মাছ-মাংস, সবজি, ইফতারসামগ্রীর দামে অস্বস্তি
খেজুরের বাজারে অস্থিরতা নিয়ে ভোক্তাদের উদ্বেগ
এক মাসের ব্যবধানে ২০ টাকার লেবুতে সেঞ্চুরি
বাজার ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা
অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে: ক্যাব
রমজানকে সামনে রেখে রাজধানীর খুচরা বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দামে আবারও ঊর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে। মাছ-মাংস, সবজি, পেঁয়াজ, ছোলা, খেজুর ও লেবুসহ বেশ কিছু পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় স্বল্প ও মধ্য আয়ের মানুষের মধ্যে অস্বস্তি বাড়ছে। ব্যবসায়ীরা সরবরাহে সাময়িক ঘাটতি ও মৌসুমজনিত কারণের কথা বললেও ভোক্তাদের অভিযোগ, প্রতি বছর রমজান এলেই অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির একই চিত্র দেখা যায়।
বিজ্ঞাপন
মঙ্গলবার ও বুধবার রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, শ্যামবাজার, কারওয়ান বাজারসহ বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, লেবুর দাম হঠাৎ বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। এক মাস আগে যে লেবু ২০ থেকে ৩০ টাকা হালিতে বিক্রি হয়েছিল, সেটিই এখন ৮০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
কারওয়ান বাজারের খুচরা বিক্রেতা রফিকুল বলেন, এখন লেবুর মৌসুম নয়, ফলে সরবরাহ কম। মৌসুম শুরু হলে দাম স্বাভাবিক হতে পারে। তবে ক্রেতাদের অভিযোগ ভিন্ন। যাত্রাবাড়ী আড়তের কেনাকাটা করতে আসা রমজান আলী বলেন, রোজার আগেই লেবু সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। তার ভাষায়, বাজারে কার্যকর তদারকি না থাকায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
সবজির বাজারেও বাড়তি দামের চাপ স্পষ্ট। করলা ১২০ থেকে ১৪০ টাকা, ঢেড়স ৮০ থেকে ১২০ টাকা, কাঁচা মরিচ ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা কেজি, বেগুন ৬০ থেকে ১০০ টাকা, টমেটো ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। বিক্রেতারা বলছেন, শীতের মৌসুম শেষ হওয়ায় কিছু সবজির সরবরাহ কমে গেছে। তবে ভোক্তারা মনে করছেন, বাড়তি চাহিদাকে পুঁজি করেই দাম বাড়ানো হচ্ছে।
মুরগি ও গরুর মাংসের দামও বেড়েছে। ব্রয়লার মুরগি কেজিতে ১৮০ থেকে ২০০ টাকা এবং সোনালি মুরগি ৩২০ থেকে ৩৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গরুর মাংসের কেজি ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকায় উঠেছে। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, পাইকারি পর্যায়ে দাম বাড়ায় খুচরায় তার প্রভাব পড়েছে।
খেজুরের বাজারে অস্থিরতা নিয়ে ভোক্তাদের উদ্বেগ সবচেয়ে বেশি। শুল্কহার কমানো হলেও দাম কমার লক্ষণ নেই। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, জাহিদি খেজুর ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা কেজি, দাবাস ৫৫০ থেকে ৫৭০ টাকা, মরিয়ম ১১০০ থেকে ১৪০০ টাকা এবং মেডজুল ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বাদামতলীর ফলের আড়তের বিক্রেতা আব্দুর রহিম ঢাকা মেইলকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে আমদানি পর্যায়ে দাম বেড়েছে। বন্দরের অস্থিরতা ও খালাসে বিলম্বের কারণে সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। গতবারের তুলনায় এবার দাম বেশি।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, চাহিদা ও সরবরাহে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য না থাকলেও বাজার ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা রয়েছে। তাদের ভাষায়, আমদানি সহজীকরণ, গুদাম থেকে দ্রুত বাজারজাতকরণ এবং পাইকারি থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত নজরদারি জোরদার করা জরুরি।
এদিকে খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি, খাদ্যের নিরাপদতা ও ঝুঁকি মোকাবেলায় ১৫ দফা নাগরিক দাবি তুলে সংবাদ সম্মেলন করেছে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), কনজ্যুমার এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব), বিসেফ ফাউন্ডেশন ও শিসউক। বক্তারা বলেন, রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও ভেজালমুক্ত খাদ্য নিশ্চিত করা সরকারের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বাজার সিন্ডিকেট ভাঙা, নিয়মিত মনিটরিং জোরদার, নিরাপদ খাদ্য আইন বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের দাবি জানান। তাঁদের মতে, কাগজে-কলমে পর্যাপ্ত মজুত থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার সুফল ভোক্তার কাছে পৌঁছাচ্ছে না।
ক্যাবের সভাপতি ও সাবেক সচিব এ. এইচ. এম. সফিকুজ্জামান বলেন, ভেজাল খাদ্য ও মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে নীতি-নৈতিকতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। তিনি কৃষিজমিতে ক্ষতিকর কীটনাশকের ব্যবহার কমানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের স্বার্থে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি। নিয়মিত বাজার মনিটরিং ও সিন্ডিকেট ভাঙাকে তিনি সরকারের জন্য ‘এসিড টেস্ট’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
সামগ্রিকভাবে রমজান ঘিরে বাজারে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে রোজার শুরুতেই ভোক্তাদের ভোগান্তি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা ক্যাব সভাপতির।
এমআর/ক.ম

