‘শাহিন কল দিছিল। বলছিলাম, বাবারে, আমি কিছু ফল কিনে খাই, জানিস তো তুই। আমাকে কিছু টাকা পাঠা। শাহিন বলল, মা ১২ তারিখে টাকা পাঠাবোনি, ফল কিনে খাইও। তার আগেই আমার ছেলেটা আগুনে পুড়ে মরে গেল। আমার বুকের ধনটা আমাকে রেখে চলে গেল। আমি তো একা হয়ে গেলাম, আমি এখন বাঁচব কী করে।’
কান্নাজড়িত কণ্ঠে এভাবেই বুকভাঙা আর্তনাদ করছিলেন সৌদি আরবের রিয়াদের একটি সোফা তৈরির কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে নিহত শাহিনের মা নার্গিস বেগম।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) সকালে নওগাঁ পৌর শহরের পার নওগাঁ এলাকায় শাহিনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ছেলের শোকে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন মা নার্গিস বেগম। শোকাহত পরিবারটিকে সান্ত্বনা দিতে বাড়িতে ভিড় করছেন আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা।
পরিবারের সদস্যরা জানান, ভাগ্য বদলের আশায় চলতি বছরের এপ্রিল মাসে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা ঋণ করে সৌদি আরবে পাড়ি জমান শাহিন। দেশে রেখে যান স্ত্রী, ছয় বছর বয়সী এক ছেলে, আট মাস বয়সী কন্যাসন্তান ও ষাটোর্ধ্ব মাকে। বিদেশে যাওয়ার মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে তার মৃত্যুতে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে পুরো পরিবার।

নিহত শাহিনের মামি নিলুফা ইয়াসমিন বলেন, ‘শাহিনের বয়স যখন চার বছর, তখনই তার বাবা মারা যান। অনেক কষ্টে তাকে বড় করা হয়েছিল। বিদেশে ভালো আয়ের আশায় বিয়ের পর ধারদেনা করে তাকে পাঠানো হয়। মারা যাওয়ার তিন দিন আগে সে প্রথমবার ৩২ হাজার টাকা পাঠানোর কথা বলেছিল। যার মধ্যে ২০ হাজার টাকা কিস্তি এবং বাকি টাকা দিয়ে সংসারের খরচ চালাতে বলেছিল। কিন্তু সেই টাকা আর পাঠানো হলো না।’
শাহিনের মামা আব্দুস সালাম জানান, ছোটবেলা থেকেই শাহিন অত্যন্ত পরিশ্রমী ছিল। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে এখন দিশেহারা তার স্বজনেরা। এ অবস্থায় পরিবারটির পাশে দাঁড়াতে সরকারের প্রতি জোরালো আহ্বান জানান তিনি।

নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, নিহতদের মরদেহ বিনা খরচে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সার্বিক সহযোগিতা করা হবে।
উল্লেখ্য, গত ৯ আগস্ট সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের একটি সোফা কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৬ জন বাংলাদেশি প্রাণ হারান। তাঁদের মধ্যে ১২ জনই নওগাঁ জেলার বাসিন্দা। প্রথম দফায় গত ২৭ আগস্ট সাতজনের মরদেহ দেশে এলেও পরিচয় শনাক্তের জটিলতায় বাকি পাঁচজনের মরদেহ সৌদির হিমঘরে রাখা ছিল। দীর্ঘ ২ মাস ২২ দিনের আইনি প্রক্রিয়া শেষে শনিবার তাদের মরদেহ দেশে পৌঁছায়।
নিহত নওগাঁর এই পাঁচ প্রবাসী হলেন—নওগাঁ পৌরসভার পার নওগাঁ এলাকার শাহিন, আত্রাই উপজেলার ডুবাই গ্রামের হাসিবুল হাসান শুভ, মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের মিনহাজ প্রামাণিক, মাধবপুর গ্রামের মাসিদুল সরদার সজিব এবং সাধনগর গ্রামের সাগর আলী।
প্রতিনিধি/এসএস




