শেরপুরের শ্রীবরদীতে সেতুর নিচে ড্রামের মধ্যে ভেসে থাকা মরদেহ ঘিরে তৈরি হয়েছিল নানা প্রশ্ন। অবশেষে সেই অজ্ঞাত নারীর পরিচয় এবং মৃত্যুর পেছনের ঘটনা সামনে এনেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। শেরপুরের শ্রীবরদীতে ঘটে যাওয়া এ হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নেমে চারজনকে গ্রেফতার করেছে সংস্থাটি।
রোববার (১ নভেম্বর) পিবিআই শেরপুরের পুলিশ সুপার পংকজ দত্ত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান।
তিনি জানান, নিহত নারীর নাম ঝিনুক আক্তার (২৬)। তার বাড়ি গাজীপুরের টঙ্গী এলাকায়। সেখানে একটি পার্লারে কাজ করতেন তিনি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিনিময়ে পাওয়া অর্থের পরিমাণ নিয়ে বিরোধের একপর্যায়ে ঝিনুক আক্তারকে হত্যা করা হয়। পরে তার পরিচয় গোপন রাখার উদ্দেশে এবং অপরাধের চিহ্ন মুছে ফেলতে মরদেহটি শেরপুরের শ্রীবরদীতে এনে ফেলে রাখা হয়। টঙ্গী থেকে ঘটনাস্থলটির দূরত্ব প্রায় ২০০ কিলোমিটার।
পিবিআইয়ের দেওয়া তথ্যমতে, গত ২২ অক্টোবর সকাল সাড়ে ৯টার দিকে শ্রীবরদী উপজেলার কুড়িকাহনিয়া সেতুর নিচে একটি বড় নীল রঙের প্লাস্টিকের ড্রাম ভাসতে দেখেন স্থানীয় লোকজন। সন্দেহ হওয়ায় তারা বিষয়টি পুলিশকে জানান। পরে ড্রামটি পরীক্ষা করে এর ভেতর থেকে এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাতসহ একাধিক জখমের চিহ্ন পাওয়া যায়।
মরদেহ উদ্ধারের পরপরই ঘটনাটির অনুসন্ধানে নামে পিবিআই শেরপুরের ক্রাইমসিন দল। ঘটনাস্থল থেকে প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহের পাশাপাশি নিহতের পরিচয় শনাক্তে কাজ শুরু করেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। একপর্যায়ে তার পরিচয়ও নিশ্চিত করা হয়।
এ ঘটনায় নিহতের ফুফু শিরিনা আক্তার বাদী হয়ে ২৩ অক্টোবর শ্রীবরদী থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। মামলায় ঝিনুকের স্বামী মো. সাইফুল ইসলাম মুন্নাসহ অজ্ঞাতপরিচয়দের আসামি করা হয়।
মামলার পর পিবিআই শেরপুর নিজ উদ্যোগে ছায়া তদন্ত শুরু করে। পরবর্তী সময়ে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় পুলিশ পরিদর্শক মাহবুবুর রহমানকে।
তদন্তের সূত্র ধরে পিবিআই প্রথমে পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার দিঘলগ্রাম এলাকায় অভিযান চালিয়ে নুর ইসলাম ওরফে বাবুকে আটক করে। ২৯ অক্টোবর তাকে হেফাজতে নেওয়ার পর তার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের সূত্র ধরে পরদিন ঢাকার উত্তরখান এলাকায় অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে সজল নামে আরেকজনকে গ্রেফতার করা হয়। পরবর্তী অভিযানে একই এলাকা থেকে নুর মোহাম্মদ ওরফে গোসা ওরফে বুশা এবং মাহবুবা আক্তার ওরফে ফাতেমা গ্রেফতার হন।
পিবিআইয়ের অনুসন্ধানে জানা যায়, ঘটনার আগের দিন অর্থাৎ ২১ অক্টোবর ঝিনুক আক্তার ঢাকার উত্তরখান এলাকায় কবিরশাহ মাজারের কাছে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে গ্রেফতার ব্যক্তিরা তাকে দক্ষিণখান থানার মৌশাইর এলাকার একটি নির্মাণাধীন পাঁচতলা ভবনে নিয়ে যান।
ভবনটির তৃতীয় তলার একটি কক্ষে তাকে একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে বাধ্য করা হয়েছিল বলে তদন্তে তথ্য পেয়েছে পিবিআই।
পিবিআইয়ের তদন্ত অনুযায়ী, রাত সাড়ে ৮টার দিকে ঝিনুক সেখান থেকে চলে যাওয়ার কথা জানালে তাকে ১ হাজার ২০০ টাকা দেওয়া হয়। তবে এ পরিমাণ টাকা নিয়ে সন্তুষ্ট না হয়ে তিনি আরও অর্থ দাবি করেন। এ নিয়ে মাহবুবা আক্তার ওরফে ফাতেমার সঙ্গে তার কথা কাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে ফাতেমা বটি দিয়ে ঝিনুকের ওপর হামলা চালান বলে জানিয়েছে পিবিআই। পরে অন্যরা তার হাত-পা ধরে রাখেন এবং গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে মৃত্যু নিশ্চিত করেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে। হত্যার পর মরদেহ সরিয়ে ফেলার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে অভিযুক্তরা। পিবিআইয়ের ভাষ্য, একটি প্লাস্টিকের ড্রামের মধ্যে মরদেহ ঢুকিয়ে অজ্ঞাত একটি গাড়িতে তোলা হয়। পরে ওই গাড়িতে করে শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার কুড়িকাহনিয়া সেতুর নিচে নিয়ে ড্রামটি ফেলে রেখে যায় তারা।
এ ঘটনায় গ্রেফতার নুর ইসলাম ওরফে বাবু আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পিবিআই।
পিবিআই শেরপুরের পুলিশ সুপার পংকজ দত্ত জানান, শুরুতে হত্যাকাণ্ডটির কোনো সূত্র পাওয়া যায়নি। তবে তদন্তে একের পর এক তথ্য ও আলামত বিশ্লেষণ করে হত্যার কারণ ও জড়িতদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। অনৈতিক কর্মকাণ্ডের পারিশ্রমিক নিয়ে বিরোধের জেরেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে। ঘটনার পর পিবিআইয়ের সদস্যরা সম্মিলিতভাবে কাজ করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে রহস্য উদঘাটনের পাশাপাশি চারজনকে গ্রেফতার করেছেন।
তিনি আরও বলেন, অপরাধ সংঘটনের পর তা গোপন রাখার নানা চেষ্টা করা হলেও অপরাধীরা শেষ পর্যন্ত আইনের আওতার বাইরে থাকতে পারে না। এ ঘটনায় করা মামলার তদন্ত এখনো অব্যাহত রয়েছে।
প্রতিনিধি/এলএ




