- রমজানে সবচেয়ে বেশি চাহিদা খেজুরের
- ক্রেতাদের নজর কাড়ছে আপেল-কমলা-মাল্টা
- খেজুরবাহী জাহাজডুবি, প্রভাব পড়ছে বাজারে
- নতুন সরকারের কাছে বাজারে লাগাম টানার প্রত্যাশা
রমজানের শুরুতেই প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে পুরান ঢাকার বাদামতলী ফলের বাজার। আমদানিনির্ভর ফলের দাম চড়া থাকলেও বেশ চাঙা ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে রাজধানীর সবচেয়ে বড় ফলের এই বাজারে। এখানে ভোর থেকেই শুরু হয় কর্মযজ্ঞ। একদিকে লেবাররা কার্টন নামাচ্ছেন, গদিতে সাজাচ্ছেন অন্যদিকে পাইকাররা ক্রেতার অর্ডার অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করছেন। পুরো রমজানই এই বাজার সরগরম থাকবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিজ্ঞাপন
রমজানকে কেন্দ্র করে বাজারের চেহারা সাধারণ অন্য সময়ের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। নিয়মিত ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরাও। তারা দুই-তিন মাস আগে থেকেই দোকান বা স্লট বুক করেন, উদ্দেশ্য একটাই—ইফতারের প্রধান পণ্য খেজুর এবং বিদেশি ফল বিক্রি করা। এবার আমদানিনির্ভর ইফতার সামগ্রীর দাম তুলনামূলকভাবে চড়া। খেজুর, বিদেশি ফল, ড্রাই ফ্রুটস এবং প্যাকেজড খাবারের দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেক ক্রেতাই তাদের বাজেট নিয়ে ভাবছেন।
রমজানে খেজুরের চাহিদা সাধারণ সময়ের তুলনায় কয়েক গুণ বেড়ে যায়। ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন, সারা বছর যা বিক্রি হয় তার চেয়ে এক মাসে বেশি খেজুর বিক্রি হয়। ইফতারের অপরিহার্য পণ্য হিসেবে খেজুর ক্রেতাদের প্রধান পছন্দ।
মৌসুমি ব্যবসায়ী সায়েম খান বলেন, রমজান এলেই বাজারের চিত্র বদলে যায়। ছোট দোকান চালানোর মানুষেরা এই সময় বেশি খেজুর কিনে রাখেন। ইফতারে খেজুরের গুরুত্ব এতটাই বেশি যে, এক মাসে সারা বছরের তুলনায় বেশি বিক্রি হয়।
বাদামতলীর ব্যবসায়ী আব্দুর রহিম জানান, গত বছর প্রথম রোজা থেকেই বাজার কিছুটা পড়ে গিয়েছিল। এবার ক্রেতাদের উপস্থিতি ভালো, সবাই দরদাম করছেন, দোকান যাচাই করছেন, তারপর পছন্দমতো খেজুর নিচ্ছেন। অন্তত ১৫ রোজা পর্যন্ত বাজারের গতি ধরে রাখা যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তিনি আরও বলেন, কিছু খেজুরের দাম বেড়েছে, আবার কিছু কমেছে। সামগ্রিকভাবে বাজারের অবস্থা ইতিবাচক।
রমজানে বিদেশি ফলের চাহিদাও কম নয়। আপেল, কমলা, মাল্টা, আঙুর, নাশপাতি—সবই ক্রেতাদের নজর কাড়ছে। পাইকাররা জানান, রমজানের প্রথম ১০ দিন ভালো কাটে। শবে বরাত থেকেই বাজার চাঙ্গা হয়ে ওঠে।

ব্যবসায়ীরা জানান, খেজুরের কার্টনগুলো সাধারণত ৫/১০ কেজির হয়ে থাকে। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ১ কেজির কার্টন হয়।
জানা যায়, ৫ কেজির মেডজুল ৬,৫০০ টাকা, প্রিমিয়ার জার্বো মেডজুল ৮,০০০ টাকা, মরিয়ম ৪,৮০০–৫,২০০ টাকা, আজওয়া ৩,৫০০–৫,০০০ টাকা, মাবরুম ৪,০০০–৫,০০০ টাকা, মাশরুখ ২,২০০–২,৮০০ টাকা, কালমি ২,৮০০–৩,৫০০ টাকা, সুগাই ২,৮০০–৩,৫০০ টাকা, ছড়া ২,৫০০–২,৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
১০ কেজির কার্টন দাবাস খেজুর ৪৭০০-৫০০০ টাকা, তিন কেজি ওজনের সুক্কারি ১৮০০-২৪০০ টাকা, টপ দাবাস ২৫০০-২৭০০ টাকা ধরে কেনাবেচা হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা জানান, সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে জিহাদি খেজুরের। গত বছর ১০ কেজি কার্টনের দাম ছিল ১৭০০ টাকা, এবার তা হয়েছে ২৭০০ টাকা।
তারা জানান, দামের পার্থক্য আসে মান, সাইজ এবং আমদানির উৎস অনুযায়ী। ক্রেতারা বাজেট অনুযায়ী বাছাই করছেন। অনেকেই একাধিক জাত একসাথে কিনছেন।
এদিকে বাদামতলী ফল মার্কেটসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে আমদানিনির্ভর ও দেশি ফলের দাম ব্যাপকভাবে বেড়েছে। রোজার আগের সপ্তাহে ১০০–১২০ টাকা ডজন দরে বিক্রি হওয়া সবরি কলা এখন ১৬০ টাকায় উঠেছে। সাগর কলার দাম ৮০ টাকার থেকে বেড়ে ১২০ টাকায় দাঁড়িয়েছে এবং বাংলা কলা ১০০–১২০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। বিদেশি ফলের বাজারে আরও চড়া দাম লক্ষ্য করা গেছে। ভালো মানের আপেল প্রতি কেজি ৩৫০–৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা আগে ৩০০ টাকার কমে পাওয়া যেত। সবুজ আঙুরের দাম ৪২০–৪৫০ টাকা কেজি এবং কালো আঙুর বিক্রি হচ্ছে ৫৫০ টাকায়। ইফতারের জনপ্রিয় মাল্টা প্রতি কেজি ৩৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা গত সপ্তাহে ছিল ২৫০ টাকার কম। লেবুর দাম প্রতি হালি ৮০–১২০ টাকার মধ্যে উঠেছে, যা ইফতারের শরবতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
দেশি ও মৌসুমি ফলের দামও বেড়েছে। তরমুজ বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ১০০–১২০ টাকায়। পেঁপে প্রতি কেজি ১৭০–১৮০ টাকায়, পেয়ারা ১৩০ টাকায়। দেশি কুল ১৫০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে, ছোট বরই ৭০ টাকায়। বিদেশি ফলের মধ্যে বেদানা বিক্রি হচ্ছে ৫২০–৫৬০ টাকায় এবং রসালো স্ট্রবেরি ৬০০–৭০০ টাকায়। আনারসের দাম প্রতি পিস ৫০ টাকা এবং বেলের দাম ১২০–১৫০ টাকায় ওঠানামা করছে। সফেদা বিক্রি হচ্ছে ২৫০ টাকা কেজিতে।
এভাবে বাদামতলী ও দেশের অন্যান্য বাজারে রমজানে আমদানিনির্ভর ও দেশি ফলের দাম একদিকে বাড়ছে, অন্যদিকে ক্রেতাদের ভিড় ও চাহিদা থাকায় ব্যবসায়ীরা তুলনামূলকভাবে বেশি মুনাফা পাচ্ছেন। বাজারের সরবরাহ ঠিক থাকলেও চাহিদা ও মৌসুমি প্রভাবের কারণে দাম বেড়ে যাওয়ায় ক্রেতাদের ব্যয় বেশি হচ্ছে, বিশেষত মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের ক্ষেত্রে।

ফল কিনতে আসা শামসুদ্দিন বলেন, এবার ফলের দাম কিছুটা বাড়তি। তবে খুচরা বাজারের তুলনায় এখানে দাম কিছুটা কম এবং এক জায়গায় এত ধরনের খেজুর পাওয়া যায়। রমজান উপলক্ষে একসঙ্গে বেশি খেজুর কিনছি।
যাত্রাবাড়ী ব্যবসায়ী শাহজাহান ঢাকা মেইলকে বলেন, রোজায় অনেক খেজুরের প্রয়োজন পড়ে। এলাকার বাজারের চেয়ে এখানে অনেক সাশ্রয়ী দামে খেজুর কেনা যায়। দাম কিছুটা কম হয়, তাই এখানে আসা। প্রতি বছর রমজানেই আমরা এখান থেকে প্রয়োজনীয় ফল নিয়ে থাকি।
ব্যবসায়ীরা জানান, থাইল্যান্ডে সাগরে ডুবে যাওয়া জাহাজে খেজুর ছিল, যার কারণে রমজানের শুরুতে সরবরাহে ঘাটতি ও দাম বেড়েছে। তবে অন্যান্য সব ধরনের খেজুরের দাম গত বছরের তুলনায় কম।
ব্যবসায়ীরা নিশ্চিত করছেন, বাজারে মান বজায় রাখতে মেয়াদোত্তীর্ণ বা পচা খেজুর বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। খেজুরকে মেঝেতে সরাসরি রাখা যাবে না; কাঠের তক্তা বা চাঁটাই বাধ্যতামূলক। বস্তাবন্দি খেজুর পিপি পলিথিনে ঢেকে রাখতে হবে। পরিমাপের স্কেল ব্যবহার, মূল্য তালিকা প্রদর্শন এবং বিক্রির মেমো সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক। প্রয়োজনে নিরাপদ খাদ্য অধিদফতর বা বিএসটিআই অভিযান চালাতে পারে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ছোট-বড় ব্যবসায়ী, পাইকার এবং ক্রেতারা সক্রিয়। কার্টন সাজানো, দরদাম, প্যাকেট গোছানোর তৎপরতা—সব মিলিয়ে বাদামতলী ও ফলমন্ডি রেলওয়ে মেনস মার্কেটে রমজানের ছন্দ পুরোদমেই চোখে পড়েছে। খেজুর-ফল বেচাকেনার এই ব্যস্ততা শুধু অর্থনৈতিক স্পন্দন নয়, শহরের রমজানের আবহের জীবন্ত সাক্ষ্য বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক হাজি তৌহিদুল আলম ঢাকা মেইলকে বলেন, এইবার খেজুরের আমদানি বেড়েছে। পাইকারি-খুচরা বাজারে দাম কম। তবে থাইল্যান্ডে ডুবে যাওয়া জাহাজের খেজুর রমজানের শুরুতে না আসায় কম দামি খেজুরের দাম কিছুটা বেড়েছে।
রমজানে খেজুরের দাম লাগামহীন উল্লেখ করে কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিযেশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন ঢাকা মেইলকে বলেন, বিদেশি ফলের আমদানি ব্যয় কত আর পাইকারি পর্যায়ে সেগুলো কত দামে বিক্রি হচ্ছে তা যাচাই করা দরকার।
তিনি মনে করেন, দীর্ঘ অস্থিরতার পর রাজনৈতিক দল সরকার গঠন করেছে। এখন নতুন সরকার এখনই বাজারের লাগাম টানতে না পারে তাহলে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এমআর/জেবি

