শনিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

চাঁদা না পেয়ে ১৪ হাজার টাকার খাবার খেলেন ছাত্রলীগ কর্মীরা!

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯ মে ২০২৩, ০৭:৫০ পিএম

শেয়ার করুন:

চাঁদা না পেয়ে ১৪ হাজার টাকার খাবার খেলেন ছাত্রলীগ কর্মীরা!
বাঁ থেকে অভিযুক্ত আরিফুল ইসলাম, সিফাত আহমেদ ও সাকিবুল সুজন। ছবি: সংগৃহীত

হোটেল মালিকের কাছে দাবি করা চাঁদা না পেয়ে রেস্তোরাঁয় এসে হুমকি-ধামকি দিয়ে ১৪ হাজার টাকার খাবার খাওয়ার অভিযোগ উঠেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) শাখা ছাত্রলীগ কর্মীদের বিরুদ্ধে।

সম্প্রতি রাজধানীর শাহবাগে অবস্থিত ‘কবির হোটেলে’ এ ঘটনা ঘটে। ১০ হাজার টাকা চাঁদা দিতে অপারগতা প্রকাশ করায় কয়েক দফায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের বেশ কয়েকজন কর্মী এমন কাণ্ড ঘটিয়েছেন বলে অভিযোগ দোকান মালিক কবির হোসেনের। তবে চাঁদা দাবি ও খাবার খেয়ে বিল না দেওয়ার বিষয়টি মিথ্যা বলে দাবি করেছেন অভিযুক্তরা। 

ভুক্তভোগী এই হোটেল মালিক জানান, গত ৫ মে সন্ধ্যায় কয়েকজন যুবক হোটেলে আসে। পরে তারা ম্যানেজার ইলিয়াস হোসেনকে বলে, এখানে হোটেল ব্যবসা করতে হলে তাদের প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা করে দিতে হবে। ওই সময় ম্যানেজার টাকা দিতে অক্ষমতা প্রকাশ করলে তারা হুমকি-ধামকি দিয়ে চলে যায়। তবে যাওয়ার সময় টাকার ব্যবস্থা করে যোগাযোগের জন্য শাকিবুল সুজন নামে একজনের মুঠোফোন নম্বর দিয়ে যায়।

>> আরও পড়ুন: নিয়োগ পরীক্ষায় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হামলার শিকার জবি অধ্যাপক

ওই ঘটনার পরদিন ৬ মে বিকেলে আবারও অন্তত ১০ জন যুবক হোটেলে আসেন। ওই সময় তারা ১০ হাজার টাকার খাবার খান এবং নানা হুমকি-ধামকি দিয়ে চলে যান। এর পরদিন (৭ মে) দ্বিতীয় দফায় আবারও বেশ কয়েকজন যুবক এসে একইভাবে হোটেলে খাবার খেয়ে বিল না দিয়ে চলে যেতে থাকে। পরে টাকা চাওয়া হলে তারা হুমকি দিয়ে বলে- যতদিন সুজন ভাইকে মাসে ১০ হাজার টাকা করে না দেওয়া হবে, ততদিন এভাবেই খেয়ে যাব।

সবশেষ গতকাল সোমবার (৮ মে) বিকেল আনুমানিক ৫টার দিকে অন্তত ২৫ জন যুবক আবারও একযোগে হই-হুল্লোড় করে হোটেলে ঢুকে খাবার খেতে থাকে। ওই সময় তারা হুমকি দেয়- আজ ১০ হাজার টাকা না দিলে হোটেল পরিচালক কবিরকে তুলে নিয়ে যাব। একই সময় তাদের মধ্যে কেউ কেউ খাবার খাওয়ার সময় দোকানে ভাঙচুরও চালায়। এতে প্রতিবাদ করায় ওয়েটারদেরও মারধর করা হয়।

হোটেল পরিচালক কবির হোসেন ঢাকা মেইলকে বলেন, আমি পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ৯৯৯ এ ফোন করি। পরে দ্রুত সময়ে একজন এসআইয়ের নেতৃত্বে কয়েকজন পুলিশ সদস্য ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। ওই সময় ২৫ জনের ওই দলটি পুলিশের সামনেই গালাগালি ছাড়াও ভাঙচুর করতে থাকে। সেই সঙ্গে ওয়েটারকে চড়-থাপ্পড় মারে। একই সময় আল-আমিন নামে এক সাংবাদিক মারধর ও ভাঙচুরের ভিডিও ধারণ করলে তাকেও মারধর করা হয়। পরে তার মুঠোফোন কেড়ে নিয়ে ভিডিও ডিলিট করে দেওয়া হয়। পরবর্তীকালে তারা চলে যাওয়ার সময় আরিফুল ইসলাম নামে একজন হুমকি দেয়- মাসে ১০ হাজার টাকা না দিলে পরিস্থিতি মাঝেমধ্যেই এমন হবে। টাকা না দিলে তুলে নিয়ে জানে মেরে ফেলব।

>> আরও পড়ুন: ‘শিক্ষক ইমতিয়াজকে অব্যাহতি ঢাবির স্বায়ত্তশাসনকে ক্ষুণ্ন করেছে’

এদিকে, মারধরের শিকার সাংবাদিক আল-আমিন খাঁন ঢাকা মেইলকে জানান, সোমবার ওই ঘটনার সময় প্রথমেই ৪ থেকে ৫টা মোটরসাইকেল নিয়ে হোটেলের সামনে এসে তারা আতঙ্ক সৃষ্টি করে। পরে হোটেলে ঢুকে তারা মোবাইল করে হল থেকে বন্ধু ও ছোট ভাইদের ফোন করে ডেকে এনে খাওয়াত খাওয়াতে শুরু করে। এভাবে প্রায় ৫০ জনের মতো হয়। তখন আমি গোপনে তাদের কয়েকটা ছবি তুলতে গেলে ওই যুবকদের একজন সেটি দেখে ফেলে। পরে তাদের কয়েকজন আরও বেশি উত্তেজিত হয়ে আমার কানে থাপ্পড় মারে।

আল-আমিন বলেন, এখনও আমি কানে ঠিকমতো শুনতে পারছি না। হয়তো কানের পর্দা ফেটে গেছে। ভাবছি ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার জন্য যাব।

এদিকে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হোটেলের এক কর্মচারী ঢাকা মেইলকে বলেন, হোটেলে ঢুকেই তারা নানা হুমকি-ধামকি দিতে শুরু করে। এমনকি খাবার খাওয়ার সময়ও তারা এক বন্ধু আরেক বন্ধুর মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলতে থাকে- বাড়িতে কি ভালো-মন্দ খেয়েছিলি, আজকে ভালোমতো পেট পুরে খেয়ে নে। ভয়ে, আতঙ্কে আমাদের কিছু বলার সাহস ছিল না।

অন্যদিকে, চাঁদা না পেয়ে এমন ঘটনার পর ভুক্তভোগী দোকান মালিক ও ম্যানেজার ইলিয়াস হোসেন অভিযুক্তদের মধ্যে তিনজনকে শনাক্ত করতে পেরেছেন বলে দাবি করেছেন। তাদের ভাষ্য- এমন কাণ্ডের নেতৃত্বে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় একাত্তর হল শাখা ছাত্রলীগের গণযোগাযোগ ও উন্নয়ন বিষয়ক উপসম্পাদক সাকিবুল সুজন। এছাড়া চিহ্নিত বাকি দুইজন হলেন- ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের সহ-সম্পাদক আরিফুল ইসলাম এবং এ এফ রহমান হল শাখা ছাত্রলীগের গ্রন্থনা ও প্রকাশনা বিষয়ক উপসম্পাদক সিফাত আহমেদ।

এ ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ছাড়াও শাহবাগ থানা বরাবর লিখিত অভিযোগ দেবেন বলেও জানিয়েছে মালিক পক্ষ।

>> আরও পড়ুন: ঢাবিতে হামলার ঘটনায় ছাত্রদলের দুই নেতা গ্রেফতার

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চাঁদা না পেয়ে এমন কর্মকাণ্ডে অভিযুক্ত সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। এরমধ্যে অভিযুক্ত সাকিবুল সুজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের শিক্ষার্থী এবং সিফাত আহমেদ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী। তারা দুজনেই ঢাবি শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক তানভীর হাসান সৈকতের অনুসারী বলেও জানা গেছে। এছাড়া অভিযুক্ত আরিফুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী এবং ঢাবি শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মাজহারুল কবির শয়নের একান্ত ঘনিষ্ঠজন।

তবে চাঁদা না পেয়ে এমন কর্মকাণ্ড ঘটানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত সাকিবুল সুজন। ঢাকা মেইলকে তিনি বলেন, ‘আমার ওই হোটেলে যাওয়ার প্রশ্নই উঠে না। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা খাবার খাওয়ার জন্য ক্যাম্পাসের বাইরে শুধু পুরান ঢাকাতেই যাই। আর ঘটনার দিন রাতে আমরা বন্ধুরা মিলে পুরান ঢাকায় খেতে যাই।’

তবে অভিযুক্ত সিফাত আহমেদ বলেন, ‘আমি আর আমার বন্ধু সাকিবুল সুজন ওই দোকানে খাওয়াদাওয়া করি। তবে চাঁদা দাবি করা এবং বিল পরিশোধ না করার যে অভিযোগ তারা দিচ্ছে- তা পুরোপুরি মিথ্যা। এমনকি আমি খাওয়ার শেষে একটা শিঙ্গাড়াও খাই, যার বিলটাও আমি পরিশোধ করে আসি।’

এদিকে, অভিযুক্ত আরিফুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘ঘটনার দিন বিকেলে একটা নম্বর থেকে কল আসলে আমি ওখানে দৌড়ে যাই। ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত তারা সবাই আমার জুনিয়র। আমার পৌঁছাতে দেরি হওয়ায় তেমন কাউকে ঘটনাস্থলে পাইনি। পাশাপাশি আমি হোটেল মালিককে এই বলে আশ্বস্ত করি যে, আমি এই বিষয় বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগকে জানাব এবং তাঁরা এই বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে। তাছাড়া তারা যদি আইনানুগ কোনো ব্যবস্থা নিতে চায় তা করার পরামর্শও দেই।

>> আরও পড়ুন: জবি শিক্ষার্থীর মৃত্যু ঘিরে রহস্য

আরিফুল ইসলাম বলেন, ঘটনার সঙ্গে আমাকে জড়িয়ে চাঁদা দাবি করা বা বিল পরিশোধ না করে জোরপূর্বক খেয়ে চলে আসার যে অভিযোগ তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমি ক্যাম্পাসের বড় ভাই হিসেবেই ঘটনাস্থলে সমাধানের উদ্দেশে দৌড়ে যাই।

এ বিষয়ে কথা হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক তানভীর হাসান সৈকত ঢাকা মেইলকে বলেন, আমি বিষয়টি সম্পর্কে শুনেছি। তবে ভুক্তভোগী এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ করেনি। লিখিত অভিযোগ পেলেই সংগঠনের নিয়ম অনুসারে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সার্বিক বিষয়ে ঢাবির প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাকসুদুর রহমান বলেন, এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ পায়নি। তবে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে বিষয়টিতে ঢাবি প্রশাসন অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।

প্রতিনিধি/আইএইচ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর