বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানির অভিযোগ পাওয়ার পর তা যথাযথভাবে তদন্ত ও প্রতিকারের উদ্যোগ না নিলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ। তিনি বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে শুধু কমিটি গঠন করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। এসব কমিটিকে কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে এবং প্রতিটি অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ইউজিসি ভবনে ইউজিসি ও ইউএন উইমেনের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। কর্মক্ষেত্র, জনপরিসর ও উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে পরিচালিত একটি প্রকল্পের আওতায় এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা হয়। পরে ইউজিসির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, নারী শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। হাইকোর্টের নির্দেশনার পর দেশের সব সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে ইউজিসির পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে এসব কমিটি প্রত্যাশিতভাবে দায়িত্ব পালন করছে না।
তিনি আরও বলেন, কমিটি গঠন করলেই হবে না, কমিটিকে কার্যকরভাবে কাজ করতে হবে। কোনো নারী অভিযোগ করার পর দায়িত্বপ্রাপ্ত কেউ যেন বলতে না পারেন— এটা আমার কাজ নয়।
অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, যৌন হয়রানির প্রতিটি অভিযোগ দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে। কোনো বিশ্ববিদ্যালয় এই বিষয়ে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে ইউজিসি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
যৌন হয়রানি ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে সমন্বয় ও তদারকির জন্য জাতীয় পর্যায়ে একটি কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান ইউজিসি চেয়ারম্যান। প্রস্তাবিত কমিটিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ইউজিসির প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অভিযোগ গ্রহণ ও প্রতিকারব্যবস্থা এবং প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম সমন্বয় ও তদারকি করবে এই কমিটি।
অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, যৌন হয়রানি ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার বিরুদ্ধে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শূন্য সহনশীলতার নীতি কার্যকর করতে হবে। ইউজিসি ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সমন্বিতভাবে কাজ করলে ক্যাম্পাসগুলোকে নিরাপদ, বৈষম্যহীন ও সহায়ক শিক্ষার পরিবেশ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।
অনুষ্ঠানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদলের ডেপুটি হেড বেইবা জেরিনা বলেন, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং উচ্চশিক্ষাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে যৌন হয়রানি ও লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য দূর করা গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য কর্মক্ষেত্র ও উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারী শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ইউজিসি ও ইউএন উইমেনের মধ্যে এই সমঝোতার মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি, অভিযোগের প্রতিকারব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং নিরাপদ ও বৈষম্যহীন শিক্ষার পরিবেশ তৈরিতে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।
সমঝোতার আওতায় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি এবং আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি একযোগে বাংলাদেশে যৌন হয়রানি ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির কাজ করবে।
এই কার্যক্রমের আওতায় অভিযোগ কমিটি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, অভিযোগ গ্রহণ ও রেফারেল ব্যবস্থা উন্নত করা এবং শিক্ষার্থী ও কর্মীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। এসব কাজে ইউএন উইমেন ও আইন ও সালিশ কেন্দ্র যৌথভাবে সহযোগিতা করবে।
অনুষ্ঠানে ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিভাগের পরিচালক ড. সুলতান মাহমুদ ভূঁইয়া, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. খায়রুল ইসলাম, প্রকল্প বাস্তবায়ন টাস্ক টিমের আহ্বায়ক ড. মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি অধ্যাপক মেহেরুন নেছা তাসলিমা খাতুন, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. শওকত আলী, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম আর কবিরসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, ইউজিসি ও ইউএন উইমেনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ইউজিসির পক্ষে সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন কমিশনের সচিব ড. মো. ফখরুল ইসলাম। ইউএন উইমেনের পক্ষে স্বাক্ষর করেন বাংলাদেশ প্রতিনিধি গীতাঞ্জলি সিং।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৪ সালের জাতীয় জরিপের তথ্য তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণীদের মধ্যে ১৬ শতাংশ প্রযুক্তির মাধ্যমে সংঘটিত লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন।
এম/এফএ




