শনিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

শিক্ষক-শিক্ষার্থীর ভরসা এআই, সুযোগের আড়ালে বাড়ছে কি ঝুঁকি?

মাহফুজ উল্লাহ হিমু
প্রকাশিত: ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১০:১৬ পিএম

শেয়ার করুন:

শিক্ষক-শিক্ষার্থীর ভরসা এআই, সুযোগের আড়ালে বাড়ছে কি ঝুঁকি?
ছবি- এআই

পরীক্ষা চলছে। প্রশ্নপত্র হাতে পেয়ে উত্তর লিখতে ব্যস্ত শিক্ষার্থীরা। এর মধ্যেই দুই পায়ের মাঝখানে মোবাইল ফোন রেখে গুগলের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) সেবা জেমিনিতে প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী। বিষয়টি নজরে আসে হলের দায়িত্বে থাকা শিক্ষকের। পরে মোবাইল ফোন পরীক্ষা করে দেখা যায়, পরীক্ষার প্রথম প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়েছে জেমিনিতে। শুধু তাই নয়, এআইয়ের দেওয়া উত্তরের সঙ্গে ওই শিক্ষার্থীর উত্তরপত্রে লেখা দুটি লাইনের হুবহু মিলও পাওয়া যায়।

একই বিভাগের আরেক শিক্ষার্থী বেছে নিয়েছিলেন ভিন্ন পথ। পরীক্ষার মাঝখানে শৌচাগারে যাওয়ার কথা বলে হল থেকে বের হন তিনি। এরপর বিভাগের করিডরে গিয়ে অন্য এক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে স্মার্টফোন নিয়ে চ্যাটজিপিটির মাধ্যমে প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেন। তবে তিনিও ধরা পড়েন দায়িত্বপ্রাপ্ত আরেক শিক্ষকদের হাতে। শেষ পর্যন্ত এআই ব্যবহার করে পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনের দায়ে দুজনকেই শাস্তি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

ঘটনা দুটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের। গত জুনে পরীক্ষার হলে এআই ব্যবহার করে নকলের ঘটনায় শাস্তি পাওয়া দুই শিক্ষার্থী হলেন ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের ফাতহুন কারিব চৌধুরী ও মো. ফেরদাউস। গত ৩১ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় তাদের শাস্তির সিদ্ধান্ত হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, উভয়ের সংশ্লিষ্ট পরীক্ষা বাতিলের পাশাপাশি পরবর্তী পরীক্ষায় অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।

পরীক্ষার হলে এআই দিয়ে নকলের এই ঘটনা সামনে আসার পর শিক্ষাঙ্গনে প্রযুক্তিটির ব্যবহার নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে এআইয়ের ব্যবহার এখন আর শুধু পরীক্ষায় নকলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। পড়াশোনার কোনো বিষয় বুঝতে সমস্যা হচ্ছে, অ্যাসাইনমেন্টের জন্য ধারণা দরকার কিংবা গবেষণার তথ্য খুঁজতে হবে, এসব কাজে এআইয়ের সহায়তা নিচ্ছেন। পিছিয়ে নেই শিক্ষকরাও। ক্লাসের প্রস্তুতি, পাঠ পরিকল্পনা, শিক্ষাসামগ্রী এমনকি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরিতেও এআইয়ের সহায়তা নেওয়ার আগ্রহ বাড়ছে তাদের মধ্যে।

এআইয়ের এই ব্যবহার একদিকে পড়াশোনা ও পাঠদানের কাজ সহজ করছে, অন্যদিকে তৈরি করছে নতুন কিছু প্রশ্নও। বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা নিজেরা কতটা শিখছেন, এআইয়ের দেওয়া উত্তর কতটা যাচাই করছেন কিংবা প্রযুক্তিটির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তাদের নিজস্ব চিন্তাশক্তিতে প্রভাব ফেলছে কি না; এসব বিষয় সামনে আসছে।

৯৩ শতাংশ শিক্ষার্থীর নিয়মিত এআই ব্যবহার করেন

শিক্ষার্থীদের মধ্যে এআইয়ের ব্যবহার কতটা বেড়েছে, তার একটি চিত্র পাওয়া যায় দেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায়। ২০২৫ সালে ইনস্টিটিউট অব ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ার্সের (আইইইই) একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে প্রকাশিত ‘দ্য ইমপ্যাক্ট অব এআই অ্যান্ড চ্যাটজিপিটি অন বাংলাদেশি ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টস: আ মেশিন লার্নিং অ্যাপ্রোচ’ শীর্ষক গবেষণায় দেশের ৩১টি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক হাজার ৩৭০ শিক্ষার্থীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়।

গবেষণায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের ৪৬ দশমিক ৩ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা প্রতিদিন এআই ব্যবহার করেন। আর ৪৭ দশমিক ১ শতাংশ সপ্তাহে অন্তত একবার ব্যবহার করেন। অর্থাৎ জরিপে অংশ নেওয়া ৯৩ দশমিক ৪ শতাংশ শিক্ষার্থী দৈনিক কিংবা সাপ্তাহিক ভিত্তিতে এআই ব্যবহার করেন। অন্যদিকে ৫ দশমিক ৭ শতাংশ মাসে অন্তত একবার এআই ব্যবহার করেন এবং মাত্র শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা কখনো ব্যবহার করেন না।

শুধু ব্যবহারই নয়, পড়াশোনায় এআইয়ের প্রভাবও উঠে এসেছে গবেষণায়। অংশ নেওয়া ৮৯ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, জটিল একাডেমিক সমস্যা কিংবা অ্যাসাইনমেন্ট সমাধানে তারা এআইয়ের সহায়তা নেন। ৭১ দশমিক ২ শতাংশ শিক্ষার্থী দলগত পড়াশোনা বা সহযোগিতামূলক শিক্ষায় চ্যাটজিপিটি ব্যবহারের কথা জানিয়েছেন। এ ছাড়া ৮৯ দশমিক ৪ শতাংশ মনে করেন, এআই তাদের নিজের গতিতে শেখার ক্ষেত্রে সহায়তা করে।

তবে যে প্রযুক্তি পড়াশোনার কাজ সহজ করছে, সেটির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা নিয়েও শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। একই গবেষণায় ৮০ দশমিক ১ শতাংশ শিক্ষার্থী মনে করেন, এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা সৃজনশীলতা ও সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তির ক্ষতি করতে পারে। ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছেন ৫৭ দশমিক ৯ শতাংশ শিক্ষার্থী। আরও ২৯ দশমিক ৮ শতাংশ এ বিষয়ে কিছুটা উদ্বিগ্ন বলে জানিয়েছেন। অর্থাৎ শিক্ষার্থীরা এআইয়ের সুবিধা নিচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু এর সম্ভাব্য ক্ষতিকর দিকগুলো নিয়েও তাদের মধ্যে ভাবনা রয়েছে।

অ্যাসাইনমেন্টে সহায়তা, নকলের নতুন আশঙ্কা

পড়াশোনার পাশাপাশি অ্যাসাইনমেন্ট ও গবেষণার কাজেও এআইয়ের ব্যবহার বাড়ছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী এফ১০০০রিসার্চে প্রকাশিত একটি গবেষণায়ও এমন চিত্র উঠে এসেছে।

‘টিচার্স অ্যান্ড স্টুডেন্টস ইউজ অব চ্যাটজিপিটি অ্যাট সোশ্যাল সায়েন্স ফ্যাকাল্টি ইন দ্য পাবলিক অ্যান্ড প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিজ অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণাটি করেছেন আরিফুর রহমান, মো. খায়রুল ইসলাম, আবদুল্লাহ আল-মামুন ও মো. শহিদুল ইসলাম। দেশের আটটি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ৪০২ শিক্ষক ও ৪৪০ শিক্ষার্থীর কাছ থেকে জরিপের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করেন তারা। পাশাপাশি ১৬ শিক্ষক ও ১৬ শিক্ষার্থীর বিস্তারিত সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। গবেষণাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২৫ সালের ৬ মার্চ। পরে সংশোধিত সংস্করণ প্রকাশিত হয় একই বছরের ৫ সেপ্টেম্বর।

গবেষণায় দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা জটিল বিষয় বোঝা, অ্যাসাইনমেন্ট তৈরি, গবেষণার ধারণা পাওয়া এবং প্রেজেন্টেশন প্রস্তুতের মতো বিভিন্ন কাজে চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করছেন। এতে তাদের সময় বাঁচছে, পড়াশোনার কাজও সহজ হচ্ছে।

তবে এখানেই একটি প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। শিক্ষার্থী যদি কোনো বিষয় নিজে না বুঝে এআইয়ের তৈরি উত্তর সরাসরি জমা দেন, তাহলে তার প্রকৃত শেখার সুযোগ কতটা থাকছে? আবার এআইয়ের দেওয়া তথ্য ভুল হলে সেটি যাচাই না করেই অ্যাসাইনমেন্ট বা গবেষণায় ব্যবহার করার ঝুঁকিও রয়েছে।

এমন কিছু উদ্বেগ উঠে এসেছে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর পরিচালিত আরেকটি গবেষণায়। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব আলাবামার মীর হাসিব এবং খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের মো. শরিফুল ইসলামের গবেষণাটি ২০২৫ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সাময়িকী প্লস ওয়ানে প্রকাশিত হয়।

‘হাউ ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টস ইন বাংলাদেশ এনগেজ উইথ চ্যাটজিপিটি: আ কোয়ালিটেটিভ স্টাডি’ শীর্ষক গবেষণায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০ শিক্ষার্থীর বিস্তারিত সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। এতে দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা অ্যাসাইনমেন্ট ও গবেষণার পাশাপাশি ব্যক্তিগত নানা কাজেও চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করেন। তবে এআইয়ের তৈরি ভুল তথ্যসূত্র এবং নকল শনাক্তের প্রচলিত ব্যবস্থা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টার মতো বিষয়ও উঠে এসেছে গবেষণায়।

‘এআই নয়, মূল বিষয় হচ্ছে নৈতিকতা’

শিক্ষার্থীদের এআই ব্যবহারের বিষয়টিকে নেতিবাচকভাবে দেখতে চান না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন অ্যান্ড টেকনোলজির অধ্যাপক ড. বি এম মাইনুল হোসেন। তার মতে, প্রযুক্তিটি ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘এআইয়ের ব্যবহারের ক্ষেত্রে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একটি হচ্ছে এথিক্যাল ইউজ বা নৈতিক ব্যবহার, অন্যটি রেসপন্সিবল ইউজ বা দায়িত্বশীল ব্যবহার।’

অধ্যাপক মাইনুল হোসেন বলেন, ‘শুধু এআই নয়, এর আগেও শিক্ষার্থী কিংবা শিক্ষকরা বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করেছেন। আপনি গুগল ব্যবহার করেও নকল করতে পারেন। একজন শিক্ষার্থীকে অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হলে সে গুগলে সার্চ করে অন্য কোথাও থেকে লেখা কপি করে জমা দিতে পারে। ইন্টারনেটের অন্য মাধ্যম ব্যবহার করেও সেটি সম্ভব।

আগে নকল করতে কিংবা অন্যের লেখা কপি করতে কিছুটা সময় ও চেষ্টা লাগত। কিন্তু এআই আসার পর সেই কাজ অনেক সহজ হয়ে গেছে। এখন কোনো প্রশ্ন লিখে দিলেই মুহূর্তের মধ্যে উত্তর পাওয়া যাচ্ছে। ফলে প্রযুক্তিটির অপব্যবহারের সুযোগও তৈরি হয়েছে।’

এই শিক্ষাবিদ বলেন, ‘এখানে মূল বিষয়টি এআই ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, সেটি নয়। মূল বিষয় হচ্ছে নৈতিকতা। একজন শিক্ষার্থীকে বুঝতে হবে, কোন কাজটি তার করা উচিত এবং কোনটি উচিত নয়।’

শিক্ষার্থীদের এআই ব্যবহার নিয়ে তিনি বলেন, ‘কোনো বিষয় শেখা, বোঝা কিংবা নতুন ধারণা পাওয়ার জন্য এআইয়ের সহায়তা নেওয়ায় সমস্যা নেই। কিন্তু নিজে কিছু না বুঝে এআইয়ের তৈরি উত্তর সরাসরি জমা দেওয়া নৈতিক কিংবা দায়িত্বশীল ব্যবহার হতে পারে না।’

প্রশ্নপত্র তৈরিতেও এআইয়ের সহায়তা চান শিক্ষকরা

শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার জন্য এআইয়ের সহায়তা নিচ্ছেন, আর শিক্ষকরা দেখছেন পাঠদানের কাজ সহজ করার সুযোগ। বিশেষ করে ক্লাসের প্রস্তুতি, পাঠ পরিকল্পনা, শিক্ষাসামগ্রী ও পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরিতে এআইয়ের ব্যবহার তাদের আগ্রহের জায়গা হয়ে উঠেছে।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) প্রকাশিত ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ফর এডুকেশন ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণায় বিষয়টি উঠে এসেছে।

এডিবির বিয়ংজো কং, ঝিগাং লি, সারা র‍্যাটনার, এরিক হেমবার্গ ও শামসুল হকের গবেষণাটি ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ওপর পরিচালিত জরিপ ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়। এতে এক হাজার ২৫৩ শিক্ষকের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

গবেষণায় অংশ নেওয়া শিক্ষকদের ৭৭ দশমিক ৫৫ শতাংশ পরীক্ষার প্রশ্ন তৈরিতে এআইয়ের সহায়তা নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এ ছাড়া ৭৬ দশমিক ৯৭ শতাংশ পাঠ পরিকল্পনা এবং ৭৬ দশমিক ৮৯ শতাংশ শিক্ষাসামগ্রী প্রস্তুতে এআইয়ের সহায়তা নিতে আগ্রহী।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যেও এআই ব্যবহারের বিষয়টি উঠে এসেছে এফ১০০০রিসার্চে প্রকাশিত গবেষণায়। সেখানে দেখা যায়, শিক্ষকরা ক্লাসের প্রস্তুতি, শিক্ষাসামগ্রী তৈরি ও গবেষণার কাজে চ্যাটজিপিটির সহায়তা নিচ্ছেন। তবে প্রযুক্তিটির ব্যবহার নিয়ে নৈতিকতা, তথ্যের নির্ভুলতা ও অতিরিক্ত নির্ভরতার উদ্বেগও রয়েছে।

এআই দিয়ে প্রশ্ন তৈরি করলেও যাচাই জরুরি

শিক্ষকদের এআই ব্যবহার নিয়ে অধ্যাপক ড. বি এম মাইনুল হোসেন ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। আগে একজন শিক্ষককে প্রশ্নপত্র তৈরি করতে অনেক খোঁজাখুঁজি ও পরিশ্রম করতে হতো। এখন এআইকে বললে সেটি প্রশ্নের ধারণা দিতে পারে, এমনকি প্রশ্ন তৈরি করেও দিতে পারে।’

তবে এআইয়ের তৈরি প্রশ্ন সরাসরি ব্যবহার করার বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। অধ্যাপক মাইনুল হোসেন বলেন, ‘একজন শিক্ষক এআইয়ের সহায়তায় প্রশ্ন তৈরি করলে তাকে অবশ্যই সেটি যাচাই-বাছাই করতে হবে। দেখতে হবে, প্রশ্নটি তিনি যা পড়িয়েছেন কিংবা শিক্ষার্থীদের যে বিষয়টি মূল্যায়ন করতে চান, তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না। এআই নিজের মতো করে প্রাসঙ্গিকতার বাইরে কোনো প্রশ্ন তৈরি করেছে কি না, সেটিও দেখতে হবে।’

এই শিক্ষাবিদ বলেন, ‘শিক্ষার্থী যেমন কোনো বিষয় বোঝার জন্য এআই ব্যবহার করতে পারেন, তেমনি শিক্ষকও নতুন ধারণা কিংবা ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পেতে প্রযুক্তিটির সহায়তা নিতে পারেন। তবে এআইয়ের তৈরি উত্তর কিংবা প্রশ্ন হুবহু ব্যবহার না করে তা যাচাই করা জরুরি।’

মাইনুল হোসেন বলেন, ‘এআইয়ের দেওয়া তথ্য বা প্রশ্ন যাচাই করা জরুরি। একই সঙ্গে এর ব্যবহার নৈতিক ও দায়িত্বশীল হচ্ছে কি না, সেটিও বিবেচনা করতে হবে।’

সৃজনশীলতা কমবে, নাকি বদলাবে ধরন?

এআইয়ের ব্যবহার যত বাড়ছে, শিক্ষার্থীদের নিজস্ব চিন্তা ও সৃজনশীলতার ওপর এর প্রভাব নিয়েও আলোচনা তত বাড়ছে। বিশেষ করে আগে যে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শিক্ষার্থীদের বই পড়তে হতো কিংবা নিজেরা চিন্তা করতে হতো, এখন সেই প্রশ্নের উত্তর কয়েক সেকেন্ডেই পাওয়া যাচ্ছে। এতে তাদের চিন্তাশক্তি কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও সামনে আসছে।

আইইইইতে প্রকাশিত গবেষণায় অংশ নেওয়া ৮০ দশমিক ১ শতাংশ শিক্ষার্থী অতিরিক্ত এআই নির্ভরতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন।

অধ্যাপক ড. বি এম মাইনুল হোসেন মনে করেন, এআইয়ের কারণে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা কমে যাবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ‘এটি এমন কোনো প্রশ্ন নয়, যার উত্তর এককথায় হ্যাঁ কিংবা না দিয়ে দেওয়া যায়। এআই শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতায় বাধা তৈরি করবে কি করবে না, বিষয়টি এত সরল নয়।’

বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি ক্যালকুলেটর আসার সময়কার বিতর্কের উদাহরণ দেন। অধ্যাপক মাইনুল বলেন, ‘নতুন প্রযুক্তি আসার পর মানুষের দক্ষতা ও সৃজনশীলতায় এর প্রভাব নিয়ে আলোচনা নতুন কিছু নয়। একসময় ক্যালকুলেটর মানুষের গাণিতিক দক্ষতা কমিয়ে দেবে কি না, তা নিয়েও বিতর্ক হয়েছিল। এমনকি এ নিয়ে প্রতিবাদ মিছিলও হয়েছে।’

এই শিক্ষাবিদ বলেন, ‘মানুষ অত্যন্ত অভিযোজনক্ষম। মানুষ নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে। কোনো প্রযুক্তির কারণে সৃজনশীলতার একটি ক্ষেত্র সীমিত হয়ে গেলে মানুষ অন্য ক্ষেত্রে সৃজনশীলতা দেখানোর সুযোগ খুঁজে নেয়। আগে যে কাজ করতে মানুষের অনেক চিন্তা করতে হতো, প্রযুক্তি এখন সেটি সহজ করে দিয়েছে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, মানুষের সৃজনশীলতা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে। বরং নতুন কোনো ক্ষেত্রে সৃজনশীলতা দেখানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।’

মাইনুল হোসেন বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু এই মুহূর্তে এককথায় বলে দেওয়া সম্ভব নয় যে এআই মানুষের সৃজনশীলতা নষ্ট করবে কিংবা করবে না।’

শিক্ষায় এআই ব্যবহারে নীতিমালার তাগিদ

শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে এআইয়ের ব্যবহার বাড়লেও এর নৈতিক ও দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করার বিষয়টি এখনো বড় প্রশ্ন হয়ে রয়েছে। বিশেষ করে এর অপব্যবহার ঠেকাতে।

এফ১০০০রিসার্চে প্রকাশিত গবেষণাতেও এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে নৈতিকতা, তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। গবেষকরা উচ্চশিক্ষায় এআই ব্যবহারের নীতিমালা প্রণয়ন এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

অধ্যাপক ড. বি এম মাইনুল হোসেনও মনে করেন, শিক্ষাক্ষেত্রে এআইয়ের দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করতে দ্রুত নীতিমালা প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘অবশ্যই নীতিমালার প্রয়োজন রয়েছে। নীতিমালা সব সময়ই প্রয়োজন।’

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এআই ব্যবহারের নীতিমালা তৈরির প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, প্রতিটি খাতেরই নিজস্ব কিছু নীতিমালা ও গাইডলাইন থাকা উচিত। কারণ শিক্ষাক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার আর চিকিৎসা কিংবা আর্থিক খাতে এআইয়ের ব্যবহার এক বিষয় নয়।’

মাইনুল হোসেন বলেন, ‘আমাদের দেশেও এ ধরনের নীতিমালা প্রয়োজন। বিশেষ করে শিক্ষাক্ষেত্রে এআইয়ের নৈতিক ও দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করতে দ্রুত নীতিমালা এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশিকা তৈরি করা উচিত।’

এমএইচ/জেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর