গত কয়েক মাসে দেশের বাজারে ডাল, ভোজ্যতেল ও বিভিন্ন মসলার দাম আবারও ঊর্ধ্বমুখী। বিশেষ করে মশুর ডাল, মুগডাল, ছোলা, সয়াবিন তেল, শুকনা মরিচ ও আমদানিনির্ভর মসলার দামে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা গেছে। অধিকাংশ নিত্যপ্রয়োজনীয় মসলার দাম আগের তুলনায় বেশি থাকায় রান্নাঘরের ব্যয় বেড়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ।
রাজধানীর মিরপুর এলাকার বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, বর্তমানে নেপালি ছোট মশুর ডাল ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। কয়েক মাস আগে একই ডালের দাম ছিল ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা। মুগডালের বাজারেও একই চিত্র। মানভেদে বর্তমানে ১৩০ থেকে ১৭০ টাকা কেজি বিক্রি হলেও কয়েক মাস আগে এটি ১১৫ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে ছিল। ছোলা এখন ৯০ থেকে ১০০ টাকা কেজি, যা কয়েক মাস আগে ৮০ থেকে ৯০ টাকায় পাওয়া যেত। অন্যদিকে অ্যাংকর ডালের দাম বর্তমানে ৬০ থেকে ৭৫ টাকা কেজি, যা কয়েক মাস আগে ৫৫ থেকে ৬৫ টাকার মধ্যে ছিল।
ভোজ্যতেলের বাজারেও স্বস্তি নেই। বর্তমানে খোলা সয়াবিন তেল ১৮৬ থেকে ১৯২ টাকা লিটার বিক্রি হচ্ছে। এক লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ১৯৯ টাকা, দুই লিটারের বোতল ৩৯৮ টাকা এবং পাঁচ লিটারের বোতল ৯৭৫ টাকা। কয়েক মাস আগে এক লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ছিল ১৯৫ টাকা। সরকার পরে লিটারপ্রতি ৪ টাকা বাড়িয়ে নতুন দাম নির্ধারণ করে। খোলা তেলের দামও একই সময়ে বেড়েছে।

মসলার বাজারেও মূল্যবৃদ্ধির চাপ স্পষ্ট। বর্তমানে দেশি শুকনা মরিচ ৩০০ থেকে ৩৮০ টাকা এবং আমদানি করা শুকনা মরিচ ৩৮০ থেকে ৪৫০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। কয়েক মাস আগে দেশি শুকনা মরিচের দাম ছিল প্রায় ২৫০ থেকে ৩২০ টাকা। দেশি আদা বর্তমানে ১৩০ থেকে ১৬০ টাকা এবং আমদানি করা আদা ১২০ থেকে ১৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। কয়েক মাস আগে উভয় ধরনের আদার দামই বর্তমানের তুলনায় ২০ থেকে ৩০ টাকা কম ছিল।
দেশি রসুন বর্তমানে ৯০ থেকে ১৪০ টাকা এবং আমদানি করা রসুন ১২০ থেকে ২০০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। কয়েক মাস আগে দেশি রসুন ৮০ থেকে ১২০ টাকার মধ্যে পাওয়া গেলেও বর্তমানে দাম বেড়েছে। তবে পেঁয়াজের বাজারে কিছুটা স্বস্তি এসেছে। দেশি পেঁয়াজ এখন ৩৫ থেকে ৪৫ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে, যা কয়েক মাস আগে ৫০ থেকে ৬০ টাকার মধ্যে ছিল।
আমদানিনির্ভর অন্যান্য মসলার দামও চড়া রয়েছে। বর্তমানে দেশি হলুদ ৩২০ থেকে ৩৫০ টাকা, আমদানি করা হলুদ ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা, জিরা ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা, দারুচিনি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা, লবঙ্গ প্রায় ১ হাজার ৪০০ টাকা, ছোট এলাচ ৪ হাজার ৬০০ টাকা, ধনে ১৮০ থেকে ২৮০ টাকা এবং তেজপাতা ১৮০ থেকে ২২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজার, ডলারের বিনিময় হার এবং আমদানি ব্যয় বাড়ায় এসব মসলার দাম কমছে না।
ক্রেতারা বলছেন, গত কয়েক মাসে ডাল, তেল ও মসলার দাম এমনভাবে বেড়েছে যে মাসিক সংসার খরচের হিসাব পুরোপুরি বদলে গেছে। আগে যে টাকায় এক সপ্তাহের বাজার করা যেত, এখন সেই টাকায় প্রয়োজনীয় সব পণ্য কেনা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে মশুর ডাল, মুগডাল, শুকনা মরিচ, জিরা, এলাচ ও ভোজ্যতেলের দাম বৃদ্ধির কারণে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়েছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর। অনেকেই প্রয়োজনের তুলনায় কম পরিমাণে পণ্য কিনছেন, আবার কেউ কেউ তুলনামূলক কম দামের বিকল্প পণ্য বেছে নিচ্ছেন।

তারা বলছেন, বাজারে কোনো পণ্যের দাম একবার বাড়লে তা আর সহজে কমে না। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার খবর এলেও দেশের বাজারে তার প্রতিফলন খুব একটা দেখা যায় না।
তাদের অভিযোগ, বাজার তদারকি দুর্বল হওয়ায় পাইকারি থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত দামের ব্যবধানও বাড়ছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নিয়মিত নজরদারি এবং অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণ খুঁজে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বাজার করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, কয়েক মাস আগেও যে পরিমাণ টাকা নিয়ে বাজারে আসতাম, এখন সেই টাকায় অর্ধেক জিনিসও কেনা যায় না। ডাল, তেল আর মসলার দাম এত বেড়েছে যে মাসের বাজেট নতুন করে করতে হচ্ছে।
মিরপুর-১০ এলাকার গৃহিণী শারমিন আক্তার বলেন, আগে রান্নায় যা ব্যবহার করতাম, এখন অনেক কিছু কমিয়ে দিতে হচ্ছে। বিশেষ করে শুকনা মরিচ, জিরা, এলাচের মতো মসলা কিনতে গেলে অনেক বেশি টাকা লাগে। সংসার চালানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটে কেনাকাটা করতে আসা অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা আবদুল মান্নান বলেন, কিছুদিন আগে যে ডাল ১৩০-১৪০ টাকায় কিনেছি, এখন সেটাই ১৫০-১৬০ টাকা। প্রতিটি পণ্যে একটু একটু করে দাম বাড়লেও সব মিলিয়ে মাসিক খরচ কয়েক হাজার টাকা বেড়ে গেছে।

বিক্রেতারা বলছেন, খুচরা ব্যবসায়ীরা ইচ্ছামতো দাম নির্ধারণ করেন না। পাইকারি বাজার থেকে যেসব দামে পণ্য কিনতে হয়, সেই হিসাব করেই খুচরা মূল্য নির্ধারণ করা হয়। তাদের ভাষ্য, ডাল, তেল ও মসলার বড় একটি অংশ আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজার, ডলারের বিনিময় হার, শুল্ক, পরিবহন ব্যয় ও গুদামজাত খরচের প্রভাব সরাসরি বাজারে পড়ে। অনেক পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও পাইকারি দাম কমছে না। ফলে খুচরা পর্যায়েও দাম কমানোর সুযোগ থাকছে না।
মিরপুর -৬ বাজারের মুদিদোকানি মো. আবদুল কাদের বলেন, আমরাও বেশি দামে কিনছি, তাই বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। পাইকারি বাজারে যে দামে মাল আসে, তার চেয়ে কমে বিক্রির সুযোগ নেই।
মিরপুর-১ কাঁচাবাজারের ব্যবসায়ী মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, মশলা ও ডালের বড় অংশই আমদানিনির্ভর। ডলারের দাম, পরিবহন খরচ আর পাইকারি বাজারের দামের কারণে খুচরা বাজারেও প্রভাব পড়ছে। ক্রেতারা আমাদের ওপর ক্ষোভ দেখালেও আসলে দাম বাড়ছে উৎস থেকেই।
মিরপুর-১০ খুচরা বাজারের তেল ও মসলা বিক্রেতা মো. নুরুল হক বলেন, অনেক পণ্যের সরবরাহ ঠিক থাকলেও পাইকারি দাম কমছে না। একবার দাম বাড়লে সহজে আর কমে না। এতে আমাদের বিক্রিও কমে গেছে, কারণ মানুষ আগের মতো পরিমাণে কিনতে পারছে না।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমদানি ব্যয়, পরিবহন খরচ, গুদামজাত ব্যয় এবং পাইকারি পর্যায়ে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব খুচরা বাজারে পড়ছে। অন্যদিকে ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের মতে, বাজার তদারকি আরও জোরদার না হলে এবং অস্বাভাবিক মুনাফা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে সাধারণ মানুষের স্বস্তি ফিরবে না।
এএইচ/এআরএম




