রাজধানীর পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তকে দ্রুত ও নিরাপদ গণপরিবহন নেটওয়ার্কে যুক্ত করতে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ হতে যাচ্ছে নতুন পাতাল মেট্রোরেল। যানজট কমানো, যাতায়াতের সময় বাঁচানো ও পরিবেশদূষণ কমানোর মতো নানা সুফলের কথা বলা হলেও প্রকল্পটির আর্থিক টেকসইয়ের বিষয়ে উঠেছে বড় প্রশ্ন।
প্রকল্পের নিজস্ব আর্থিক বিশ্লেষণেই দেখা গেছে, ভাড়া ও পরিচালন আয় দিয়ে বিনিয়োগের অর্থ পুরোপুরি ফেরত আসবে না। নিট বর্তমান মূল্য (এনপিভি) ঋণাত্মক ৫ হাজার ১৯৯ কোটি টাকা এবং বেনিফিট-কস্ট রেশিও ১-এর নিচে। এরপরও জাতীয় অর্থনীতিতে ব্যাপক সুফলের যুক্তিতে গাবতলী-দাশেরকান্দি রুটের ‘ঢাকা মাস র্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (লাইন-৫): সাউদার্ন রুট’ অনুমোদনের জন্য একনেকের দ্বারপ্রান্তে।
দুই দফা ব্যয় কমানো ও দীর্ঘ প্রশাসনিক বিলম্বের পর অবশেষে প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপনের জন্য সুপারিশ করেছে পরিকল্পনা কমিশন।
পরিকল্পনা কমিশনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রকল্পটি একনেক সভার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। বুধবারের সভায় না হলে পরবর্তী সভায় এটি অনুমোদনের জন্য তোলা হবে। অনুমোদন মিললে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীন ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০৩৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত ছয় বছর মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে।
প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন থাকবে ১৫ হাজার ১৯৭ কোটি ৬৬ লাখ টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ হিসেবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও দক্ষিণ কোরিয়ার ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন ফান্ড (ইডিসিএফ) দেবে ৩০ হাজার ৩০৬ কোটি টাকার বেশি। অর্থাৎ মোট ব্যয়ের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই আসবে ঋণ থেকে।
ডিপিপি অনুযায়ী, গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই মেট্রোরেলের মধ্যে ১৩ দশমিক ১০ কিলোমিটার থাকবে ভূগর্ভস্থ এবং ৪ দশমিক ১০ কিলোমিটার হবে উড়ালপথ। মোট ১৫টি স্টেশনের মধ্যে ১১টি হবে পাতাল এবং ৪টি উড়াল স্টেশন। গাবতলী, টেকনিক্যাল, কল্যাণপুর, শ্যামলী, কলেজ গেট, আসাদ গেট, রাসেল স্কয়ার, কারওয়ান বাজার, হাতিরঝিল, তেজগাঁও, আফতাবনগর, আফতাবনগর সেন্টার, আফতাবনগর পূর্ব, নাসিরাবাদ হয়ে দাশেরকান্দিতে গিয়ে শেষ হবে এই রুট।
ডিএমটিসিএলের পরিকল্পনা অনুযায়ী, গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত পুরো পথ অতিক্রম করতে সময় লাগবে মাত্র ২৮ মিনিট। বর্তমানে একই পথ যানজটের কারণে প্রায় দেড় থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগে। চালুর সময় ৬ কোচ বিশিষ্ট ১৯টি ট্রেন পরিচালনা করা হবে এবং প্রতিটি ট্রেনে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৩১২ জন যাত্রী বহনের সক্ষমতা থাকবে। শুরুতে প্রতি ৪ মিনিট ৩০ সেকেন্ড পরপর ট্রেন চলবে, যা ভবিষ্যতে ৩ মিনিট ১০ সেকেন্ডে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিদিন প্রায় ৯ লাখ ২৪ হাজার যাত্রী এই রুট ব্যবহার করবে বলে ধারণা করছে ডিএমটিসিএল।
তবে এই প্রকল্পকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এর আর্থিক সম্ভাব্যতা। ডিপিপির আর্থিক বিশ্লেষণে নিট বর্তমান মূল্য (এনপিভি) ঋণাত্মক ৫ হাজার ১৯৯ কোটি টাকা দেখানো হয়েছে। একই সঙ্গে বেনিফিট-কস্ট রেশিও মাত্র ০ দশমিক ৯৫, যা একের নিচে। অর্থাৎ শুধুমাত্র ভাড়া ও পরিচালন আয় দিয়ে প্রকল্পটি বিনিয়োগের অর্থ ফেরত দিতে পারবে না। অন্যদিকে অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে।
সেখানে নিট বর্তমান মূল্য ৩৫ হাজার ১৬১ কোটি টাকা, বেনিফিট-কস্ট রেশিও ২ দশমিক ৪১ এবং অভ্যন্তরীণ আয়ের হার ১৮ দশমিক ৮ শতাংশ। পরিকল্পনা কমিশনের মতে, সময় সাশ্রয়, যানজট হ্রাস, জ্বালানি সাশ্রয়, কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মতো সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুফল বিবেচনায় প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনীতির জন্য লাভজনক।
ডিপিপিতে পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের যে হিসাব দেওয়া হয়েছে, সেটিও উদ্বেগের একটি বড় কারণ। প্রকল্প চালুর প্রথম বছর অর্থাৎ ২০৩০ সালে বছরে পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছে ৮০৮ দশমিক ৩ কোটি টাকা। ২০৪০ সালে তা বেড়ে হবে ৮৫০ দশমিক ৬ কোটি টাকা, ২০৫০ সালে ৮৬৭ দশমিক ৮ কোটি এবং ২০৬০ সালে পৌঁছাবে ৯০০ দশমিক ৮ কোটি টাকায়।
এই ব্যয়ের মধ্যে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, বিদ্যুৎ, নিরাপত্তা, খুচরা যন্ত্রাংশ, প্রশাসনিক ব্যয় এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। অন্যদিকে ডিপো, ওয়ার্কশপ, অপারেশন কন্ট্রোল সেন্টার ও নিরাপত্তা প্রযুক্তির মূলধনী ব্যয় বহন করবে এডিবি ও কে-এক্সিম ব্যাংক।
প্রকল্পের ব্যয় কেন এত বেশি, তারও ব্যাখ্যা রয়েছে ডিপিপিতে। ভূগর্ভস্থ অংশ নির্মাণে প্রতি মিটার সিভিল ওয়ার্কসের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৯৬ দশমিক ৭৩ লাখ টাকা, যা এমআরটি লাইন-১-এর তুলনায় বেশি। ডিএমটিসিএল বলছে, হাতিরঝিলের নিচ দিয়ে গভীর টানেল নির্মাণ, জটিল ভূতাত্ত্বিক অবস্থা এবং শতভাগ আমদানিনির্ভর নির্মাণসামগ্রীর কারণে এই ব্যয় বেড়েছে। উড়াল অংশে প্রতি মিটারে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩৪ লাখ টাকা। তবে রোলিং স্টকের ক্ষেত্রে প্রতি কোচের মূল্য ১ দশমিক ৮৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা লাইন-১ ও নর্দার্ন রুটের তুলনায় কিছুটা কম।
আলোচিত এই প্রকল্পটির ব্যয় ইতোমধ্যে দুই দফায় সংশোধন করা হয়েছে। শুরুতে প্রায় ৫৪ হাজার ৬১৯ কোটি টাকার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। পরে বিস্তারিত নকশা সম্পন্ন হওয়ার পর প্রথম সংশোধনে ব্যয় কমিয়ে ৪৭ হাজার ৭২১ কোটি টাকা করা হয়। সর্বশেষ পুনর্মূল্যায়নে আরও প্রায় ২ হাজার ২১৮ কোটি টাকা কমে ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকায়। অর্থাৎ মূল প্রস্তাবের তুলনায় প্রায় ৯ হাজার ১১৫ কোটি টাকা কমানো হয়েছে।
আরও পড়ুন: আরও বাড়ছে মেট্রোরেল যাত্রীদের সুবিধা
প্রকল্পের সামাজিক দিকও গুরুত্ব পেয়েছে। প্রতিটি স্টেশনে র্যাম্প, লিফট, ট্যাকটাইল পথ, ব্রেইল বাটনযুক্ত এলিভেটর এবং হুইলচেয়ার উপযোগী চলাচলের ব্যবস্থা থাকবে। নারীদের জন্য পৃথক কোচ, স্তন্যদান কক্ষ, ডায়াপার পরিবর্তনের স্থান, স্ট্রোলারবান্ধব প্রবেশপথ এবং উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। সিসিটিভি নজরদারি, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা এবং নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েনের মাধ্যমে নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ডিএমটিসিএলের হিসাব অনুযায়ী, এই মেট্রোরেল চালু হলে বছরে ২১ কোটি ৪৯ লাখ ৭০ হাজার কর্মঘণ্টা সাশ্রয় হবে। সড়কে প্রায় ১ হাজার ৪৯টি যানবাহনের সমপরিমাণ চাপ কমবে এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার হ্রাসের মাধ্যমে বছরে প্রায় ২ লাখ ৮ হাজার টন কার্বন নিঃসরণ কমানো সম্ভব হবে। রাজধানীর পূর্ব-পশ্চিম করিডোরে ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর নির্ভরতা কমে আসবে এবং গণপরিবহনের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলেও আশা করা হচ্ছে।
জানা গেছে, সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (আরএসটিপি) অনুযায়ী ঢাকায় পাঁচটি এমআরটি করিডোর নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে এমআরটি লাইন-৬ আংশিকভাবে চালু, লাইন-১ ও লাইন-৫ নর্দার্ন রুট নির্মাণাধীন। সাউদার্ন রুট অনুমোদন পেলে রাজধানীর পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তের মধ্যে প্রথম পূর্ণাঙ্গ পাতাল-উড়াল সমন্বিত মেট্রোরেল করিডোর বাস্তবায়নের পথ খুলবে।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, সুদজনিত প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার ব্যয় বাদ দেওয়া, ভূমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন কমানো এবং প্রশাসনিক ব্যয় পুনর্নির্ধারণের ফলে এই সাশ্রয় সম্ভব হয়েছে।
ভূমি অধিগ্রহণেও বড় পরিবর্তন এসেছে। শুরুতে ২৩ দশমিক ০৯ হেক্টর জমি প্রয়োজন হবে বলে ধরা হলেও সর্বশেষ পরিকল্পনায় তা কমে হয়েছে মাত্র ৯ দশমিক ১০৪ হেক্টর। ফলে ক্ষতিপূরণ এবং জমি অধিগ্রহণ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
প্রকল্প পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আব্দুল ওহাব বলেন, শুরুতে প্রকল্পটি দুটি ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা ছিল। প্রথম ধাপে কারিগরি সহায়তা প্রকল্পের মাধ্যমে সম্ভাব্যতা যাচাই, বিস্তারিত নকশা এবং দরপত্র দলিল প্রস্তুতের কাজ ২০২৪ সালের মধ্যেই শেষ হয়। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে মূল প্রকল্পটি অনুমোদন পায়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বড় প্রকল্প অনুমোদনে নীতিগত সীমাবদ্ধতার কারণে এটি পিছিয়ে যায়। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আবার প্রকল্পটি সক্রিয়ভাবে এগিয়ে আনা হয়েছে।
আব্দুল ওহাব আরো বলেন, প্রথমদিকে যে ব্যয় ধরা হয়েছিল, তা ছিল আনুমানিক। নকশা চূড়ান্ত হওয়ার পর পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা কমানো সম্ভব হয়েছে। পরে আরও কিছু খাত পুনর্বিন্যাস করায় সর্বশেষ ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পটি শুধু একটি নতুন রেললাইন নয়, বরং রাজধানীর সমন্বিত মেট্রোরেল নেটওয়ার্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। কারওয়ান বাজারে এমআরটি লাইন-৬, আফতাবনগরে এমআরটি লাইন-১ এবং গাবতলীতে এমআরটি লাইন-৫ নর্দার্ন রুটের সঙ্গে ইন্টারচেঞ্জ সুবিধা থাকবে। ফলে উত্তরা, বিমানবন্দর, হাতিরঝিল, তেজগাঁও ও দাশেরকান্দির মধ্যে দ্রুত রেলভিত্তিক যোগাযোগ তৈরি হবে।
আরও পড়ুন: মেট্রোরেলের নিরাপত্তায় কমিটি কেন?
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শামসুল হক বলেন, প্রকল্পটি জনবান্ধব হলেও এর বিপুল ব্যয় ও পরিচালন ব্যয়ের বিষয়টি অনুমোদনের আগে গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এমআরটি-৬ এখনও পুরোপুরি লাভজনক হতে পারেনি। সেখানে আরও ব্যয়বহুল একটি পাতাল মেট্রো চালু হলে রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা, বায়ু চলাচল, আলো এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় বিপুল ব্যয় বহন করা বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
শামসুল হক বলেন, ভাড়া কাঠামো, সম্ভাব্য সরকারি ভর্তুকি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন সক্ষমতা নিশ্চিত না করলে ভবিষ্যতে এই ধরনের জনসেবামূলক প্রকল্প রাষ্ট্রের ওপর বড় আর্থিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
এএইচ/এমআর




