বাজেট ঘোষণার দুই মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও দেশের তামাক কোম্পানিগুলো এখনো পুরনো দামের সিগারেট নতুন দামে বিক্রি করে সরকারের কোটি কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও গবেষকরা। তাদের দাবি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রজ্ঞাপনে পুরনো প্যাকেটে নতুন সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) সিল দিয়ে বাজারজাত করার নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না। এনবিআর ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বিষয়টি জেনেও কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
রোববার (১৬ আগস্ট) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক গবেষণা ব্যুরোর সম্মেলন কক্ষে ‘জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও রাজস্ব বৃদ্ধিতে তামাক কর নীতি’ শীর্ষক কর্মশালায় বক্তারা এসব কথা বলেন। কর্মশালার আয়োজন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক গবেষণা ব্যুরো (বিইআর) ও বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক ফর টোব্যাকো ট্যাক্স পলিসি (বিএনটিটিপি)।
কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও বিইআরের পরিচালক মাসুদা ইয়াসমিন। প্রধান অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) ড. মো. এনামুল হক। এছাড়া ‘তামাক কোম্পানির হস্তক্ষেপ, প্রপাগান্ডা ও বাস্তবতা’ বিষয়ে বক্তব্য দেন সাংবাদিক ও গবেষক সুশান্ত সিনহা এবং ‘বাংলাদেশের তামাক কর ব্যবস্থা’ বিষয়ে উপস্থাপনা করেন বিএনটিটিপির প্রকল্প পরিচালক হামিদুল ইসলাম হিল্লোল। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বিইআরের সিনিয়র প্রজেক্ট ও কমিউনিকেশন অফিসার ইব্রাহীম খলিল।
আরও পড়ুন: ‘১৮ কোটি মানুষের দেশে গ্রাহকপ্রতি গড় আয় দিয়ে বাজার বোঝা যাবে না’
এছাড়া কর্মশালায় দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রায় ২০ জন সাংবাদিক অংশ নেন। তারা জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, তামাকপণ্যের কর বৃদ্ধি, রাজস্ব ফাঁকি রোধ এবং বাজেট-পরবর্তী কর পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আরও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার সুপারিশ করেন।
প্রধান অতিথি ড. মো. এনামুল হক বলেন, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর তামাক নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি সমন্বিত তামাক কর নীতি অপরিহার্য। স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট থেকে এনবিআরের কাছে কর নীতির রূপরেখাসহ সুপারিশ পাঠানো হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, রাজস্ব বৃদ্ধি ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার সমন্বয়ে একটি জাতীয় তামাক কর নীতি প্রণয়ন করা হবে।
সাংবাদিক ও গবেষক সুশান্ত সিনহা বলেন, বাজেট পাস হওয়ার পর দ্রুত নতুন দামের সিগারেট বাজারে আসার কথা থাকলেও তামাক কোম্পানিগুলো তা ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্বিত করছে। তারা জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চার মাসেরও বেশি সময় পুরনো এমআরপির প্যাকেট বাজারে সরবরাহ করে নতুন দামে বিক্রি করছে, যার ফলে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি হচ্ছে।
তিনি বলেন, এনবিআরের প্রজ্ঞাপনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে পুরনো মূল্য মুদ্রিত প্যাকেটে সিল দিয়ে নতুন মূল্য উল্লেখ করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে কোনো সিল ছাড়াই পুরনো প্যাকেটেই বেশি দামে সিগারেট বিক্রি হচ্ছে। এমআরপির চেয়ে বেশি দামে বিক্রি বন্ধে এনবিআর ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে যৌথভাবে অভিযান চালানোর আহ্বান জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, রাজস্ব ফাঁকির অন্যতম কারণ বর্তমান বহুস্তরভিত্তিক অ্যাড ভ্যালোরেম কর কাঠামো। এ ব্যবস্থার পরিবর্তে সুনির্দিষ্ট করভিত্তিক কাঠামো চালু করলে রাজস্ব আদায় বাড়বে এবং কর ফাঁকির সুযোগ কমবে।
বিএনটিটিপির প্রকল্প পরিচালক হামিদুল ইসলাম হিল্লোল বলেন, তামাক কোম্পানিগুলো প্রতিবছর বাজেটের আগে সিগারেটের দাম বাড়লে চোরাচালান বেড়ে যাবে এমন প্রচারণা চালায়। কিন্তু বিভিন্ন সংবাদ ও গবেষণা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এসব চোরাচালানের অধিকাংশ খবর একই ধরনের, দায়ী ব্যক্তিদের খুঁজে পাওয়া যায় না এবং কাউকে আটক হওয়ার ঘটনাও খুব কম দেখা যায়।
তিনি বলেন, সারা বছর চোরাচালানের আলোচনা না থাকলেও বাজেটের আগে হঠাৎ করে এ ধরনের খবর বাড়তে থাকে, যা তামাক কোম্পানির কৌশল হতে পারে। তার ভাষ্য, প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে সিগারেটের দাম অনেক কম হওয়ায় ব্যাপক চোরাচালানের দাবি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সরকারের উচিত বাজেটে ‘তদূর্ধ্ব’ শব্দ বাদ দিয়ে তামাকপণ্যের ওপর সুনির্দিষ্ট কর আরোপ করা এবং একটি জাতীয় তামাক কর নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা।
আরও পড়ুন: তামাক পণ্যের দাম বাড়লে রাজস্ব আয় আসবে ৮৫ হাজার কোটি টাকা
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক মাসুদা ইয়াসমিন বলেন, তামাক থেকে যে রাজস্ব আসে তার চেয়ে তামাকজনিত রোগের চিকিৎসায় রাষ্ট্রের ব্যয় অনেক বেশি। তাই ধাপে ধাপে তামাকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প রাজস্ব উৎস গড়ে তুলতে হবে এবং একই সঙ্গে তামাকপণ্যের ওপর আরও কার্যকর কর আরোপের পথ খুঁজতে হবে।
কর্মশালায় উপস্থাপিত বিএনটিটিপির তথ্যপত্রে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় দিক তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, ডিজিটাল ট্র্যাক অ্যান্ড ট্রেস ব্যবস্থা, কিউআর বা এআর কোডযুক্ত ট্যাক্স স্ট্যাম্প, নাগরিক অভিযোগের মোবাইল অ্যাপ, উৎপাদন উপকরণ নিয়ন্ত্রণ এবং অবৈধ তামাকপণ্য শনাক্তে আইন প্রয়োগের উদ্যোগ বাজেটের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। এছাড়া সিগারেট ও বিড়ির কাগজের আমদানি নিয়ন্ত্রণ, তামাক কোম্পানির ওপর উচ্চ করহার বহাল রাখা এবং সব স্তরের সিগারেটের দাম ৩ দশমিক ৩ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর বিষয়টিও ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
তবে তথ্যপত্রে বলা হয়, অভিন্ন সুনির্দিষ্ট আবগারি কর চালু করা হয়নি এবং নিম্ন ও মধ্যম স্তরের সিগারেট একীভূত করার সুপারিশও গ্রহণ করা হয়নি। দেশের প্রায় ৭৫ শতাংশ বাজার দখলে থাকা নিম্ন স্তরের সিগারেটের দাম মাত্র ২ টাকা বাড়ানোয় সেগুলো এখনো সহজলভ্য রয়ে গেছে।
বিএনটিটিপির দাবি, সংসদে বাজেট পাস হওয়ার কয়েক দিন পর ২ জুলাই এনবিআর একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে তামাক সংশ্লিষ্ট কয়েকটি পণ্যের শুল্ক কমিয়ে দেয়। তাদের মতে, সংসদীয় বিতর্ক ছাড়াই এ পরিবর্তন কার্যকর করা হয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যভিত্তিক কর নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
তথ্যপত্র অনুযায়ী, ওই প্রজ্ঞাপনে সিগারেটের ফিল্টার ও নিকোটিন পাউচ তৈরির কাঁচামাল সেলুলোজ অ্যাসিটেটের আমদানিতে সম্পূরক শুল্ক ১০০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩০ শতাংশ করা হয়। নিকোটিন গ্রানুলের শুল্ক ৬০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয় এবং নিকোটিন পাউচের সম্পূরক শুল্ক ৪০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩৫ শতাংশ করা হয়।
একই সঙ্গে প্রতি ১০ গ্রাম নিকোটিন পাউচের খুচরা মূল্য ৫০০ টাকা এবং প্রতি ১০ স্টিক হিটেড টোব্যাকো পণ্যের খুচরা মূল্য ২১০ টাকা নির্ধারণের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়। জনস্বাস্থ্যকর্মীদের মতে, এসব সিদ্ধান্ত নতুন প্রজন্মের নিকোটিনজাত পণ্যকে আরও সহজলভ্য করে তুলতে পারে। বিড়ি, জর্দা, গুল ও ই-সিগারেটের ক্ষেত্রে কার্যকর কর ও নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা না থাকায় তামাক নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য দুর্বল হয়ে পড়ছে। স্বল্পমূল্যের এসব পণ্যের ব্যবহার কমাতে সমন্বিত কর ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জরুরি বলে মত দেন বিশেষজ্ঞরা।
এএইচ/এআর




