মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

পাতাল মেট্রোরেলে ২৮ মিনিটে গাবতলী-দাশেরকান্দি, প্রকল্প উঠছে একনেকে

আব্দুল হাকিম
প্রকাশিত: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০০ এএম

শেয়ার করুন:

পাতাল মেট্রোরেলে ২৮ মিনিটে গাবতলী-দাশেরকান্দি, প্রকল্প উঠছে একনেকে

রাজধানীর যানজট কমিয়ে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য গণপরিবহনব্যবস্থা গড়ে তুলতে গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত পাতাল মেট্রোরেল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ৪৭ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ঢাকার পশ্চিম থেকে পূর্ব অংশের মধ্যে দ্রুত যোগাযোগ তৈরি হবে। তখন গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি যেতে সময় লাগবে মাত্র ২৮ মিনিট। মেট্রোরেল-৫-এর দক্ষিণ রুটের এ প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য একনেক সভায় তোলা হচ্ছে।

মেট্রোরেল-৫ দক্ষিণ রুটের মোট দৈর্ঘ্য ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার। এর মধ্যে ১৩ দশমিক ১০ কিলোমিটার হবে পাতালপথ এবং ৪ দশমিক ১০ কিলোমিটার উড়ালপথ। গাবতলী থেকে শুরু হয়ে টেকনিক্যাল, কল্যাণপুর, শ্যামলী, কলেজ গেট, আসাদগেট, শুক্রাবাদ, কারওয়ান বাজার, হাতিরঝিল, তেজগাঁও, আফতাবনগর, আফতাবনগর সেন্টার, আফতাবনগর পূর্ব, নাসিরাবাদ হয়ে দাশেরকান্দিতে গিয়ে শেষ হবে রুটটি। এই পথে মোট ১৫টি স্টেশন থাকবে।

প্রকল্পের হিসাব অনুযায়ী, গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি যেতে সময় লাগবে মাত্র ২৮ মিনিট। প্রতিদিন প্রায় ৯ লাখ ২৪ হাজার যাত্রী এই রুটে চলাচল করতে পারবেন। প্রতিটি ট্রেনে একসঙ্গে ২ হাজার ৩১২ জন যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা থাকবে। মেট্রোরেল চালু হলে সড়কে যানবাহনের চাপ কমার পাশাপাশি যাত্রীদের যাতায়াতের সময়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে বলে প্রকল্প প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রকল্পের অর্থনৈতিক হিসাবে বলা হয়েছে, মেট্রোরেল-৫ চালু হলে বছরে ২১ কোটি ৪৯ লাখ ৭০ হাজার কর্মঘণ্টা সাশ্রয় হতে পারে। একই সঙ্গে সড়ক থেকে প্রায় ১ হাজার ৪৯টি যানবাহন কমে আসতে পারে। কার্বন নিঃসরণ কমার পরিমাণ ধরা হয়েছে বছরে প্রায় ২ লাখ ৮ হাজার টন। ফলে প্রকল্পটি শুধু যানজট কমানোর পাশাপাশি পরিবেশ ও নগরবাসীর সময় সাশ্রয়েও ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রকল্পটির মোট ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৭ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা। শুরুতে এর ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৫৫ হাজার কোটি টাকা। পরে বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করে ব্যয় প্রায় ৭ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা কমানো হয়েছে। মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থাকবে ১৫ হাজার ৩১৪ কোটি টাকা। বাকি ৩২ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ হিসেবে নেওয়া হবে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও কোরিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহযোগিতা তহবিলের অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। বৈদেশিক অর্থায়নের বিষয়টি নিয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ কাজ করছে।

metro_rail-2প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ২০৩২ সাল পর্যন্ত ধরা হয়েছে। আর ২০৩০ সালের জুনের মধ্যে মেট্রোরেল চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্মাণকাজের পাশাপাশি পরীক্ষামূলক পরিচালনা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক কার্যক্রম শেষ করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যাত্রী পরিবহন শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।

মেট্রোরেল-৫-এর দক্ষিণ রুটের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য, এর অধিকাংশই হবে পাতালপথ। মোট ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার রুটের ১৩ দশমিক ১০ কিলোমিটারই থাকবে মাটির নিচে। রাজধানীর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় নতুন করে সড়কের ওপর বড় অবকাঠামো নির্মাণ এবং জমি অধিগ্রহণের চাপ কমানোর পাশাপাশি যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতেই পাতালপথকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এই রুটটি ঢাকার মেট্রোরেল নেটওয়ার্কের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। মেট্রোরেল-৫-এর উত্তর ও দক্ষিণ অংশের মধ্যে যোগাযোগ তৈরির পাশাপাশি মেট্রোরেল-২-এর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ একাধিক মেট্রোরেল রুট ব্যবহার করে গন্তব্যে যাওয়ার সুযোগ পাবেন।

ইআরডির অতিরিক্ত সচিব এস এম জাকারিয়া হক জানান, প্রকল্পটির বৈদেশিক অর্থায়নের বিষয়ে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সঙ্গে অর্থায়নের কাঠামো নিয়ে আগেই সমঝোতা ছিল। প্রকল্পটি এগিয়ে নিতে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানান, প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই ও বিস্তারিত নকশার কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। প্রাথমিক প্রকৌশল নকশা, দরপত্রসংক্রান্ত প্রস্তুতি, জমি অধিগ্রহণ এবং পুনর্বাসন পরিকল্পনার কাজও এগিয়েছে। ২০২২ সালে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ হয়। সম্ভাব্যতা যাচাই ও বিস্তারিত নকশার পেছনে এরই মধ্যে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৩ সালে নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। বিভিন্ন প্রশাসনিক ও অর্থায়নসংক্রান্ত জটিলতায় প্রকল্পটি দীর্ঘ সময় ধরে আটকে ছিল। আগের সরকার পরিবর্তনের পরও সংশোধিত ব্যয় প্রস্তাব একনেকে তোলা সম্ভব হয়নি। ফলে প্রস্তুতিমূলক কাজ শেষ হলেও মূল নির্মাণকাজ শুরু করা যায়নি।

প্রকল্প পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আবদুল ওয়াহাব বলেন, বর্তমান সরকার প্রকল্পটি এগিয়ে নিতে আগ্রহী। উন্নয়ন সহযোগীদের অবস্থানও এখন আগের তুলনায় ইতিবাচক। ফলে একনেকে অনুমোদন পাওয়া গেলে প্রকল্প বাস্তবায়নের পরবর্তী ধাপগুলো দ্রুত এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।

তবে প্রকল্পটির ব্যয় ও বাস্তবায়ন নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে কিছু প্রশ্ন রয়েছে। তারা বলছেন, মেট্রোরেল নির্মাণের সুফল পেতে হলে শুধু একটি রুট চালু করলেই হবে না। স্টেশনকেন্দ্রিক বাস সংযোগ, পথচারীদের চলাচল, আন্তঃরুট সংযোগ এবং অন্যান্য গণপরিবহনের সঙ্গে সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তা না হলে বিপুল অর্থ ব্যয় করে নির্মিত অবকাঠামো প্রত্যাশিত মাত্রায় যাত্রী আকর্ষণ করতে নাও পারে।

প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সড়কনির্ভর যাতায়াতের ওপর নির্ভরতা কমার সুযোগ তৈরি হবে। বর্তমানে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে যানজটের কারণে অল্প দূরত্ব অতিক্রম করতেও দীর্ঘ সময় লাগে। এর ফলে মানুষের কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, জ্বালানি খরচ বাড়ে এবং বায়ুদূষণও বাড়ে। মেট্রোরেলের নির্দিষ্ট সময়সূচি ও দ্রুতগতির কারণে এসব ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসতে পারে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হাদিউজ্জামান বলেন, মেট্রোরেল-৫ দক্ষিণ রুটটি জনবান্ধব প্রকল্প হলেও অন্যান্য মেট্রোরেল প্রকল্পের তুলনায় এখানে যাত্রী চাহিদা তুলনামূলক কম হতে পারে। তাই শুধু রেললাইন নির্মাণ করলেই হবে না, স্টেশনগুলোর মধ্যে আন্তঃসংযোগ এবং অন্যান্য গণপরিবহনের সঙ্গে কার্যকর সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

Metro_RAIL-3

তিনি বলেন, এই প্রকল্পের বড় অংশ পাতালপথে হওয়ায় নির্মাণ ও পরিচালনা দুটিই চ্যালেঞ্জিং হবে। পাতাল মেট্রোরেল নির্মাণে প্রযুক্তিগত জটিলতা যেমন বেশি, তেমনি রক্ষণাবেক্ষণেও বাড়তি ব্যয় প্রয়োজন হয়। তাই প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে ব্যয় ও সম্ভাব্য যাত্রীসংখ্যার বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা দরকার।

অধ্যাপক হাদিউজ্জামান মেট্রোরেল নির্মাণে দরপত্র ও ঠিকাদার নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, নির্দিষ্ট প্রযুক্তি বা বিশেষায়িত নির্মাণপদ্ধতির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা থাকলে দরপত্রে প্রতিযোগিতা সীমিত হয়ে যেতে পারে। এতে কয়েকটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কাজ সীমাবদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা থাকে এবং প্রতিযোগিতামূলক দর পাওয়ার সুযোগ কমে যায়।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. শামসুল হকও প্রকল্পটির ব্যয় ও পরিচালন সক্ষমতা নিয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, মেট্রোরেল নিঃসন্দেহে জনবান্ধব গণপরিবহনব্যবস্থা। তবে এত বড় ব্যয়ের প্রকল্পে নির্মাণের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ব্যয়ও বিবেচনায় নিতে হবে। পাতাল মেট্রোরেলের শুধু নির্মাণ ব্যয়ই বেশি নয়, পরবর্তী সময়ে রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা, বায়ু চলাচল, আলো, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার জন্যও বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন হবে। তাই প্রকল্পের অর্থনৈতিক সক্ষমতা নির্ধারণের সময় নির্মাণ ব্যয়ের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ব্যয়ের হিসাবও স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, মেট্রোরেল থেকে যাত্রীভাড়া বাবদ কত আয় হবে এবং পরিচালন ব্যয় মেটাতে সরকারের ভর্তুকি কতটা প্রয়োজন হতে পারে, সেটিও এখন থেকেই বিবেচনায় নেওয়া উচিত। মেট্রোরেল-৬ এখনো পুরোপুরি লাভজনকভাবে পরিচালিত হচ্ছে না। সে ক্ষেত্রে নতুন ও বড় ব্যয়ের পাতাল মেট্রোরেল প্রকল্পের ভবিষ্যৎ পরিচালন সক্ষমতা নিয়ে আগেই বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা করা দরকার।

এএইচ/এমআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর