বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

পোলাও চালের দাম ছুঁয়েছে ২০০ টাকা, বাড়ছে সাধারণ চালেরও

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৭ জুলাই ২০২৬, ১২:১৪ পিএম

শেয়ার করুন:

পোলাও চালের দাম ছুঁয়েছে ২০০ টাকা, বাড়ছে সাধারণ চালেরও

দেশের চালের বাজারে কয়েক মাস ধরে ঊর্ধ্বমুখী দামের প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের ভাতের চাল থেকে শুরু করে উৎসব-অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত পোলাও চাল, প্রায় সব ধরনের চালের দামই বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে সুগন্ধি ও পোলাও চালের দাম। কয়েক মাস আগেও যে পোলাও চাল ১৬০ টাকা কেজিতে বিক্রি হতো, এখন সেটিই বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকায়। একই সময়ে মিনিকেট, নাজিরশাইল, কালিজিরা, চিনিগুঁড়া, বিআর-২৮, বিআর-২৯, স্বর্ণা ও পায়জাম চালের দামও কেজিতে ৪ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ফলে চাল কিনতেই এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে ভোক্তাদের।

রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, কয়েক মাস আগে ৮০ টাকা কেজিতে বিক্রি হওয়া মিনিকেট ও নাজিরশাইল চাল এখন ৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ এই দুই ধরনের চালের দাম কেজিতে ১০ টাকা বেড়েছে। কালিজিরা চালের দাম একই সময়ে ১৪৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৬০ থেকে ১৭০ টাকায় পৌঁছেছে। চিনিগুঁড়া চালের দাম ১৬০ টাকা থেকে বেড়ে ১৯০ টাকা হয়েছে। আর সবচেয়ে বেশি বেড়েছে প্রিমিয়াম পোলাও চালের দাম। কয়েক মাস আগে ১৬০ টাকায় বিক্রি হওয়া এই চাল এখন ২০০ টাকা কেজি, অর্থাৎ কেজিতে বেড়েছে ৪০ টাকা।

মাঝারি ও মোটা চালের বাজারেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। কয়েক মাস আগে ৬৫ টাকা কেজিতে বিক্রি হওয়া বিআর-২৮ চাল এখন ৭০ টাকা, ৬৭ টাকার বিআর-২৯ এখন ৭২ টাকা, ৫৮ টাকার স্বর্ণা চাল ৬২ টাকা এবং ৬০ টাকার পায়জাম চাল এখন ৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের ভাতের জন্য ব্যবহৃত চালের দামও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।

এদিকে খুচরা বাজারের পাশাপাশি অনলাইন বাজারেও বিভিন্ন ধরনের চাল উচ্চমূল্যে বিক্রি হচ্ছে। বিভিন্ন ই-কমার্স ও অনলাইন গ্রোসারি প্ল্যাটফর্মে দেখা গেছে, মিনিকেট, নাজিরশাইল, বাসমতি, কাটারিভোগ, কাজললতা ও চিনিগুঁড়া চালের দাম এখনও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। কোথাও কোথাও মূল্যছাড় দেখানো হলেও প্রকৃত বা তালিকাভুক্ত দাম বিবেচনায় ২৫ কেজির এক বস্তা বাসমতি চালের দাম ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত রাখা হচ্ছে।

অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে ২৫ কেজি সাগর ব্র্যান্ডের বাসমতি চালের তালিকাভুক্ত দাম ২ হাজার ৩২০ টাকা। জোহান ব্র্যান্ডের ২৫ কেজি বাসমতি চালের দাম ২ হাজার ৫০০ টাকা এবং সাধারণ ২৫ কেজির বাসমতি চালের দাম ২ হাজার ৩৫০ টাকা রাখা হয়েছে। এক কেজি ফোর সিজনস বাসমতি চাল ৪৫০ টাকা এবং ফরচুন বিরিয়ানি স্পেশাল বাসমতি চালের এক কেজির দাম ৪৮০ টাকা।

মিনিকেট চালের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। ২৫ কেজি সোনার চামচ মিনিকেট চালের তালিকাভুক্ত দাম ২ হাজার ২০০ টাকা। জোহান ব্র্যান্ডের ২৫ কেজি মিনিকেট চালের দাম ২ হাজার ১০০ টাকা। সুজন ব্র্যান্ডের ২৫ কেজি সোনার চামচ চালের দামও ২ হাজার ২০০ টাকা। অন্যদিকে খোলা মিনিকেট চালের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের এক কেজির দাম ৭৮ টাকা রাখা হয়েছে।

নাজিরশাইল চাল ২৫ কেজির বস্তা ২ হাজার ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সুজন ব্র্যান্ডের হাই স্পেশাল কাটারিভোগ চাল ২৫ কেজির বস্তার তালিকাভুক্ত দাম ১ হাজার ৯৫০ টাকা। গোল্ডেন কাজললতা চাল ২৫ কেজির বস্তার দাম ১ হাজার ৮৭৫ টাকা এবং দেশি কাজললতা চাল এক কেজির দাম ৭৬ টাকা।

চিনিগুঁড়া পোলাও চাল এক কেজির তালিকাভুক্ত দাম ১৫৫ টাকা। অন্যদিকে দেশীয় বাসমতি চাল এক কেজির দাম ১০০ টাকা এবং পিঠা তৈরির জন্য ব্যবহৃত আতপ চাল এক কেজির দাম ৫৮ টাকা রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া ২৫ কেজির বিআর-২৮ (আঠাশ) চালের তালিকাভুক্ত দাম ১ হাজার ৫০০ টাকা, যা প্রতি কেজিতে প্রায় ৬০ টাকা।

বাজারে আসা কয়েকজন ক্রেতা বলেন, কয়েক মাস ধরে চালের দাম কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সাধারণ চালের পাশাপাশি সুগন্ধি ও পোলাও চালের দাম এতটাই বেড়েছে যে অনেক পরিবার প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও এসব চাল কেনা কমিয়ে দিয়েছে। আগে মাসে একবার বা দুইবার পোলাও রান্না করা হলেও এখন বিশেষ উপলক্ষ ছাড়া তা সম্ভব হচ্ছে না। 

মিরপুর-৬ এলাকার বাজারে বাজার করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, কয়েক মাস আগেও যে চাল কিনতাম, এখন সেই একই চাল কিনতে অনেক বেশি টাকা লাগছে। বিশেষ করে সুগন্ধি ও পোলাও চালের দাম এত বেড়েছে যে এখন শুধু বিশেষ অনুষ্ঠান ছাড়া কেনা হয় না। সংসারের বাজেট ঠিক রাখতে অনেক কিছু হিসাব করে চলতে হচ্ছে।

মিরপুর-২ এলাকার গৃহিণী শারমিন আক্তার বলেন, চালের দাম বাড়ার প্রভাব পুরো সংসারে পড়ছে। আগে একসঙ্গে ২৫ কেজি চাল কিনতাম, এখন ১০ বা ১৫ কেজি করে কিনতে হচ্ছে। বাজারে এসে প্রায় প্রতিটি দোকানেই একই ধরনের দাম দেখছি। তাই বিকল্পও নেই।

বিক্রেতারা বলছেন, খুচরা ব্যবসায়ীরা ইচ্ছামতো দাম নির্ধারণ করেন না। মিল, পাইকারি বাজার ও সরবরাহকারীদের কাছ থেকে যে দামে চাল কিনতে হয়, সেই অনুযায়ী বিক্রি করতে হয়। তাদের ভাষ্য, ধানের দাম, পরিবহন ব্যয়, শ্রমিক মজুরি, গুদামজাত খরচ এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় চালের দামও বেড়েছে। সুগন্ধি ও উন্নতমানের চালের ক্ষেত্রে সরবরাহ সীমিত থাকায় দাম আরও বেশি।

ব্যবসায়ীরা জানান, ধানের দাম বৃদ্ধি, মিলে উৎপাদন ব্যয়, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার কারণে চালের বাজারে এর প্রভাব পড়েছে। তবে ভোক্তাদের অভিযোগ, উৎপাদনের মৌসুম শেষ হওয়ার পরও বাজারে দামের কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। বরং একবার দাম বাড়লে তা আর কমে না।

মিরপুর-৬ এলাকায় কাঁচাবাজারের চাল বিক্রেতা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, আগের মতো বিক্রি হচ্ছে না। দাম বেশি হওয়ায় অনেক ক্রেতা কম পরিমাণে চাল কিনছেন। বিশেষ করে পোলাও চালের ক্ষেত্রে এক কেজির জায়গায় এখন আধা কেজি বা একেবারেই নিচ্ছেন না। দাম কমলে বিক্রিও বাড়বে।

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমের বাজার বিশ্লেষণেও চালের দাম বাড়ার চিত্র উঠে এসেছে। বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরবরাহ ব্যয় ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির কারণে চালের দাম বাড়ছে। অন্যদিকে ভোক্তা অধিকারকর্মীদের মতে, বাজারে কার্যকর নজরদারির অভাব এবং কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মুনাফার প্রবণতাও মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশের প্রধান খাদ্যপণ্য চালের দামের এই ঊর্ধ্বগতি শুধু খাদ্য ব্যয়ই বাড়াচ্ছে না, সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির ওপরও চাপ সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে সুগন্ধি ও পোলাও চালের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি মধ্যবিত্ত পরিবারের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। তাদের মতে, উৎপাদন থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে দামের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং বাজারে নিয়মিত তদারকি জোরদার না হলে চালের বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরবে না।


এএইচ/এফএ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর