সোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬, ঢাকা

‘দু-মুঠো খাবার পেলেই চিন্তা শেষ’

মাহফুজুর রহমান
প্রকাশিত: ০৯ জুন ২০২৬, ০৯:২২ এএম

শেয়ার করুন:

Budget News dhakamail
বাজেট নিয়ে চলে নানা মহলের আলোচনা। কিন্তু এই আলোচনার বাইরেই থেকে যান শ্রমজীবী, দিন এনে দিন খাওয়া মানুষ। ছবি: ঢাকা মেইল

জাতীয় বাজেট নিয়ে তেমন আগ্রহ নেই শ্রমজীবী মানুষের। তাদের প্রধান চিন্তা সংসার চালানো আর নিত্যপণ্যের দাম। জাতীয় সংসদে প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা হয়। বাজেট নিয়ে চলে রাজনৈতিক বিতর্ক, অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণ এবং নানা মহলের আলোচনা। কিন্তু এই আলোচনার বাইরেই থেকে যান একদল মানুষ। তারা শ্রমজীবী, দিন এনে দিন খাওয়া মানুষ। বাজেটের অঙ্ক, রাজস্ব ঘাটতি কিংবা প্রবৃদ্ধির হিসাব তাদের কাছে খুব একটা অর্থ বহন করে না। তাদের একমাত্র প্রশ্ন বাজারে চাল, ডাল, তেল, মাছ আর সবজির দাম কত?

রাজধানীর নিউমার্কেটে কথা হয় রিকশাচালক আবদুল হকের সঙ্গে। বাজেট সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি হেসে বলেন, ‘বাজেটে কী আছে, কী নাই, এগুলো বুঝি না। সারাদিন রিকশা চালিয়ে যা পাই, তা দিয়ে সংসার চালাতে পারলেই হলো। বাজারে জিনিসপত্রের দাম কমলে আমাদের লাভ।’


বিজ্ঞাপন


একই ধরনের কথা বলেন নির্মাণশ্রমিক জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, ‘টেলিভিশনে বাজেটের খবর দেখি, কিন্তু কিছুই বুঝি না। আমরা শুধু চাই কাজ থাকুক, আয় থাকুক। বাজারে গেলে যেন কম টাকায় জিনিস কিনতে পারি।’

শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে কথা বলে দেখা যায়, বাজেট নিয়ে তাদের আগ্রহের অভাব উদাসীনতা থেকে নয়; বরং জীবনের বাস্তবতা থেকেই। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করা এসব মানুষের কাছে অর্থনীতির জটিল হিসাবের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করা।

রাজধানীর একটি বাজারে ভ্যানচালক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘চাল কিনতে গেলে দাম বেশি, তেল কিনতে গেলে দাম বেশি, ডাল কিনতে গেলে দাম বেশি। বাজেটে যদি এসবের দাম কমে, তাহলে ভালো।’


বিজ্ঞাপন


ফুটপাতে জুতা সেলাই করছিলেন লোকনাথ সেন। বাজেট ভাবনা নিয়ে তিনি বলেন, ‘বাজেট নিয়ে বড়লোকরা কথা বলে। আমরা শুধু দেখি বাজারে জিনিসপত্রের দাম কমলো কি না। সকালে যা আয় করি, সন্ধ্যায় তা দিয়ে সংসার চলে কি না, এটাই চিন্তা। বাজেটের কথা শুনেছি, কিন্তু বুঝি না। আমি শুধু চাই খাবারের দাম কম থাকুক।’

অর্থনীতির নানা সূচক উন্নতির কথা বলা হলেও শ্রমজীবী মানুষের বড় অংশের কাছে জীবন এখনও সংগ্রামের। তাদের অনেকেই জানেন না বাজেটে কী থাকে, কীভাবে তা তাদের জীবনে প্রভাব ফেলে। জানার আগ্রহও খুব একটা নেই। কারণ প্রতিদিনের আয়-ব্যয়ের চাপের মধ্যে এসব বিষয় নিয়ে ভাবার সুযোগ তাদের কম।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাজেটের প্রকৃত সাফল্য তখনই আসে, যখন এর সুফল সাধারণ মানুষের জীবনে প্রতিফলিত হয়। কিন্তু শ্রমজীবী মানুষের কাছে বাজেটের মূল্যায়ন খুবই সহজ। তারা প্রবৃদ্ধির হার, রাজস্ব আদায় বা উন্নয়ন ব্যয়ের হিসাব দিয়ে বিচার করেন না। তারা বিচার করেন বাজারের ব্যাগ হাতে নিয়ে।

চাল, ডাল, তেল, সবজি ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম যদি সহনীয় থাকে, তাহলে বাজেট ভালো। আর যদি সংসারের খরচ বাড়তেই থাকে, তাহলে বাজেটের বড় বড় ঘোষণাও তাদের কাছে গুরুত্ব হারায়।

তাই জাতীয় বাজেটের বিশাল অঙ্ক আর অর্থনৈতিক পরিভাষার ভিড়ে শ্রমজীবী মানুষের চাওয়া-পাওয়া খুবই সাধারণ। তারা বাজেট বুঝতে চান না, বাজেটের বিতর্কেও নেই তাদের আগ্রহ। তাদের একমাত্র প্রত্যাশা কাজ থাকুক, আয় থাকুক, আর দুইবেলা দু-মুঠো খাবারের ব্যবস্থা হোক। বাজারের দাম যেন তাদের নাগালের বাইরে চলে না যায়। তাদের কাছে ভালো বাজেটের সংজ্ঞা এটুকুই।

ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. রাজিয়া মাহবুবা আক্তার বলেন, ‘বাংলাদেশের অধিকাংশ নিম্নআয়ের মানুষের কাছে বাজেটের হিসাব বড়ই জটিল বিষয়, করনীতি বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান খুব বেশি গুরুত্ব পায় না। তাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা নির্ধারিত হয় চাল, ডাল, তেল, সবজি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে। বাজেট ঘোষণার পর যদি দ্রব্যমূল্য কমে, তারা স্বস্তি পায়; আর দাম বাড়লে তাদের জীবনযাত্রার সংকট আরও গভীর হয়। তাই সাধারণ মানুষের কাছে বাজেটের সফলতা কাগজে-কলমের সংখ্যায় নয়, বাজারের দামে প্রতিফলিত হয়।’

এম/এমআই

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর