা হচ্ছে তাতে টিকে থাকা মুশকিল।’

টিকে থাকা কঠিন
সংগীতাঙ্গনে সুপরিচিত একটি সাউন্ড প্রতিষ্ঠানে শব্দ প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত আছেন কামরুল ইসলাম। একটা সময় আর্থিকভাবে স্বচ্ছল ছিলেন। পরিবার নিয়ে রাজধানীতে বাস করতেন। কিন্তু শো কমে যাওয়ায় হাতে কাজ কম তার। ফলে উপার্জনও তলানিতে প্রায়। প্রভাব পড়েছে দৈনন্দিন জীবনে। পরিবার পাঠিয়ে দিয়েছেন গ্রামে। নিজে উঠেছেন মেসে। তিনি বলেন, ‘যখন হরদম শো হতো তখন উপার্জন ভালো ছিল। পরিবার নিজের কাছে ছিল। কিন্তু এখন তো শো কমে গেছে। নিজের খরচ তোলাই কষ্ট। পরিবার বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি। এক সময় অনেকে বিদেশ যেতে বলত। কিন্তু এই পেশায় উপার্জন ভালো ছিল বলে পাত্তা দেইনি। এখন মনে হচ্ছে ভুল করেছি।’
ক্ষতির পরিমাণ
সিকান্দারের কথায়, ‘আমার এক বছরে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দুই কোটির ওপর। কারণ ৩০ জন লোক। তাদের বেতন। ওয়্যার হাউজ, অফিসসহ আনুষঙ্গিক খরচ। কিন্তু কোনো মাসেই খরচ ওঠে না। ১০ লাখ খরচ থাকলে দুই লাখ ওঠে। এই টাকাটা কোথা থেকে আসবে। প্রশ্ন রাখেন এ ব্যবসায়ী।’
সুমন সরকার বলেন, ‘মোটামুটি এক বছরে আমার আর্থিক ক্ষতি ১০ লাখের মতো হয়েছে। সামনে মনে হয় না আশার আলো দেখতে পাচ্ছি। কিছুদিন দেখব। তারপর সব গুটিয়ে ফেলব। কারণ পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। এভাবে কতদিন টিকে থাকব জানি না।’
আর্থিক ক্ষতির প্রসঙ্গে রাজু বলেন, ‘পরিমাণটা যদিও আমার চেয়ে ভালো বলতে পারবে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি কয়েক হাজার কোটি টাকা হবে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ। কেননা এই ইন্ডাস্টি কয়েক হাজার কোটির।’

প্রভাব পড়ছে অন্য ইন্ডাস্ট্রিগুলোতে
পাশাপাশি এর প্রভাব পড়ছে অন্য ইন্ডাস্ট্রিগুলোর ওপর পড়ছে বলে মনে করেন ব্যবস্থাপক রাজু। বললেন, ‘রেন্ট কারের ব্যবসার কথা বলতে পারেন। শো কমে যাওয়ায় রেন্ট কারের ব্যবসা যারা করেন তাদের অবস্থাও খারাপ। কারণ আর্টিস্টদের ওপর নির্ভর করে অনেকে লোন করে মাইক্রো কিনেছেন। এই ব্যবসায় এসেছেন। আর্টিস্টদের চাহিদা অনুযায়ী গাড়ির পেছনে কাঠের বাক্স যুক্ত করেছেন, ডিজাইন করেছেন। যেন শিল্পীরা স্বস্তিতে যেতে পারেন। আর্টিস্টদের শো না থাকায় তাদেরও ব্যবসা বন্ধ। ফলে ওই গাড়িগুলোর চালকরাও ভুক্তভোগী।’
শিল্পীদের ভাষ্য,
জনপ্রিয় ব্যান্ড শিরোনামহীনের প্রধান জিয়াউর রহমান জিয়া বলেন, ‘যে কোনো প্রাকৃতিক অস্থিরতা হোক আর যাই হোক না কেন সবার আগে প্রভাব পড়ে অডিও ইন্ডাস্ট্রির ওপর। অর্থাৎ আমাদের শিল্পীদের ওপর সরাসরি প্রভাব পড়ে। এতে আমাদের সঙ্গে আরও যারা আছেন যেমন সাউন্ড, লাইট, মাইক ইত্যাদি খাতগুলোর কর্মজীবী মানুষদের প্রত্যেকে ক্ষতিগ্রস্ত হন। এখানেও চিত্রটা একই রকম। এ নিয়ে আলাদা করে কিছু বলার নেই মনে হয়।’
উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘সরকারের তরফ থেকে শেষ যে ঘোষণাটা ছিল আতশবাজি নিয়ে। সঙ্গে তারা আরেকটা শব্দ যোগ করে দিয়েছিল। সেটা হচ্ছে— যে কোনো প্রকারের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও নিষেধ। আতশবাজি কিন্তু বন্ধ হয়নি। অনেকে ব্যাপকভাবে ফুটিয়েছে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিন্তু একটিও হয়নি। কেননা আমরা শিল্পীরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। যে কারণে কোনো প্রকারের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়নি। কিন্তু আতশবাজি ঠিকই ফুটেছে। মাঝখান থেকে অডিও ইন্ডাস্ট্রির যথেষ্ট ক্ষতি সাধন হলো।’
সংগীতশিল্পী পথিক নবী বলেন, ‘অন্যান্য বছরের তুলনায় সদ্যবিদায়ী বছরে আমার উপার্জন চার ভাগের এক ভাগও না। তারপরও একভাবে টিকে থাকতে হচ্ছে। কিন্তু যারা লাইট, সাউন্ডের সঙ্গে বা অন্যান্য সাপোর্টের সঙ্গে জড়িত তারা আরও খারাপ সময় কাটাচ্ছেন। কেননা তাদের বড় পুঁজি আটকে গেছে এখানে। যন্ত্রপাতিও অকেজো হয়ে আছে। ফলে তাদের আর্থিক ক্ষতির মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।’

লালন ব্যান্ডের ড্রামার ও সাউন্ড সিস্টেম সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার থেইন হান মং তিতি বলেন, ‘অনেকেই অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। মিউজিক ছেড়ে দিচ্ছেন। এখানে নতুন কোনো আশা দেখছে না। পরিস্থিতি শেষের দিকে ভেবে এক বছরের বেশি চলে গেল। বদল এলো না। এ অবস্থায় টিকে থাকা কষ্ট। অনেকে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিচ্ছেন। কেউ লোন করে চালাচ্ছেন। কিন্তু নাভিশ্বাস উঠে গেছে সবার। এতে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’
তার কথায়, ‘বেশি সমস্যায় মিউজিশিয়ান ও শিল্পীরা। কেননা অন্যরা পেশা বদলালেও তারা পারছেন না। ফলে ভুগতে হচ্ছে। এতে সংস্কৃতি চর্চা ব্যহত হচ্ছে। ধরুন কেউ চাকরি নিয়ে পেশা ছেড়ে দিচ্ছে। এতে দেশ একজন সংস্কৃতি কর্মী হারাচ্ছে। নতুন শিল্পী উঠে আসাও ব্যহত হচ্ছে। কোভিড, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং সবশেষে বর্তমান অস্থিরতার কারণে দেশের সংস্কৃতির বিকাশ ব্যহত হচ্ছে। ফলে নতুন ব্যান্ড, নতুন শিল্পী, নতুন মিউজিশায়ন যেভাবে অন্য সময়গুলোতে উঠে আসত সেভাবে আসছে না।’
জ্বলছে আশার সলতে
অচল অবস্থা কেটে যাবে বলে বিশ্বাসী অভিজ্ঞ এই শব্দ প্রকৌশলী শামীম আহমেদ। এজন্য নির্বাচিত সরকারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে তিনি বলেন, ‘কাউকে দোষ দিচ্ছি না। দেশের পরিস্থিতি বা সবকিছু মিলিয়ে হয়তো এরকম হচ্ছে। লম্বা সময় ধরে চলায় আমাদের জন্য বেশ চাপের হয়ে গেল। দেশের সার্বিক পরিস্থিতি ভালো হলে বা স্থিতিশীল হলে, নির্বাচিত সরকার এলে পরিস্থিতি বদলাতে পারে। এভাবে তো আর থাকবে না।’ অভিজ্ঞ এই শব্দ প্রকৌশলীর মতে সংশ্লিষ্টদের অনেকেই এ আশায় বুক বেঁধে আছেন।
আরআর

