সোমবার, ৮ জুন, ২০২৬, ঢাকা

বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম, চাপে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত

আব্দুল হাকিম
প্রকাশিত: ০৭ জুন ২০২৬, ১০:৪৪ পিএম

শেয়ার করুন:

নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে, চাপে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত

বাজারে ঢুকলেই হিসাব বদলে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের। আগে যে টাকায় এক সপ্তাহের বাজার হতো, এখন তা দুই-তিন দিনের বেশি টিকছে না। চাল, ডাল, তেল, সবজি ও মাছের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ায় চাপে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ।

রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, অনেক ক্রেতাই এখন আগের মতো তালিকা অনুযায়ী কেনাকাটা করছেন না। হাতে থাকা টাকার ভিত্তিতে পণ্য কিনছেন। কেউ চাল কিনলেও তেল কম নিচ্ছেন, কেউ আবার সবজি কিনে মাছ বাদ দিচ্ছেন।


বিজ্ঞাপন


রাজধানীর মিরপুরের একটি কাঁচাবাজারে দাঁড়িয়ে গৃহিণী রোকসানা বেগম বলেন, আগে এক হাজার টাকা নিয়ে বাজারে গেলে অনেক কিছু কেনা যেত, এখন সেই টাকায় শুধু চাল-ডালই হয়। তার কথায় প্রতিদিনের একই অভিজ্ঞতার ক্লান্তি স্পষ্ট। বাজারে ঢুকলেই প্রতিটি পণ্যের দাম শুনে তাকে হিসাব বদলাতে হয়। আগে যেটা না ভেবে কেনা যেত, এখন সেটাই সবার আগে বাদ দিতে হয়। সবজি, মাছ, তেল—সবকিছুর দামই বেড়েছে। মাঝেমধ্যে কিছু না কিনেই ফিরতে হয়।

pic

একই বাজারে কথা হয় চাকরিজীবী রুবেল আহমেদের সঙ্গে। তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। মাসের বেতন নির্দিষ্ট হলেও বাজারের হিসাব প্রতিদিনই বদলে যাচ্ছে বলে জানান তিনি। তার ভাষায়, বেতন একই আছে, কিন্তু বাজারের হিসাব প্রতিদিন বদলায়। মাসের শুরুতে যে বাজেট করে বাজারে যান, মাসের মাঝামাঝি এসে সেটি আর মেলে না। অনেক সময় বাধ্য হয়ে কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসও কমিয়ে আনতে হয়।

তিনি আরও বলেন, বাজেটে যদি বাজার নিয়ন্ত্রণ না থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষের জীবন আরও কঠিন হয়ে যাবে। তার মতে, শুধু আয় বাড়লেই সমস্যার সমাধান হয় না; বরং পণ্যের দাম স্থিতিশীল না থাকলে পুরো পরিবারের বাজেট এলোমেলো হয়ে যায়।


বিজ্ঞাপন


আরও পড়ুন: ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি মে মাসে

কাজীপাড়া এলাকার গৃহিণী শিরিন আক্তারের অভিজ্ঞতাও প্রায় একই রকম। তিনি বলেন, আগে সপ্তাহে দুই দিন মাছ কিনতাম, এখন এক দিন কিনতেই হিসাব করতে হয়। মাছ, মাংস, ফল—এসব এখন অনেক পরিবারের নিয়মিত খাবারের তালিকা থেকে ধীরে ধীরে বাদ পড়ছে। বাচ্চাদের জন্য ফল কিনতে গেলে মনে হয়, তা বাজেটের বাইরে চলে যাচ্ছে।

বাজার ব্যবসায়ীরা বলছেন, দামের এই চাপ মূলত সরবরাহ-সংকট ও ব্যয় বৃদ্ধির কারণে তৈরি হয়েছে। পরিবহন খরচ, পাইকারি বাজারের দাম ও জ্বালানি ব্যয়—সব মিলিয়ে খুচরা বাজারেও এর প্রভাব পড়ছে। তবে ব্যবসায়ীরা এটাও স্বীকার করছেন যে সাধারণ ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় বিক্রিও আগের তুলনায় কমে গেছে।

pic

মিরপুর-৬ এলাকার খুচরা ব্যবসায়ী তারেক মাহমুদ বলেন, ক্রেতারা এখন আগের মতো কিনছেন না, সবাই হিসাব করে কিনছেন। আগে যেখানে একসঙ্গে বেশি পরিমাণে কেনাকাটা হতো, এখন সেখানে অল্প অল্প করে কেনার প্রবণতা বেড়েছে। এতে বাজারের গতিও বদলে গেছে।
নিত্যপণ্যের বাজারে এই অস্থিরতার প্রভাব শুধু শহরে সীমাবদ্ধ নয়। গ্রামাঞ্চলেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। গ্রামে আয় তুলনামূলকভাবে কম হলেও নিত্যপণ্যের দাম প্রায় শহরের মতোই। ফলে গ্রামের মানুষও এখন সমানভাবে চাপে পড়েছেন।

আরও পড়ুন: ঋণ-কিস্তির চাপে কমছে বৈদেশিক সহায়তা!

অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে না এলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর চাপ আরও বাড়বে। তাদের মতে, মূল্যস্ফীতি শুধু একটি অর্থনৈতিক সূচক নয়, এটি সরাসরি মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে যুক্ত। যখন বাজারে দাম বাড়ে, তখন তার প্রভাব প্রথমে পড়ে খাবারের তালিকায়, পরে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অন্যান্য খরচে।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, বাজার ব্যবস্থাপনায় সরকারের কার্যকর সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। ফলে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে না। যে বাজার সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা, সেটি এখন বিভিন্ন সিন্ডিকেটের প্রভাবাধীন। এর ফলে অনেক সময় যৌক্তিক কারণ ছাড়াই নিত্যপণ্যের দামে অস্থিরতা তৈরি হয়। তাই বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে প্রথমেই সিন্ডিকেটভিত্তিক প্রভাব ভেঙে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় বাজার স্থিতিশীল রাখা কঠিন হবে।

এএইচ/এআর

 

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর