শনিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

তাসনিম সিরাজকে ক্লাস থেকে অব্যাহতি দেওয়া বেআইনি: শিক্ষক নেটওয়ার্ক

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩২ পিএম

শেয়ার করুন:

তাসনিম সিরাজকে ক্লাস থেকে অব্যাহতি দেওয়া বেআইনি: শিক্ষক নেটওয়ার্ক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসনিম সিরাজ মাহবুবকে সব ধরনের ক্লাস থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্তকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আদেশবহির্ভূত ও বেআইনি বলে দাবি করেছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক।

শ্রেণিকক্ষে নেকাব পরা এক ছাত্রীকে ‘মৌলবাদী’ ও ‘সন্ত্রাসী’ বলে কটাক্ষ করার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে ক্লাস থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। শিক্ষক নেটওয়ার্কের দাবি, কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আগে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে সেই নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি। 

শনিবার (১০ অক্টোবর) বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক এক বিবৃতিতে এসব কথা জানায়।

বিবৃতিতে বলা হয়, গত ৭ অক্টোবরের ঘটনা নিয়ে ইংরেজি বিভাগ কোনো তদন্ত ছাড়াই এবং অভিযুক্ত শিক্ষককে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে জরুরি সভা আয়োজন করে। ওই সভায় তাসনিম সিরাজ মাহবুবের কোর্সগুলো অন্য শিক্ষকদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীদের তুলনায় শিক্ষকদের মধ্যেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগ্রহ বেশি দেখা গেছে।

শিক্ষক নেটওয়ার্কের ভাষ্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থীরা ৮ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ করেন। অথচ বিভাগীয় একাডেমিক কমিটির সভা ডাকার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল ৭ অক্টোবর সন্ধ্যা ৭টার দিকে। অর্থাৎ, লিখিত অভিযোগ জমা পড়ার আগেই বিভাগ জরুরি সভার প্রস্তুতি নেওয়া হয়।

আরও পড়ুন

ঢাবি ক্যাম্পাসে হিজাব-নেকাবের নীতিমালা চায় ইসলামী ছাত্রী সংস্থা
এসএসসিতে ফেল করাদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টির পরিকল্পনা সরকারের

শারীরিক অসুস্থতার কারণে তাসনিম সিরাজ মাহবুব ওই সভায় অংশ নিতে পারেননি। পরে ৮ অক্টোবর বিভাগীয় সভাপতির স্বাক্ষরিত চিঠির মাধ্যমে তাকে সভার সিদ্ধান্ত জানানো হয়। এ ছাড়া বিভাগ অন্য কোনো উপায়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি বলে দাবি করেছে শিক্ষক নেটওয়ার্ক।

সংগঠনটির মতে, পুরো প্রক্রিয়ায় ন্যায়বিচারের নীতি অনুসরণ করা হয়নি। বরং তাসনিম সিরাজ মাহবুবের ওপর একপক্ষীয়, ষড়যন্ত্রমূলক ও নিপীড়নমূলক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।

বিবৃতিতে ইংরেজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধানের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। শিক্ষক নেটওয়ার্কের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মকানুন সম্পর্কে অবগত থাকা সত্ত্বেও বিভাগীয় প্রধান নিয়মবহির্ভূতভাবে সভা পরিচালনা করেছেন। একজন সহকর্মীর বিরুদ্ধে এত বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তার সঙ্গে কথা বলার প্রয়োজনও তিনি অনুভব করেননি।

সংগঠনটি আরও বলেছে, কোনো আইনেই একজন ব্যক্তিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে শাস্তি দেওয়ার বিধান নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশেও এ বিষয়ে বিধান রয়েছে বলে দাবি করেছেন তারা। শ্রেণিকক্ষে কোনো শিক্ষার্থীর অধিকার ক্ষুণ্ন হয়ে থাকলে অভিযোগ জানানোর অধিকার যেমন তার রয়েছে, তেমনি শিক্ষকেরও নিজের বক্তব্য তুলে ধরার অধিকার রয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে শিক্ষককে সেই সুযোগ দেওয়া হয়নি।

তাসনিম সিরাজ মাহবুবের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে গত দুই বছরের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটেও বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে শিক্ষক নেটওয়ার্ক। তাদের দাবি, গত দুই বছর ধরে তিনি একটি উগ্র গোষ্ঠীর কাছ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত হেনস্তা ও প্রাণনাশের হুমকি পেয়ে আসছেন। বিভিন্ন আলোচনা সভা, বিতর্ক ও মতবিনিময়ে অংশ নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার কারণে তাকে বেনামি হুমকি, গালিগালাজ, চরিত্র হননের চেষ্টা এবং জীবননাশের হুমকির মুখে পড়তে হয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, এসব অভিজ্ঞতার কারণে তিনি গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা থেকে সৃষ্ট মানসিক অভিঘাত বয়ে বেড়াচ্ছেন। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর একটি উগ্র গোষ্ঠীর উত্থান ঘটেছে এবং তারা উদারপন্থি শিক্ষক ও নাগরিকদের বিভিন্নভাবে হেনস্তা করছে।

একই ধরনের ঘটনায় এশিয়া-প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন শিক্ষককে গণচাপ তৈরির মাধ্যমে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান পরিস্থিতি প্রসঙ্গে শিক্ষক নেটওয়ার্কের অভিযোগ, ছাত্রশিবির-নিয়ন্ত্রিত ডাকসু ও ছাত্রী সংস্থা ঘটনাটিকে দ্রুত রাজনৈতিক মেরুকরণের দিকে নিয়ে গেছে। এ কারণে ঘটনাটির পেছনে পূর্বপরিকল্পনা থাকতে পারে বলে সন্দেহের উদ্রেক করেছে।

এ ছাড়া, বিভিন্ন অনলাইন পোর্টাল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বট অ্যাকাউন্ট এবং কিছু মূলধারার সংবাদমাধ্যম ঘটনা ঘটার পরপরই সত্য-মিথ্যার মিশেলে অপতথ্য ছড়ানোর প্রতিযোগিতা শুরু করেছে বলে অভিযোগ করা হয়। এর ফলে একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষককে অনলাইন বিচারের মুখোমুখি হতে হয়েছে বলে বিবৃতিতে দাবি করা হয়।

শিক্ষক নেটওয়ার্ক বলেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের মুক্তচিন্তার অন্যতম কেন্দ্র। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক, বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতা ও পারস্পরিক আস্থাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। তাসনিম সিরাজ মাহবুব দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন দাবি করে সংগঠনটি বলেছে, তাকে চাপে ফেলে ওই গোষ্ঠীর কাছে নতি স্বীকারে বাধ্য করার উদ্দেশ্যেই রাজনৈতিক প্রচারণা ও অপতথ্য ছড়ানো হয়ে থাকতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে ইংরেজি বিভাগের নেওয়া সিদ্ধান্তের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত দাবি করেছে শিক্ষক নেটওয়ার্ক। সংগঠনটির মতে, শিক্ষার্থীদের অভিযোগ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বতন প্রশাসনের কাছে পাঠিয়ে যথাযথ প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া যেত। কিন্তু তা না করে সরাসরি ক্লাস থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্তের পেছনে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে বলে তারা সন্দেহ করছে।

বিবৃতিতে পোশাক ও পরিচয় যাচাইয়ের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, ব্যক্তিগত ও জনপরিসরে প্রত্যেকের পছন্দমতো পোশাক পরার অধিকার রয়েছে। তবে পাসপোর্ট বা জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি, ভর্তি পরীক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা এবং প্রয়োজনে শ্রেণিকক্ষের মতো আনুষ্ঠানিক পরিবেশে পরিচয় যাচাইয়ের জন্য মুখ দেখানো কিংবা বিশেষ ক্ষেত্রে চোখ অনাবৃত রাখার প্রয়োজন হতে পারে।

এ বিষয়ে স্পষ্ট নীতিমালা না থাকায় বিভিন্ন পর্যায়ে নিপীড়নের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলে মনে করে শিক্ষক নেটওয়ার্ক। তাদের মতে, পরিচয় যাচাইয়ের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের অধিকার এবং দায়িত্ব নির্দিষ্ট করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া প্রয়োজন।

সবশেষে, অনুমতি ছাড়া শিক্ষকের বক্তব্য ধারণ করে তা অনলাইনে খণ্ডিতভাবে ছড়িয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা চালানোকে সাইবার অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করেছে সংগঠনটি। এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও সরকারের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক।

এম/এফএ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর