বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

রাষ্ট্রের জন্ম দেওয়া অলিগার্করাই অর্থনীতিকে ধ্বংস করছে: মাহবুব উল্লাহ

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩৫ পিএম

শেয়ার করুন:

রাষ্ট্রের জন্ম দেওয়া অলিগার্করাই অর্থনীতিকে ধ্বংস করছে: মাহবুব উল্লাহ
বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলনে তীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ।

বাংলাদেশে অল্পসংখ্যক ধনী ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর স্বার্থ রক্ষায় রাষ্ট্রকে ব্যবহার করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ। তিনি বলেন, বাংলাদেশ একটি শোষণমূলক রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। এই শোষণ সাধারণ মানুষের জন্য নয়, বরং অল্পসংখ্যক ধনী, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও কোটিপতির স্বার্থে পরিচালিত হচ্ছে। এ দেশে এই অলিগার্কদের জন্ম দিয়েছে খোদ রাষ্ট্র।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) রাজধানীর মিরপুরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মিলনায়তনে দুই দিনব্যাপী বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনের প্রথম অধিবেশনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

মাহবুব উল্লাহ বলেন, অলিগার্কদের প্রশ্রয় না দিলে অর্থনীতিকে সঠিক পথে ফেরানো যাবে না, এমন ধারণাকে উৎসাহিত করা উচিত নয়। অর্থনীতি ইতিমধ্যে লাইনচ্যুত হয়েছে। ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। তাই এ ধরনের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

দেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে জাতীয় অধ্যাপক বলেন, ব্যাংকিং খাত অত্যন্ত দুর্বল ও ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। এটি প্রায় বিলুপ্তির মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ ও অর্থনীতির জন্য এটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতি।

Annual_Banking_Conference_Professor_Mahbub_Ullah_1অধিকাংশ ব্যাংক ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাজারের নিয়ম অনুসরণ করা হলে এসব ব্যাংকের অধিকাংশই এত দিনে বিলুপ্ত হয়ে যেত। কিন্তু নানা উপায়ে ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে। এসব উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

‘দীর্ঘদিনের অনিয়মে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারিয়েছেন অধিকাংশ মানুষ’

ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে আস্থার সংকটকে চিহ্নিত করেন মাহবুব উল্লাহ। তাঁর মতে, দীর্ঘদিনের অনিয়মের কারণে অধিকাংশ মানুষ ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারিয়েছেন। তবে এই পরিস্থিতির মধ্যেও কয়েকটি ব্যাংক ভালো করছে এবং সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এসব ব্যাংকের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

ব্যাংকিং খাতের ঋণ কার্যক্রমে সরকারি খাতের প্রতি অতিরিক্ত মনোযোগের সমালোচনা করেন তিনি। মাহবুব উল্লাহ বলেন, ব্যাংকগুলো এখন পুরোপুরি সরকারমুখী হয়ে পড়েছে। বেসরকারি খাতের প্রতি তাদের মনোযোগ কম। এর ফলে বেসরকারি খাত ঋণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ভবিষ্যতে ঋণের বোঝা আরও বাড়তে পারে। সরকার কীভাবে সেই ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধ করবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

রাষ্ট্র পরিচালনায় ক্ষমতাসীনদের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করে মাহবুব উল্লাহ বলেন, শিল্পকারখানা ও ব্যাংকের বেসরকারীকরণ নিয়ে আলোচনা হলেও রাষ্ট্রকে জনগণের সম্পত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। ক্ষমতার শীর্ষে থাকা ব্যক্তিরা রাষ্ট্রকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি বা সাম্রাজ্য হিসেবে ব্যবহার করেছেন। নিজেদের সমর্থক, আত্মীয়স্বজন ও ঘনিষ্ঠদের মধ্যে সুযোগ-সুবিধা বিতরণ করেছেন। এটিই মূল সমস্যা।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ গুটিকয় উচ্চাভিলাষী মানুষের হাতে থাকলে দেশের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। এই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটিয়ে রাষ্ট্রকে সাধারণ মানুষের রাষ্ট্রে পরিণত করতে হবে। তা না হলে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করা যাবে না।

ব্যাংকিং খাতে অলস তারল্যের ৪ ট্রিলিয়ন টাকা ছাড়িয়েছে

বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলামের সভাপতিত্বে সম্মেলনের প্রথম অধিবেশনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক বরকত-এ-খোদা। স্বাগত বক্তব্য দেন বিআইবিএমের অধ্যাপক শাহ মো. আহসান হাবিব।

মূল প্রবন্ধে বরকত-এ-খোদা দেশের ব্যাংকিং খাতে বিপরীতমুখী চাপের বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, একদিকে কিছু দুর্বল ও শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক তীব্র তারল্যসংকটে ভুগছে, অন্যদিকে সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে অলস বা অতিরিক্ত তারল্য জমেছে। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে অলস তারল্যের পরিমাণ চার ট্রিলিয়ন টাকা ছাড়িয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩৯ শতাংশ বেশি।

অস্বাভাবিক খেলাপি ঋণের পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্বল সুশাসন, নমনীয় নীতিমালা এবং বারবার ঋণ পুনর্গঠনের সুবিধা দেওয়াকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন বরকত-এ-খোদা। তিনি বলেন ,বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির ধীরগতিও এ পরিস্থিতির একটি কারণ। আনুমানিক পাঁচ লাখ কোটি টাকা ভুয়া ঋণ ও দুর্নীতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে। এ ছাড়া আড়াই লাখ থেকে তিন লাখ কোটি টাকা প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট বিদেশে পাচার করেছে বলে তাঁর প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়।

ব্যাংকের পরিচালক ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের একটি অংশ উপযুক্ত জামানত কিংবা ঋণ পরিশোধের সদিচ্ছা ছাড়াই বিভিন্ন ব্যাংক থেকে অর্থ নিয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা নেটওয়ার্ক ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে গেছে বলেও প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়।

এএইচ/এএম

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর