একসময় একই রাজনৈতিক জোটের অংশ হিসেবে দীর্ঘ আওয়ামী লীগ শাসনামলে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পাশাপাশি অবস্থান করেছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানেও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলনে দুই ধারার কর্মীদের অনেক ক্ষেত্রে একই ময়দানে দেখা গেছে। কিন্তু ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পর বিএনপি ও জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থান পৃথক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার প্রভাব স্পষ্ট হতে শুরু করে ছাত্ররাজনীতিতেও।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে অধিকাংশ ক্যাম্পাসে ছাত্রশিবিরের শক্ত অবস্থান ও বিজয়ের পর দুই সংগঠনের সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়ে ওঠে। শুরুতে তা সীমাবদ্ধ ছিল বক্তব্য, পাল্টা বক্তব্য ও সাংগঠনিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই দ্বন্দ্ব নেমে এসেছে রাজপথে। একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, হামলা, আহতের ঘটনা এবং কোথাও কোথাও ১৪৪ ধারা জারি হওয়ার মধ্য দিয়ে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আবারও অস্থির হয়ে উঠছে।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) একদিনেই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ ও সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়াসহ রাজধানীর একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এর মাত্র একদিন আগে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়েও দুই সংগঠনের মধ্যে সংঘর্ষে একাধিক শিক্ষার্থী আহত হন। ধারাবাহিক এসব ঘটনার পর প্রশ্ন উঠছে, এগুলো কি বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ, নাকি জাতীয় রাজনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতার প্রতিফলন?
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষ, পরে হাসপাতালে হামলার অভিযোগ
মঙ্গলবার সকালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে ইউজিসি চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে আয়োজিত ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান’ আলোকচিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দাবিসংবলিত প্ল্যাকার্ড প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে তা ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষে রূপ নেয়।
এ ঘটনায় জকসুর ভিপি রিয়াজুল ইসলাম, জিএস আব্দুল আলিম আরিফ, ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ইয়াসিন সাইফসহ কয়েকজন আহত হন। সংঘর্ষের সময় দায়িত্ব পালনরত কয়েকজন সাংবাদিকও হামলার শিকার হন।
সংঘর্ষে আহতদের চিকিৎসার জন্য ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে আবারও হামলার অভিযোগ ওঠে। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, হাসপাতালের ভেতরে ও বাইরে আহত শিক্ষার্থী, বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মী, সাংবাদিক এমনকি সাধারণ রোগী ও তাদের স্বজনরাও হামলার শিকার হন। এ ঘটনায় হাসপাতাল এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
পরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
ঘটনার পর জকসুর ভিপি রিয়াজুল ইসলাম নিজের ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘দ্বিতীয় ক্যাম্পাস আর অস্থায়ী আবাসনের দাবিতে আজকের এই হামলার শিকার হয়েছি। রক্ত দিলেও এই পেটুয়াদের কাছে ক্যাম্পাস দেওয়া হবে না, ইনশাআল্লাহ।’
ঢাকা কলেজেও সংঘর্ষ
একই দিন দুপুরে ঢাকা কলেজে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ তোলে।
ছাত্রশিবিরের দাবি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে অনুষ্ঠানস্থল সাজানোর সময় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা হামলা চালান। এতে তাদের কয়েকজন আহত হন। অন্যদিকে ছাত্রদলের পক্ষ থেকেও সংঘর্ষে নিজেদের নেতাকর্মী আহত হওয়ার দাবি করা হয়। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সংঘর্ষে দুই পক্ষ মিলিয়ে অন্তত ২৭ জন আহত হয়েছেন।
আলিয়া মাদ্রাসায় দফায় দফায় সংঘর্ষ
বিকেলে রাজধানীর সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়াতেও ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। হলের সিট দখলকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিরোধ দ্রুত সহিংস রূপ নেয়।
পুলিশের উপস্থিতিতেই উভয় পক্ষ ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ায় জড়িয়ে পড়ে। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলেও এলাকায় থমথমে পরিবেশ বিরাজ করে।
বেরোবিতে সংঘর্ষের পর ১৪৪ ধারা
এর একদিন আগে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত একটি প্রদর্শনীতে ব্যানার প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষ হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ওই ঘটনায় অন্তত ২০ জন শিক্ষার্থী আহত হন, যার মধ্যে পাঁচজনের অবস্থা গুরুতর।
পরদিন দুই সংগঠন একই সময়ে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করলে সংঘর্ষের আশঙ্কায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ক্যাম্পাসে ১৪৪ ধারা জারি করে।
উত্তেজনা ছড়াচ্ছে এক ক্যাম্পাস থেকে আরেক ক্যাম্পাসে
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, আলিয়া মাদ্রাসা ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পর এখন নজর রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের অন্যান্য বড় ক্যাম্পাসের দিকে।
ছাত্ররাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় রাজনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতায় ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে নতুন করে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। সাংগঠনিক আধিপত্য, ছাত্র সংসদ নির্বাচন, ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের অবস্থান এবং রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রভাব বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও পড়ছে।
সারজিস আলমের কড়া বার্তা
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনার পর জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে ছাত্রদলের উদ্দেশে লেখেন, ‘ছাত্রদল যত তাড়াতাড়ি ছাত্রলীগ হবে, তাদের পরিণতি তত তাড়াতাড়ি ছাত্রলীগের চেয়েও খারাপ হবে।’
তিনি আর কোনো ব্যাখ্যা না দিলেও তার এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ শিক্ষার্থীরা
রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলেও সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের। সংঘর্ষের কারণে শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে, আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে ক্যাম্পাসে, বিঘ্নিত হচ্ছে একাডেমিক কার্যক্রম। কোথাও কোথাও প্রশাসনকে ১৪৪ ধারা জারি কিংবা অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করতে হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে মতপার্থক্য ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড গণতান্ত্রিক চর্চার অংশ হলেও সেই মতবিরোধ যখন সংঘর্ষ, হামলা ও সহিংসতায় রূপ নেয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো শিক্ষাঙ্গণ।
তাদের মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো কেবল দুটি ছাত্রসংগঠনের বিরোধ নয়, বরং দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। তাই শুধু সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণ নয়, এর পেছনের কারণ, প্রভাব এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বিশ্লেষণ করাও এখন জরুরি। অন্যথায় একটি ক্যাম্পাসের উত্তাপ খুব দ্রুতই ছড়িয়ে পড়তে পারে দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও।
ডাকসু ভিপি ও সাবেক শিবির নেতা আবু সাদেক কায়েম নিজের ফেসবুক পোস্টে বলেন, ‘জবিতে সশস্ত্র হামলা করেছে ছাত্রদল। জকসুর ভিপি ও জিএস, ছাত্রশিবির, ইনকিলাব মঞ্চ, ছাত্রশক্তি, সাংবাদিক সহ বেশ কিছু সাধারণ শিক্ষার্থীও গুরুতর আহত হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িতদেরকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইনের আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।
স্পষ্টত ছাত্র সংসদ গুলোর মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পরই ক্যাম্পাস ও হল দখলের পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই মূলত এধরণের হামলাসহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অস্থিতিশীলতা তৈরি করা হচ্ছে।
কাজেই, শিক্ষাঙ্গণে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ রক্ষায় সন্ত্রাস, দলীয় আধিপত্য, সিট বাণিজ্য এবং হল দখলের রাজনীতির বিরুদ্ধে এখনই রুখে দাঁড়াতে হবে। সকল ছাত্রসংগঠন ও ছাত্রসমাজকে শিক্ষাঙ্গণে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।
এমআর/এমআই




