# প্রকল্পের মোট ব্যয় ২০ কোটি ৭৮ লাখ ৮০ হাজার টাকা
# প্রশিক্ষণ ও কার্যক্রমের পরিকল্পনা ডিপিপিতে স্পষ্ট নয়
# হাওরাঞ্চলের অনেক পরিবার জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে
# অর্থায়নের অনিশ্চয়তা ও ব্যয়ের অসামঞ্জস্য প্রকল্পে প্রধান আপত্তি
বরিশাল বিভাগের নদী-বিধৌত ও জলাভূমি এলাকায় জলবায়ু সহিষ্ণু হাঁস পালন সম্প্রসারণে প্রায় ২১ কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও এতে একাধিক ত্রুটি ও অস্পষ্টতা চিহ্নিত করেছে পরিকল্পনা কমিশন। অর্থায়নের অনিশ্চয়তা, ব্যয়ের অসামঞ্জস্য, প্রশিক্ষণ ও কার্যক্রমের অস্পষ্ট পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আপত্তি তুলে ধরা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রাণিসম্পদ অধিদফতর প্রস্তাবিত ‘বরিশাল বিভাগের নদী-বিধৌত অঞ্চলে ও জলাভূমিতে জলবায়ু সহিষ্ণু হাঁস পালন সম্প্রসারণ’ শীর্ষক প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২০ কোটি ৭৮ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এটি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে অননুমোদিত নতুন প্রকল্প হিসেবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকবে প্রাণিসম্পদ অধিদফতর।

প্রকল্পের আওতায় বরিশাল বিভাগের চারটি জেলা—বরিশাল, পটুয়াখালী, ঝালকাঠি ও ভোলায় জলবায়ু সহিষ্ণু হাঁস পালন কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। সরকারি হাঁস খামারের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, হাঁসের বাচ্চার চাহিদা পূরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলাই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য।
বিজ্ঞাপন
বরিশাল বিভাগ একটি নদীবিধৌত ও উপকূলীয় অঞ্চল হওয়ায় এখানে লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড় ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বেশি। ফলে কৃষি ও মৎস্য উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ অবস্থায় জলাভূমি ও পতিত জমিতে হাঁস পালন একটি বিকল্প ও টেকসই জীবিকামুখী উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে পরিকল্পনা কমিশনের প্রাথমিক পর্যালোচনায় প্রকল্পটির ডিপিপিতে একাধিক গুরুতর আপত্তি তোলা হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের মতামত
পরিকল্পনা কমিশন জানিয়েছে, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩১টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এসব প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় মোট বরাদ্দ ৬৪৩,৮৬১.৩২ লক্ষ টাকা, যেখানে চলতি অর্থবছরে এডিপিতে বরাদ্দ হয়েছে ১৪৯,৯১১.০০ লক্ষ টাকা। কমিশনের মতে, নতুন প্রকল্পের জন্য অর্থায়ন পরিকল্পনা স্পষ্ট করা জরুরি, কারণ মন্ত্রণালয়ের ফিসক্যাল স্পেস ঋণাত্মক অবস্থায় রয়েছে।

ডিপিপি'র ১৫.৪ নং আইটেমে বরিশাল, পটুয়াখালী, ঝালকাঠি ও ভোলার হাঁস প্রজনন খামারের সক্ষমতা বৃদ্ধির কথা উল্লেখ আছে। তবে খামারিদের প্রশিক্ষণ কীভাবে দেওয়া হবে, প্রশিক্ষণ মাধ্যম কী হবে এবং তারা কী ধরনের সহায়তা পাবেন—এসবের বিস্তারিত উল্লেখ নেই। এছাড়া, ক্রয় পরিকল্পনা পিপিআর ২০০৮ অনুযায়ী প্রস্তুত করা হয়েছে। যেহেতু বর্তমানে পিপিআর ২০২৫ প্রযোজ্য, তাই নতুন নির্দেশ অনুযায়ী ক্রয় পরিকল্পনা প্রণয়ন প্রয়োজন।
কমিশন জানিয়েছে, ডিপিপি'র ২০নং আইটেমে নির্মাণ কাজ, যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম আইটেমের বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রয়োজন। পণ্য ক্রয় পরিকল্পনার সংযোজনী অনুযায়ী, দুটি ২ টন এয়ার কন্ডিশনারের ব্যয় ১,৬০৫.২০ লক্ষ টাকা ধরা হয়েছে, কিন্তু ব্যয় বিবরণীতে মাত্র ০.৪ লক্ষ টাকা দেখানো হয়েছে। এ অসামঞ্জস্যতা দূর করতে হবে এবং এয়ার কন্ডিশনার কেনার যৌক্তিকতা ডিপিপিতে সংযুক্ত করতে হবে।
জাতীয় পর্যায়ে ৩টি কর্মশালার জন্য ১৭.৯৯ লক্ষ টাকা বরাদ্দ থাকলেও কর্মশালার বিষয়বস্তু, সময়, স্থান, অংশগ্রহণকারী ও আলোচক সম্পর্কিত তথ্য ডিপিপিতে নেই। পরিবহন সেবা, মনিহারী খাত, প্রকল্প অফিস ও বরিশাল অফিস রিনোভেশন, ভূমি উন্নয়ন এবং খামার যন্ত্রপাতি সংক্রান্ত বিস্তারিত ব্যয় ও স্পেসিফিকেশনও ডিপিপিতে উল্লেখ করা হয়নি। এছাড়া, কতিপয় অঙ্গের পরিমাণ ‘থোক’ হিসেবে দেখানো হয়েছে, যা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন।

পরিকল্পনা কমিশন জানিয়েছে, এসব ত্রুটি ও অসামঞ্জস্য পিইসি সভায় বিস্তারিতভাবে আলোচনা হবে। সভায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দফতরের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থেকে ব্যাখ্যা দেবেন। আলোচনার পর প্রকল্প অনুমোদন বা সংশোধনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সংশোধনের মাধ্যমে প্রকল্পের কার্যক্রম আরও সুস্পষ্ট ও কার্যকর হবে এবং বরিশাল, পটুয়াখালী, ঝালকাঠি ও ভোলার হাঁস প্রজনন ও প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন কার্যক্রম সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হবে।
প্রকল্প পরিচালক ড. অভিজিত কুমার মোদক ঢাকা মেইলকে বলেন, প্রশিক্ষণ ও কার্যক্রমের বিষয়গুলো প্রকল্প প্রস্তাবে কাঠামোগতভাবে অন্তর্ভুক্ত থাকলেও বিস্তারিত উপস্থাপনায় ঘাটতি থেকে থাকতে পারে। এনিয়ে পিইসি সভায় স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হবে। খামারিদের জন্য হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ, মাঠপর্যায়ে প্রদর্শনী কার্যক্রম এবং কারিগরি সহায়তা প্রদানের পরিকল্পনা রয়েছে বলেও তিনি জানান।
আরও পড়ুন: প্রতিদিন কমছে কৃষিজমি, সংকটে কৃষক
হাওর ও নদী-ধৌত অঞ্চলের পরিবারগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে রয়েছে—এ বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্যই হলো এসব ঝুঁকিপ্রবণ এলাকায় টেকসই ও জলবায়ু সহিষ্ণু হাঁস পালন ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
অর্থায়ন ও ব্যয়ের অসামঞ্জস্য প্রসঙ্গে ড. মোদক বলেন, পরিকল্পনা কমিশনের পর্যবেক্ষণকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনের পর প্রকল্পটি বাস্তবায়নের অনুমোদন পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এএইচ/জেবি
