# বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৬.০৩ শতাংশ
# ১১ বছরের সর্বনিম্ন বেসরকারি বিনিয়োগ
বিজ্ঞাপন
# নীতি সুদহার ১০ শতাংশ, বাণিজ্যিক ঋণ প্রায় ১৫ শতাংশ
# সরকারের ব্যাংকঋণে বেড়েছে তারল্য সংকট
# খেলাপি ঋণ ৬.৪৪ লাখ কোটি টাকা
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চ সুদহার এবং তারল্য সংকটে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি জানুয়ারিতে নেমে এসেছে মাত্র ৬.০৩ শতাংশে, যা সর্বনিম্ন পর্যায়ে। নতুন শিল্প বিনিয়োগ ও সম্প্রসারণ পরিকল্পনা স্থগিত থাকায় অর্থনীতিতে ধীরগতি বিরাজ করছে। ঋণ অনুমোদনে ব্যাংকগুলোর সতর্ক অবস্থান, আর সরকারের ঋণগ্রহণ ও খেলাপি ঋণের বোঝা বাড়ায় তারল্য সংকট তীব্র হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা করছেন, ঋণ প্রবৃদ্ধি দ্রুত ঘুরে না দাঁড়ালে শিল্প উৎপাদন আরও মন্থর হবে, বেসরকারি বিনিয়োগ দীর্ঘ সময় স্থবির থাকতে পারে এবং কর্মসংস্থান পুনরুদ্ধারে বিলম্ব হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ডিসেম্বর মাসে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৬.১ শতাংশ; জানুয়ারিতে তা আরও কমে ৬.০৩ শতাংশ। অথচ ২০২৪ সালের জুলাইয়ে এ হার ছিল ১০.১৩ শতাংশ। এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তবে গত নভেম্বরে প্রবৃদ্ধি সাময়িকভাবে বেড়ে ৬.৫৮ শতাংশে উঠেছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক ঊর্ধ্বগতি নতুন উৎপাদনমুখী বিনিয়োগের ফল নয়; বরং ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের আগে ঋণ পুনঃতফসিলের প্রভাব। জানুয়ারি-জুন ২০২৬ মেয়াদের মুদ্রানীতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, কঠোর মুদ্রানীতি, বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকারের বাড়তি ঋণগ্রহণ এবং বিনিয়োগ-সংক্রান্ত অনিশ্চয়তার কারণে ঋণের চাহিদা কমেছে। ফলে প্রবৃদ্ধিও কমে গেছে।
গত কয়েক মাসের পরিসংখ্যান বলছে, ঋণ প্রবৃদ্ধির নিম্নমুখী ধারা অব্যাহত রয়েছে। সেপ্টেম্বরে তা ৬.২৯ শতাংশে নেমে এসেছে, আগস্টে ৬.৩৫ শতাংশ, জুলাইয়ে ৬.৫২ শতাংশ, জুনে ৬.৪০ শতাংশ, মে মাসে ৭.১৭ শতাংশ এবং এপ্রিলে ৭.৫ শতাংশ। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে প্রবৃদ্ধি ১০.১৩ শতাংশে ছিল। ওই বছরের আগস্টের রাজনৈতিক পালাবদলের পর থেকে হার দ্রুত কমতে শুরু করেছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ২২ দশমিক ০৩ শতাংশে, যা গত ১১ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে সরকারি বিনিয়োগও টানা তৃতীয় বছরের মতো কমেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে সরকারি বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৫১ শতাংশে, যা আগের বছর ছিল ৬ দশমিক ৭৪ শতাংশ। এটি ২০১৩ সালের পর থেকে সর্বনিম্ন।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, ব্যবসায় আস্থার সংকট এবং ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা বিনিয়োগ পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি বড় জয় পেলেও অনেক উদ্যোক্তা এখনও নতুন বিনিয়োগে এগোতে দ্বিধা অনুভব করছেন।
এদিকে নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ বাড়াতে নীতিগত সহায়তার ইঙ্গিত দিয়েছেন। দায়িত্বের প্রথম দিনেই তিনি বলেন, বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে উচ্চ সুদহার কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি বন্ধ শিল্প-কারখানা ও বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু করে অর্থনীতিতে গতি ফেরানোর ওপর জোর দেন। তার বক্তব্যে দীর্ঘদিনের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি থেকে সরে আসার সম্ভাবনার আভাস মিলেছে।
ব্যাংকাররা বলছেন, শুধু সুদহার কমিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানো কঠিন।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে ১১ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়া হচ্ছে, আবার কিছু আমানতে সুদহারও প্রায় ১১ শতাংশ। আমানতকারীদের মুনাফা নিশ্চিত করতে গিয়ে ন্যূনতম মার্জিনেই ঋণ বিতরণ করতে হচ্ছে।’
তার মতে, উচ্চ সুদহার অবশ্যই বিনিয়োগের পথে একটি বাধা, তবে এটিই একমাত্র কারণ নয়। বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় উদ্যোক্তারা গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ, বন্দর সুবিধা ও অবকাঠামোগত সক্ষমতাকে অগ্রাধিকার দেন। এসব নিশ্চিত না হলে শুধু সুদহার কমিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানো কঠিন।
ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার আরেকটি বড় কারণ হলো ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণগ্রহণ বেড়ে যাওয়া। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে সরকারের নিট ব্যাংকঋণ দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার ৭৮২ কোটি টাকা, যা সংশোধিত বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকার প্রায় ৪৩ শতাংশ।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণ ৩২.৮ শতাংশ বেড়েছে। এতে তারল্য সংকট তীব্র হয়ে বেসরকারি খাত চাপের মুখে পড়েছে।
অন্যদিকে, ব্যাংকিং খাত রেকর্ড পরিমাণ খেলাপি ঋণের বোঝা বহন করছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ পর্যন্ত খেলাপি ঋণ বেড়ে ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা মোট বকেয়া ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এর ফলে ব্যাংকগুলোর মূলধন দুর্বল হয়েছে এবং প্রভিশন বাড়াতে হয়েছে, ফলে নতুন ঋণ অনুমোদনে তারা আরও সতর্ক।
তারল্য সংকট এবং ধীর আমানত প্রবৃদ্ধির কারণে ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের ক্ষমতা কমেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতিসুদ ১০ শতাংশে উন্নীত করায় বাণিজ্যিক ঋণের সুদহার প্রায় ১৫ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের নতুন ঋণ নিতে নিরুৎসাহিত করছে। এর প্রভাব ইতোমধ্যে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে দৃশ্যমান: মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে, শিল্প উৎপাদনে মন্থরতা দেখা দিয়েছে, অর্থের সঞ্চালন হ্রাস পেয়েছে, অনেক কারখানা সক্ষমতার নিচে উৎপাদন করছে, ভোক্তা চাহিদা কমেছে এবং বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি ধীর হয়েছে।
জুলাই-ডিসেম্বর ২০২৫ সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ছিল ৯.৮ শতাংশ, কিন্তু বাস্তবে তা লক্ষ্য থেকে অনেক পিছিয়ে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, ঋণ প্রবৃদ্ধি দ্রুত পুনরুদ্ধার না হলে শিল্প উৎপাদন আরও দুর্বল হবে, বেসরকারি বিনিয়োগ দীর্ঘ সময় স্থবির থাকবে এবং কর্মসংস্থান পুনরুদ্ধারে বিলম্ব হতে পারে।
টিএই/এমআর

