জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) ইংরেজি বিভাগের ২০২১-২২ সেশনের শিক্ষার্থী রাজু আহমেদের মৃত্যু ঘিরে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। ঘুমের মধ্যে হঠাৎ খিঁচুনি ওঠার পর অজ্ঞান অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হলে গত ২৯ এপ্রিল চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তবে ঘটনার পাঁচ দিন পর তার পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে- রাজুকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।
রাজুর পরিবারের দাবি, তাদের বাসার টিউবওয়েলের মধ্যে পরিকল্পিতভাবে কেউ ঘুমের ওষুধ বা এমন জাতীয় কোনো রাসায়নিক মিশিয়ে দিয়েছিল। যার ফলে বিষক্রিয়ায় রাজুর মৃত্যু হয়েছে। কারণ, একই টিউবওয়েলের পানি পান করে পরিবারের অন্য সদস্যরাও বমি করা ছাড়াও দুই দিন অতিরিক্ত ঘুমে মগ্ন ছিলেন।
রাজুর বাবা আকতারুল ইসলাম জানান, ঘটনার আগের দিন শুক্রবার (২৮ এপ্রিল) সকাল ১০টার দিকে রাজু তার মা এবং বোনের সঙ্গে খাবার খায়। ওইদিন খাবার খাওয়ার পর রাজুর মা ও বোনের বমি হয়। আমিও সকালের নাস্তা ও টিউবওয়েলের পানি খেয়েই মাঠে বীজ বুনতে যাই। এরপর বাসায় ফিরে মসজিদে নামাজ পড়তে গেলে শারীরিকভাবে অসুস্থতা অনুভব করি। পরে বাসায় ফিরে দেখি রাজু, রাজুর মা ও আমার ছোট মেয়ে ঘুমাচ্ছে। তবে আমার শরীর খারাপ লাগলেও মাঠে কাজ থাকায় আমি কাজে চলে যাই। এরপর সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে এসেও দেখি- তারা সবাই তখনো গভীর ঘুমে।
>> আরও পড়ুন: ঘুমের মধ্যে জবি শিক্ষার্থীর আকস্মিক মৃত্যু
তিনি আরও জানান, একই দিন রাজুর ফুফু তার মা ও বোনকে ডাকাডাকি করলেও তারা কোনো সাড়া দেননি। একপর্যায়ে রাত সাড়ে ৯টার দিকে রাজুর ঢাকায় যাওয়ার ট্রেন থাকায় ৮টায় তাকে তার ফুফু ঘুম থেকে টেনে তোলেন। ততক্ষণে আমার শরীর খারাপ থাকায় আমিও ঘুমিয়ে যাই। পরে রাজুর ফুফু জামা-কাপড় গুছিয়ে দিয়ে ওইদিন সন্ধ্যায় রান্না করা খাবার টিফিনবক্সে দিয়ে প্রতিবেশীর ভ্যানগাড়িতে করে রাজুকে স্টেশনে পৌঁছে দেন। সেখানে রাজুর ক্লাসমেট সাদিয়ার সঙ্গে তাদের দেখা হয়।
রাজুর বাবার ভাষ্য- ভ্যানচালক ওইদিন সাদিয়াকে রাজুকে একটু দেখে রাখতে বলে। সেই সঙ্গে তাকে জানায়- রাজুর বাসার সবাইও অসুস্থ। পরে ট্রেনে ওঠার আগে রাজু তার সহপাঠীকে তাদের অসুস্থতার পেছনে নিজের সন্দেহের কথা জানায়। রাজুর ভাষ্য ছিল- তাদের টিউবওয়েলে হয়তো কেউ কিছু দিয়েছে এবং বাসার সবাই এই পানি খেয়ে ঘুমিয়েছে।
এদিকে, রাজুর রুমমেট শরীয়তুল্লাহ জানিয়েছেন, গত শনিবার (২৯ এপ্রিল) বিকেলে রাজু খাওয়া-দাওয়ার পর তিনি গায়ে হাত দিয়ে দেখেন তার শরীর অনেক গরম। তখন কারণ জানতে চাইলে রাজু তাকে বাসার সেই আশ্চর্যজনক ঘটনার কথা বলে এবং জানায় সবাই টানা ঘুমাচ্ছে।
শরীয়তুল্লাহর ভাষ্য- ওইদিন রাজু খেলা দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়েন। তারপর হঠাৎ খিঁচুনি ওঠার মতো হয় এবং তিনি গিয়ে রাজুকে নাড়াচাড়া করে কোনো সাড়া না পেয়ে অপর রুমমেট আরাফাতকে জানান। একপর্যায়ে তারা রাজুর অন্য বন্ধুদের জানিয়ে তাকে আজগর আলী হাসপাতালে নিয়ে যান।
অন্যদিকে, রাজুর সহপাঠী ও জবির ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী সিফাত বলেন, আজগর আলী হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখান থেকে রাজুকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যেতে বলা হয়। পরে আমরা দেরি না করে অ্যাম্বুলেন্সে রাজুকে ঢাকা মেডিকেলে নিলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এরপর মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়।
এ বিষয়ে ঢামেক পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ মো. বাচ্চু মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ওয়ারী থানায় যোগাযোগের পরামর্শ দেন।
পরে ওয়ারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তাজিরুর রহমান জানান, ময়নাতদন্ত হয়েছে তবে এখনো পুলিশ রিপোর্ট হাতে পায়নি। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে অস্বাভাবিক কিছু পাওয়া গেলে স্থানীয় থানার মাধ্যমে এ বিষয়ে পুলিশই মামলা করবে বলেও জানান তিনি।
এদিকে, রাজুর বাবা আকতারুল ইসলামও ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাননি বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, রিপোর্ট পেলে আমরা আইনের আশ্রয় নেব। আপাতত আর কিছুই করার নেই আমাদের।
প্রতিনিধি/আইএইচ




